1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
শুক্রবার, ২০ মে ২০২২, ০১:৪০ অপরাহ্ন

সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস নিয়ে লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১
  • ৮১ দেখেছেন
উপন্যাসের প্রচ্ছদ
আমার কৈশোরে যখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, আমাদের স্কুলে এলেন স্কুল পরিদর্শক। তখন আমাদের ভুগোলের ক্লাস চলছিল।
পরিদর্শক স্যার বললেন,ফার্স্টবয় কে? দাঁড়াও।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
তিনি বললেন, নদীতে আমরা যে পানি দেখি,এর উৎস কোথায়?
আমি বললাম, সমুদ্র।
পরিদর্শক স্যার বিস্ময় নিয়ে ভূগোল  স্যারের দিকে তাকালেন। দেখলাম,স্যারের মুখে একটা কালোছায়া পড়েছে।
আমি বুঝলাম আমার উত্তরটা হয়নি।এ-ও বুঝলাম, আমার দেখা নদীর সঙ্গে তাঁর কখনো  দেখা হয় নি। কিন্তু আমি তো আমার চোখের দেখাকে অবিশ্বাস করতে পারি না! আমি জোর দিয়েই বললাম, নদীতে জোয়ার আসে সমুদ্র থেকে। প্রতিদিন দুই বার। যখন আসে  পানির উঁচু দেওয়ালের মতো,সাপের মতো ফণা তুলে, কাতার বেঁধে,গর্জন করে। তারপর ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল নদী জোয়ারের পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। নদী এতবড় যে এইপাড় থেকে ওইপাড় দেখা যায় না।
মনে হলো,পরিদর্শক স্যার কিছুটা প্রসন্ন হলেন। তিনি জানতে চাইলেন,এমন নদী আমি কোথায় দেখেছি।
আমি আমার শৈশব-কৈশোরে দেখা সমুদ্র উপকূলবর্তী ‘বাঘাদোনা’ নদীর কথা বললাম। আমি তাঁকে কুলকিনারাহীন উথাল-পাথাল নদীর কথা শোনালাম।বললাম, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমি দূর সমুদ্রে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে জাহাজ চলে যেতে দেখেছি। তিনি অবাক বিস্ময়ে শুনলেন,বড় বড় মালবাহী বোট সমুদ্রের উপর ভাসতে ভাসতে রঙিন পাল উড়িয়ে  মিছিলের মতো দূরে কোথাও চলে যায়।
 পরিদর্শক স্যার আমার কথা শুনে হয়তো খুশি হলেন। আবার আমার ভুলও সংশোধন করে বলে দিলেন নদীর পানির উৎস পাহাড়-পর্বত।আমাদের দেশের অধিকাংশ নদীর উৎপত্তিস্থল হিমালয় পর্বতমালা। নদীগুলি যে বিপুল  জলরাশি বয়ে চলেছে, তার উৎসও ওই হিমালয়। একটু মজা করেই বললেন, পাহাড়ের কান্নাই হচ্ছে নদীর জল।
আমার শৈশব-কৈশোরে অথবা পরবর্তী সময়ে নদী-সমুদ্রের যে বিস্ময়কর সৌন্দর্য কিংবা ভাঙনের যে ভয়াবহ রূপ আমি দেখেছি তার সঙ্গে হিমালয় কিংবা আরো দূরদেশ থেকে বয়ে আসা নদনদীর বিস্তর ফারাক রয়েছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-তিতাস-কর্ণফুলী-সুরমা-কুশিয়ারার জীবনের সঙ্গে সমুদ্রোপকূলবর্তী নদীর কোনো মিল নেই। নদী যেটাই হোক- একেক নদী একেক সৌন্দর্য বিভায় ঐশ্বর্যময়। কোনো কোনো নদী আবার দুকূল ভেঙে কিংবা দুকূল ভাসিয়ে মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে যায়।
নদী যেমনই হোক, নদীকে ঘিরেই মানুষের জীবন-জীবিকা চলমান থাকে।দুপাড়ের মানুষের অসীম আনন্দ-বেদনা,সুখ-দুঃখের নিরন্তর সাথী নদী। অতীতে হাট-বাজার, গঞ্জ-শহর সবই গড়ে উঠেছে নদীকে ঘিরেই। বাংলা সাহিত্যে এই নদীকে ঘিরে লেখা হয়েছে কালজয়ী অনেক উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, গান। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ , সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’, অদ্বৈত মল্ল বর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, সেলিনা হোসেনের ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’,  ইমদাদুল হক মিলনের ‘নদী জীবন’, হরিশংকর জলদাসের ‘জলপূত্র’ – এই উপন্যাস গুলো জেলে সম্প্রদায়ের নদী ও সমুদ্র কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা নিয়ে রচিত। এছাড়া দেবেশ রায়ের ‘তিস্তা পারের বৃত্তান্ত’ , অসীম রায়ের ‘কচ ও দেবযানী’ প্রভৃতি  নদী কেন্দ্রিক উপন্যাস। সবগুলো উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলো প্রান্তবর্তী মানুষ,দারিদ্র্য নিষ্পেষিত অন্ত্যজশ্রেণির ঝুলন্ত মানুষ। তারা পেটপুরে খেতে পায় না,নারী কিংবা পুরুষ তারা পরষ্পরের  কর্মসহযোগী, জলের সঙ্গে মিশে থাকা জলজ-জীবন তাদের,শরীরের বসন ভিজে লেপ্টে থাকে দিন-রাতের অধিকাংশ সময়।
নদী/ সমুদ্রের গল্পকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন আল মাহমুদ। পানকৌড়ির রক্ত, কালো নৌকা, বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা, রোকনের স্বপনদোলা, জলবেশ্যা প্রভৃতি ছোটগল্প মানুষের আদিম প্রবৃত্তির শৈল্পিক বর্ণনা যা বিশ্ব সাহিত্যের যে কোনো শ্রেষ্ঠ রচনার সঙ্গে তুলনীয়।
নদীকে ঘিরে বিশ্বসাহিত্যের রচনা সম্ভার  অনেক সমৃদ্ধ। নাইল, রাইন, আমাজন, দানিয়ুব, ভলগা, মিসিসিপি, কঙ্গো, হোয়াং হো, কাওয়াই, টেমস, হাডসন, ইউফ্রেটিস, শাতিল আরব, সিন্ধু- এইসব নদীকে ঘিরে রচিত হয়েছে বিখ্যাত বিখ্যাত অনেক কালজয়ী উপন্যাস। সেগুলো নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সব চলচিত্র। কাজেই বলা যায়, সবদেশে সবকালে নদীই মানুষের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে, পল্লবিত করেছে।
একইভাবে সমুদ্রও মানুষকে টেনে নিয়ে গেছে দূর অসীম সমুদ্রে, কখনো জীবীকার টানে,কখনো কুহকের মায়ায়।সমুদ্রভ্রমণ  নিয়ে অসাধারণ ভ্রমণ উপন্যাস লিখেছেন অতীন বন্দোপাধ্যায়। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড় নিয়ে লেখা হয়েছে উপন্যাস, গল্প। শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সারেং বৌ’  সেলিনা হোসেনের ‘জলোচ্ছ্বাস’, সিরাজুল ইসলাম মুনিরের ‘তার ফিরে আসা’ উপন্যাসের নাম করা যেতে পারে।
সমুদ্র উপকূলে নদী-মোহনায় কিংবা অদূরবর্তী সমুদ্রচর নিয়েও লেখা হয়েছে উপন্যাস, ছোটগল্প। বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ , কামাল উদদীন আহমদের ‘দরিয়া পাড়ের দৌলতী’, ওবায়দুল কাদেরের গাঙচিল, সিরাজুল ইসলাম মুনিরের ‘আবর্ত’ , ‘রক্তভেজা অববাহিকা’ প্রণিধানযোগ্য। এবং আশ্চর্যের ব্যপার হলো এই উপন্যাসগুলোর ঘটনাস্থল মোটামুটি একই ভূগোলে- মেঘনার মোহনায় জেগে ওঠা  বিশাল ভূভাগ, বিশাল চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক কাঠামোয় মেঘনার অববাহিকায় অবস্থিত অবিভক্ত জেলা নোয়াখালী এবং সন্নিহিত জেলা চট্টগ্রাম ও বরিশালের কিছু অংশ নিয়ে এই ভূভাগ- যা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে  এই অঞ্চলকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে। এর মাটির গঠনে ভিন্নতা রয়েছে। কর্দমাক্ত বালুময় কাদামাটি স্তরের পর স্তর জমে এই ভূভাগে তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল চরভূমি যা এখন বিশাল বিস্তৃত   সুবর্ণ জনপদ। দীর্ঘ দুইশত বছর ধরে বারবার ভাঙন ও পত্তনের মুখে এই অঞ্চলের মানুষ বারবার ভূমিহারা-সর্বহারা হয়েছে। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঠাঁই করেছে, কখনো এককালের জোত্-জমির মালিকেরা আশ্রয়দাতা বা নতুন প্রতিবেশীদের অবহেলার শিকার হয়েছে। অনেকেই নতুন বসত করেছে করিমগঞ্জ,  আসাম, পশ্চিম বাংলা, বীরভূম কিংবা আরো দূর বিদেশে। কথায় আছে না, চাঁদে গেলেও তাদের দেখা পাওয়া যায়।
 সমুদ্র উপকূলবর্তী  জলোচ্ছ্বাস-গরকি পীড়িত সংগ্রামী মানুষের জীবনশৈলীর বহুবিচিত্র চিত্ররূপ নিয়ে লেখা আমার উপন্যাস ‘আবর্ত’ ও ‘রক্তভেজা অববাহিকা’। আর ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুকিয়ে যাওয়া পদ্মাপাড়ের মানুষের বদলে যাওয়া জীবন, জলহীন পদ্মার বুকে জেগে ওঠা  চরের কূহক, চরকে ঘিরে দুই দেশের মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন এক নিষিদ্ধ বাণিজ্যের গল্প নিয়ে লেখা ‘পদ্মা উপাখ্যান’- এই তিনটি উপন্যাসকে এক মলাটে আবদ্ধ করে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হচ্ছে ‘নদীজীবন চর জীবন’।
 আবর্ত- এর ঘটনা প্রবাহ  বিশাল ক্যানভাসে আঁকা এক চলমান ছবির মতো। উথাল-পাতাল সমুদ্রের ক্রমাগত ভাঙন আর পত্তনের মুখে নতুন চরকে ঘিরে মানুষের উল্লাস-আনন্দ-বেদনা চিরদিনের। এরকম একটি চর ‘ভাটির টেক’-  এই চরকে দখলে রাখার জন্য ভূমি লোভী ক্ষমতাবান মানুষ নদীশিকস্তি সর্বহারা মানুষের উপর পর্যায়ক্রমে যে নৃশংসতা ও বর্বরতা’র ঘটনা ঘটিয়েছিল এবং যেভাবে সর্বহারা মানুষের প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারিত হয়েছিল- এই উপন্যাসে  তা ঘটনা পরম্পরায় বর্ণিত হয়েছে।
 ‘আবর্ত’  আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস।  বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচক রাজু আলাউদ্দিন ‘আবর্ত’ প্রথম প্রকাশের পর তাঁর দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে লিখেন, গল্পকার সিরাজুল ইসলাম মুনির-এর প্রথম উপন্যাস ‘আবর্ত’ উপযুক্ত  সামাজিক ও স্থানিক প্রেক্ষিতকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে। উল্লেখিত অঞ্চলসমুহের নিরন্তর সংগ্রামশীল মানুষের জীবনবাদী অভিব্যক্তি আবর্ত উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর ভেতরের বিভিন্ন সংকট, সংষ্কার এসব থেকে উৎসারিত জীবনের জটিলতাকে মুনির উপন্যাসের হ্রস্ব পরিসরে সচরিত্র ছেঁকে তুলেছেন। চরিত্রের নিজস্ব জীবন সংস্কৃতির বাস্তবতাকে গ্রাহ্য করে আবর্ত উপন্যাসে উত্তোলিত করেছেন জীবনের রুদ্র পতাকা। রফিক মেম্বার, আবুল মাঝি,মজু সারেং, শেফালী, সফিক,রোশনি,বকুল,ছত্তর, আবুল কাসেম এমনি আরো কিছু চরিত্রের সম্মিলিত জীবন-যাত্রার উপর ছুঁড়ে মেরছেন তাঁর উপন্যাসের জাল। উপন্যাসিক মুনির যে দুজনকে এই গ্রন্থে সতর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে তুলে এনেছেন  তাদের একজন হল খল রফিক মেম্বার  অন্যজন কেন্দ্রীয় চরিত্রের প্রাণপুরুষ আবুল মাঝি।
  বাংলা উপন্যাসে রফিক মেম্বারেরও আগে আরেকজনের দেখা আমরা পেয়েছিলাম মানিকের ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে। রহস্যময় নিগুঢ় অথচ পদ্মা পারের সকলেরই বিস্ময় ও শ্রদ্ধাভাজন সেই হোসেন মিয়া। এর সঙ্গে রফিক মেম্বারের কাঠামো ও নির্যাসগত হরিহর সম্পর্ক হলেও দুজনেই আবার ভিন্ন বাস্তবতার কারণে আপনাপন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। রফিক মেম্বার হোসেন মিয়ার মত কোন ব্যাপারেই তেমন প্রচ্ছন্ন বা পরোক্ষময়তার আশ্রয়ে নেই, একেবারে খাপ খোলা ধরনের।…
 লেখালেখির জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আমাকে  কবি আবিদ আজাদ লেখালেখিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। আবর্ত’র পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়েছিলাম তাঁকে। আবিদ আজাদ মৃত্যুবরণ করেন ২২ মার্চ ২০০৫। মৃত্যুর আগে ‘উপন্যাসের সৎসঙ্গ’ নামে লেখা ছোট্ট এক রচনায় তিনি  লিখেন, “….  হ্যাঁ, একটানেই পড়ে ফেলেছিলাম ‘আবর্ত’। পড়ে ফেলে মনে হয়েছিল, একেই বলে উপন্যাসের টান ।যে টানে পড়া শেষ না করে উঠা যায় না।…… আমি যথেষ্ট ঢিলেঢালা আগ্রহ নিয়ে চোখ রেখেছিলাম সদ্যপরিচিত তরুণ কথাসাহিত্যিকের রচনাটিতে। আমার সেই  ঢিলেঢালা ভাবটা কখন যে সংহত হয়ে ছোট উপন্যাসটির দৃশ্য- দৃশ্যান্তর, চরিত্ররাজি,ঘটনাভূমি ও দক্ষিণ বাংলার উপকূলবর্তী সদাচঞ্চল ঘুর্ণি আবহাওয়ার মধ্যে শিকড়বদ্ধ হয়ে গেছে বুঝতেই পারি নি। বুঝতে পারিনি প্রকাশোন্মুখ এক তরুণ ঔপন্যাসিক তার উপজীব্য লবণতাড়িত জনপদের ছিন্নচিত্ররাশি, সংগ্রামী ও শঠ জীবনধারার আবর্তে ফেলে দেবে আমাকে এবং ভাবিনি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থটি শেষ না করে ক্ষান্ত হতে পারব না কিছুতেই।…..
 ‘রক্তভেজা অববাহিকা’ উপন্যাসের ঘটনাস্থলও নোয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলে  জেগে ওঠা চরভূমি। উপকূলীয় চরাঞ্চলে বনভূমি সৃজনের কাজ শুরু হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশক্রমে। দীর্ঘ তিন দশকের  অবিরাম প্রচেষ্টায় সেখানে গড়ে ওঠে হাজার হাজার একর নিবিড় বনভূমি। কিন্তু সরকারি বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তাদের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারণে আবির্ভাব ঘটে বনদস্যুদের। ভূমি দখলের লক্ষ্য নিয়ে নষ্ট রাজনীতিক,ভূমিগ্রাসী ব্যবসায়ী-শিল্পপতি,মুখোশধারী ক্ষমতাবান মানুষ আর সমাজের  টাউট-বাটপার ভূমিদস্যু, জলদস্যু, চোর, ডাকাতদের  ব্যবহার করে, তাদের মধ্য থেকেই সৃষ্টি করে বনদস্যু আর বিশেষ সন্ত্রাসী বাহিনী।
 এই উপন্যাসের প্রাণপ্রবাহে আছে সমুদ্রের ভাঙন কবলিত ছিন্নমূল মানুষ,ভূমিহীন সর্বহারা মানুষ।জমি দেবার প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে ব্যবহার করা হয় বনভূমি উজাড় ও ভূমি দখলের কাজে। পরবর্তীতে ভূমিগ্রাসীদের গোপন ইংগিতে তাদেরই উপর  নেমে আসে সন্ত্রাসী বাহিনীর বীভৎস নির্যাতন। খুন,ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ – এসব ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের বর্বরতা এত দূরমাত্রায় পৌঁছে যে, কন্যা-জায়া-জননীকেও পিতা-স্বামী-সন্তানের সামনে ধর্ষণের শিকার হতে হয়। এবং এরকম ঘটনা একটি নয়,অগুনতি।
 ছিন্নমূল এইসব দরিদ্র মানুষ প্রতিরোধও করে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা থাকে সীমিত।
 ‘রক্তভেজা অববাহিকা ‘ উপন্যাসে এই ভূভাগে চরভূমি পত্তন, বনভূমি সৃজন,বনভূমি উজাড়, ভূমি দখলসহ সমকালীন রাজনৈতিক আর সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
 কথাসহিত্যিক অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, সিরাজুল ইসলাম মুনির  যে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন, তা কল্পিত নয়, বাস্তব। এসব এই রক্তাক্ত ভুগোলে ঘটেছে। এখানে মানুষ খুন হয়েছে, নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছে, বন দখল হয়েছে, মূলভূমিতেও সন্ত্রাস ছড়িয়েছে, কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি, নষ্ট রাজনীতিবিদরা বিত্ত আর ক্ষমতার সঙ্গী হয়েছেন। সরকারের বনবিভাগ হাত মিলিয়েছে ভূমিদস্যুদের সঙ্গে। এইসব পতন ও পচন যেন আমাদের নিয়তি।…..
‘পদ্মা উপাখ্যান’ এপিকধর্মী সৃজনশীল উপন্যাস।  রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ- গোদাগাড়ি ও তৎসংলগ্ন পদ্মার দুইপারের দুই বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক, সামজিক, রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক জীবনধারার আড়ালে প্রবাহিত এক গোপন নিষ্ঠুর -নিষিদ্ধ জীবনের গল্প হলো ‘পদ্মা উপাখ্যান’।
 শুরু হয়েছিল ফারাক্কার জল ভাগাভাগির খেলা নিয়ে, তার ফলে নাব্যতা কমে গিয়ে পদ্মার বুকে জেগে ওঠে মরুচর। ফলে নদী সংলগ্ন এপার-ওপার দুইপারের কৃষি জমি হয়ে ওঠে রুক্ষ।কৃষিভিত্তিক জীবনের প্যাটার্ন বদলে যায়, মানুষ হয়ে পড়ে বেকার, দারিদ্র্যপীড়িত। বিত্ত-বেসাতহারা পদ্মাতীরের মানুষও হয়ে ওঠে দুইনম্বরি, কালোবাজারি, লাফাঙ্গা।
 নাইমা, জুলেখা, ডিউক এনায়েত – এইসব চরিত্রের মধ্য দিয়ে পদ্মা উপাখ্যানে বর্ণিত গল্প কেবল একটি অঞ্চলের বিশেষ কোনো গল্প নয়, এতে আছে রাষ্ট্রীয় সংকটের কথাও।
 শিক্ষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ড.সালিম সাবরিন বলেন,’বাংলা কথাসাহিত্যে পদ্মা নদী ও নদীর তীরবর্তী জনপদ বিশাল ক্যানভাসে ধরা দিয়েছে বারবার। বিদগ্ধ সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অভিহিত করেছেন ‘পদ্মানদীর দ্বিতীয় মাঝি’ বলে। কারণ পদ্মা বিধৌত জীবনই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রাণকেন্দ্রে। আর মানিক সৃষ্টি করলেন অমর কথাশিল্প ‘পদ্মানদীর মাঝি’। এছাড়াও অমরেন্দ্র ঘোষ লিখেছেন ‘চর কাসেম’ উপন্যাস। কিন্তু  প্রমত্তা পদ্মার সেকালের নাব্যতা আর নেই। মরণ বাঁধ ফারাক্কার প্রকোপে পদ্মার বিশাল বুক বিস্তৃত মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। ফলে এই জনপদে ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক দিক দিয়েও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ উভয় দেশের কথাসাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহী-চাপাই নবাবগঞ্জ অঞ্চলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় প্রথম প্রতিচিত্র আমরা লক্ষ্য করি সেলিনা হোসেনের ‘চাঁদবেনে’ উপন্যাসে।
ফারাক্কার কারণে এই বিপন্ন  জনপদের কথা সেলিনা হোসেন অপরিসীম মমত্বে এঁকেছেন।  আবুবকর সিদ্দিকের ‘চরবিনাশ কাল’ এর গল্পগুলো এই জনপদেরই প্রতিচিত্র। ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের ফলে পশ্চিমবঙ্গের তৎসংলগ্ন জীবনের বিপন্নতা আর দারিদ্র্যমলিনতার চিত্র ফুটে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের কথাশিল্পী অসীম রায়ের ‘কচ ও দেবযানী’ এবং জয়ন্ত জোয়ার্দারের ‘ভূতনি দিয়ারা’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘দুখিয়ার কুঠি’, আবুল বাশারের ‘ভোরের প্রসূতি’ প্রভৃতি উপন্যাসে। এইসব উপন্যাস পদ্মানদীর দুই তীরের জীবনকে ধারণ করে আছে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা ও দারিদ্র্যের  দুষ্টক্ষতগুলো এইসব উপন্যাসে সমাজতাত্ত্বিক স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম মুনির এই জনপদে অন্বেষণ করেছেন নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর নিষিদ্ধ জীবনের রূঢ়চিত্র। বলা যায়, এই অঞ্চলের অন্ধকার জগৎ চোরাচালানের উপর তিনিই প্রথম আলো ফেলেছেন।।
আগামী প্রকাশনীর সযত্ন তত্ত্বাবধানে ‘আবর্ত’, ‘পদ্মা উপাখ্যান’ ও ‘রক্তভেজা অববাহিকা’ উপন্যাস তিনটিকে এক মলাটভূক্ত করে ‘নদীজীবন চরজীবন’ প্রকাশ করা হচ্ছে। মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও সৃজনশীল সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা সংস্থা আগামী প্রকাশনী।
আগামী প্রকাশনী থেকে ‘নদীজীবন চরজীবন’ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় ওসমান গনি আমাকে চির কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করলেন।
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন