1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

দোল দিয়ে যায় হাওয়া: শাহাব আহমেদ

  • আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ২ নভেম্বর, ২০২১
  • ১০১ দেখেছেন
দোল দিয়ে যায় হাওয়া

 

বোস্টন এয়ারপোর্টে নেমে গাড়ি নেই এবং শুরু হয় আমাদের নিউ হ্যাম্পশায়ার যাত্রা। নদী নালা গাছ-পালা বন পাহাড় হ্রদ ও অবিস্মরণীয় নৈঃসর্গিক সৌন্দর্যের দেশ নিউ হ্যাম্পশায়ার। এখানে বনে বনে দোল দিয়ে যায় হাওয়া।

এখানে পথেরা খরগোসের মত চঞ্চল, সরু ও সুন্দর।

কয়েকটি হাইওয়ে অতিক্রম করে এসে পৌঁছাই ফ্রান্সিসটাউনে। ক্রোচড মাউন্টেইন ভ্যালির ঘন বনের ভেতরে অবস্থিত মধ্য নিউ হ্যাম্পশায়ার স্ট্যাটের একটি ছোট্ট শহর এটি। পলাশীর যুদ্ধের ১৫ বছর পরে প্রতিষ্ঠিত শহরটি এতই ছোট যে আমাদের ঝাউটিয়া গ্রামের চেয়ে বড় কিছু মনে হয়না। আমাদের গ্রামে মুদি দোকান ছিলো গোটা দুই, এখানে একটাও নেই। শহরে পানজর্দার দোকান তো নেই-ই, কোনো ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, শুঁড়িখানাও নেই। মানুষ বাজার করতে যায় ২৫-৩০ মাইল বা তারও চেয়ে দূরে। অবশ্য গির্জা একটা আছে, বহু পুরানো। আমাদের মসজিদের মতই অতি প্রয়োজনীয় গির্জা এইদেশে, রাস্তার শয়তান রাস্তা থেকে কিছুসময়ের জন্য হলেও সরিয়ে রাখার জন্য। সাপের পিঠের মত  ডানে,  বামে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে রাস্তাগুলো, কখনও অনেক নীচুতে গড়িয়ে যায়, কখনও আবার উপরে উঠে আসে।

এতই ঘনবন দু’পাশে যে নেট পাওয়া যায়না।

GPS পথ হারিয়ে ফেলে একটি বাড়ির সামনে এসে বলে, “এসে গেছো”, তারপরে চুপ করে যায়, আর কোনো টুশব্দ নেই।রিসোর্টের নাম গন্ধও আশে পাশে নেই।

কল করি।

তোমরা কোথায়?

কোথায় কে জানে, একমাত্র সনাক্তকারী চিহ্ন লম্বা লম্বা গাছ, গুনেও শেষ করা যায়না। কিছুটা বর্ণনা দিতে চেষ্টা করি।

আরও সামনের দিকে এগিয়ে আসো, বলে ফোনটি কেটে দেয় বা কেটে যায়। কিন্তু সামনের দিকটি যে কোন দিক, বুনো বনে তা বোঝা মুশকিল। অবশ্য বনের বাইরেও তাই।

রাশিয়ায় চুটকি শুনেছিলাম: বাসে হ্যান্ডেল ধরে সামনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল একজন চুকচি। মেরু এলাকার আদিবাসী সে। শহর ও জনপদের লোকজন ওদের চরম নির্বোধ মনে করে। বাস এগিয়ে চলেছে। পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে, বলতে পারেন, নেভস্কি প্রসপেক্ট কোন দিকে?

সে তো উল্টা দিকে।

ও, তাই না কি? ধন্যবাদ।

বলে চুকচি ডান হাতে ধরা হ্যন্ডেলটি বাম হাতে ধরে উল্টা দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। উল্টা দিকে তাকিয়ে থাকা মানে যে উল্টা দিকে যাওয়া নয়, সেটা বাংলাদেশের বেদুইনদের কে বোঝায়?

আমদের গাড়ির মুখটি যে দিকে তাকেই সামনে মনে করে যাত্রা শুরু করি। পড়ন্ত বিকেল। একটা গোরস্থান পার হয়ে গেলাম। কত কত গাছপালা! ঘন সবুজ। গাছের ফাঁক দিয়ে রৌদ্র এসে পড়েছে চিক চিক করে সোনার হরিণের মত, অথবা কী জানি মায়ের হাতের সোনার বালাও হতে পারে।

একজন লোক খালি গায়ে শস্যের খেতে জল দিচ্ছে। সবুজ টমেটো ঝুলে আছে অনেক, কিছু সোমত্ত ভুট্টার চারা মাথা তুলে তাকিয়েছে। ফুলও ফুটেছে কিছু।আর কোনো লোক চোখে পড়েনি।

গাড়ি থামিয়ে চুকচির মতই প্রশ্ন করি, ক্রোচড মাউন্টেইন রিসোর্টটি কোথায় বলতে পারেন ?

সে তো অন্য দিকে, তোমরা উল্টা যাচ্ছো। মাইল তিনেক যাবার পরে হাতের বামে পড়বে মাউন্টেইন রোড, সেই রোড ধরে কিছুক্ষণ গেলে পাবে। গাড়িতে চুকচির মত ঘুরে বসার উপায় নেই। পুরোটা ঘুরিয়ে উল্টা দিকে যেতে হয়।

এবার আমরা শহরের কেন্দ্রিয় চত্ত্বরে পৌঁছাই, সাদা রংয়ের বেশ উঁচু সুন্দর ও পুরানো ইমারত, তার ওপরে টাওয়ার, সেখানে কালো রংয়ের ঘড়ি, ঘড়ির ওপরে গির্জার ঘণ্টাঘরের মত কক্ষ। টাওয়ারের চুড়ায় ক্রুস নয়, একটি মেটালিক দিক নির্দেশক। এই ইমারতের দরজার ওপড়ে বড় করে লেখা “ফ্রান্সিসটাউন স্ট্রং”, ডানে লেখা “ওল্ড মিটিং হাউজ”।

এর উল্টাদিকে আরও একটি সুদর্শন সাদা বিল্ডিং আছে, আমার যৌবনের চুলের রংয়ে রং তার। এরও সামনে একটি অনুচ্চ টাওয়ার, তাতে রেলিং দেয়া জানালাঅলা ছোট একটি কক্ষ, চতুস্কোণাকার গম্বুজাকৃতির চাল এবং তার ওপড়ে পাখা ঝাপটাচ্ছে বিশাল সোনালি ডানার চিল।

 

দুইপাশে বেশকিছু দৃষ্টিনন্দন ও পরিপাটি বাড়িঘর পার হয়ে যাই। কোনো কোনো বাড়ির সামনে সাদা সাদা ফুলে হেসে উঠেছে “ডগউড” ট্রি। এত সুন্দর গাছগুলো! ওদের দিকে তাকালে যে কারো মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু নামটি কেন

যে “ডগ উড” মানে “কুত্তা কাঠ” বা “কাঠ কুত্তা”, এমন কি কারো মনে হতে পারে “কুত্তার বন” অথবা “বন কুত্তা” সেই প্রশ্ন করে আমাকে লজ্জা দেবেন না।

বহু কষ্টে মাউন্টেইন রোডের সাইনটি চোখে পড়ে। এগিয়ে যাই। যেখানে পৌঁছাই তার নাম “মাউন্টেইন ইন।”

আমাদেরটির নাম অন্য। আবার ফোন করি, আগের সেই সুরেলা কণ্ঠ বাংলাদেশের ইন্জিন-চালিত নৌকার মত ভট্ ভট্ করে যে ইন্স্ট্রাকশন দিলো তাতে প্রতীত হলো এবার আমরা বেশি দূরে চলে গেছি, পিছিয়ে আসতে হবে। যেহেতু দু’পাশেই বন এবং বনের চেহারায় কোনো ব্রিটনি -ব্রিজিত-ব্রিয়ানা ভেদচিহ্ন নাই, আমরা পেছনের দিকে যেতে শুরু করি। রাস্তা সুন্দর, বন সুন্দর, এবং ছুটি কাটাতে আসায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের তাড়াহুড়ো নেই, তাই গল্প গুজব করে গাড়ি চালাতে চালাতে কিছুক্ষণ পরে নিজেদের আবার শহর চত্বরে আবিস্কার করি। পথ ভুল করায় আমার জুড়ি নেই।

ভুল পথ হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর ও হাতছানি দেয়া পথ, চে গাভারা’র চারু মিশ্রিত স্বপ্নীল সৌন্দর্যের পথ। এবার হেসে ফেলি দুজনেই হো হো করে। বলি, “কানা ভোলায়” পেয়েছে আমাদের।

“কানা ভোলা কি?”

লজিকাল প্রশ্ন- আমি গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে নয়-ছয় কিছু বলে বোঝাতে চেষ্টা করি। সে বোঝেনা। ওদের দেশে নাকি কানাভোলার অস্তিত্ব নেই।

“লেনিনের মৃত্যুর পরে বলশেভিক পার্টি ও বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীদের কি কানাভোলায় পায়নি?” কথাটা ঠোঁটে এসে গিয়েছিল কিন্তু তৎক্ষণাৎ চিবিয়ে গিলে ফেলি।

আমাদের দেশের বুদ্ধিবৃত্তির যে লোকজন চে গাভারা, মাও, চারু মজুমদার, মণি সিংহ ইত্যাদি আরও বহু বিপ্লবীকে আদর্শ মানে, রাশিয়ার লেনিন পরবর্তী কমরেড ব্রবডিঙনাঙ হলো তাদের বড়পীর, সর্বকালের সর্বসেরা কানাভোলা, যে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোকগুলোকে সম্মোহিত করে রেখেছিল প্রায় ৬ দশক। যে বুদ্ধিমানদের কাছ থেকে বুদ্ধিহীনের মত কাজ আদায় করে নিতে পারে, সেই হলো কানাভোলা।

আমি এই কথাটিও বলবো কি বলবো না, তা ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ পরেই হাতের ডানদিকে দেখি সরু, পিচহীন কাঁচা রাস্তা নেমে গেছে। এবার তাই ধরি। বন, বন, বন। হিড়িম্বার গৃহ নির্জন। বাদামি পিঠে কালো ডোরা-কাটা কাঠবিড়ালীর মতই দেখতে, কিন্তু সোজা লেজের, মেঠো ইঁদুর সমান একটা প্রাণি দাড়িয়ে আছে গাড়ির সামনে। চিপমাঙ্ক ওটা, নিরীহ ও নির্বোধ। কিছুক্ষণ ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে ও দৌড়ে পালায় এবং আমরা গন্তব্যে পৌঁছাই।

কাউন্টারে তিনি, যার কোমল কণ্ঠ আমাদের ফ্রান্সিসটাউনে ‘তালৈ ঘুর্ণা’ ঘুরিয়েছে এতক্ষণ। “এসে গেছো? যাক, চিন্তামুক্ত হলাম, আমাদের জায়গাটা এমনি, লোকজন সহজে খুঁজে পায়না।” ক্যাটি গদগদ কণ্ঠে বলে। একটা বাচ্চা হাতির মত বড়, সরল ও সুন্দর সে, হাসিটি পাঙ্গাস মাছের পেটির মত।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ক্ষুধাও পেয়েছে।

আশেপাশে দোকান পাট আছে?

আমাদের এখানে নেই, ম্যাপ দেখিয়ে বলে এই যে আমরা এখানে যাই বাজার করতে, মাত্র ১৫ মিনিটের ড্রাইভ।

জানি এদের ১৫ মিনিট, ৫০ মিনিটও লাগতে পারে ১৫ মিনিট শেষ হতে।

খেতে চাইলে, ওখানে খেতে পারো, তর্জনি তুলে দেখায়, সচরাচর সোমবার বন্ধ থাকে, আজই প্রথমবার খুলেছে।

একই বিল্ডিংয়ে গল্ফ ক্লাব, সেখানে ছোট একটা রেস্টুরেন্ট। এগিয়ে যাই। লিকলিকে, ডাঁটা ডগার মত সতেজ একটা মেয়ে আমাদের বসতে দেয়। ক্যালোরি প্রাচুর্যের দেশে অনেক মেয়েই এখন উট, দুম্বা ও হাতির মত দেখতে। সুন্দর নিঃসন্দেহে, রেঁনেসা যুগের শিল্পীদের আঁকা ডাসা-আপেল মেয়েদের মত। অবশ্য ছেলেরাও এখন প্যাঁদা প্যাঁদা হারকিউলিস।

সুতরাং খুশিমনেই  ছিপছিপে মেয়েটির পেছনে হেঁটে গিয়ে

বসলাম। মেন্যু এল, অর্ডার করলাম। খাদ্য যখন এলো, মুখে দিয়ে মনে হলো না খেলেও মনে থাকবে।

অন্ধকার তখনও নামেনি, পায়তারা করছে। রিসোর্টের সামনে গাড়ি পার্ক করে বের হতেই একটা তীব্র ফুলের গন্ধ নাকে এলো। দেখি সামনেই বেশ বড় একটি গাছ। গোছা গোছা সাদা ফুলে সয়লাব।

“চেরেওমুখা!”- শ্বেতা চিৎকার করে ওঠে। রাশিয়ার মে মাসের ফুল। সে স্পর্শ করতে ছুটে যায়। কিন্ত পাতা চেরেওমুখার মত নয়, লাইলাকের মত।

সাদা লাইলাক? তাও মে মাসেই ফোঁটে কিন্তু ফুল তো লাইলাকের মত নয়। হিসাবে মেলেনা।

সে মাথা চুলকায়।

মনে হয় লাইলাক ও চেরেওমুখার হাইব্রিড-সে সমাধান খুঁজে বের করে।

আমরা লাগেজ নিয়ে ঘরে ঢুকি।

চারদিকে বন নির্জন, সেখানে কয়েকটা বিল্ডিং, পাশে পরিপাটি গল্ফ কোর্ট, দূরে পাহাড় এবং আমাদের স্থানটি পাহাড়ের উপত্যকা হলেও অনেক উঁচুতে।

আগামি পাঁচদিনের জন্য এই আমাদের ঠিকানা।

 

রাতে খুব ভালো ঘুম হয়েছে। না হবার কোনো কারণ নেই, পথের ক্লান্তি, অক্সিজেন-সমৃদ্ধ বিশুদ্ধ বাতাস এবং নির্জনে সবচেয়ে প্রিয় বুকের ওম খুব কাজে লেগেছে। খুব ভোরে উঠে বারান্দায় দেখি পেছনের বনে পাখিরা ইতিমধ্যেই দোকান খুলে বেচা-কেনা ও দামা-দামির হাট বসিয়েছে। এদের গলার জোর অনেক, গায়ে গতরে শক্তিও কম নয় মনে হয়।

কিছুক্ষণ ব্যয়াম করি, মনটা ফুর ফুরে লাগে। শ্বেতা এখনও ঘুমাচ্ছে। আমি সকালে ওঠা মানুষ, সে উল্টা। একটু কিছু লিখতে চেষ্টা করি, মন বসেনা। আস্তে আস্তে রোদ এগিয়ে আসে পরিপাটি ঘাসের গালিচা গড়িয়ে।

একটা মেয়ে পাশের বারান্দায়, ১৩ কী ১৪, রোদ এসে চিক চিক করছে তার গালে। চুলে রামধনুর সাত রং, ঠোঁটে পিয়ার্সিং। এত সুন্দর চেহারা! কিন্তু একেবারে নষ্ট করে ফেলেছে। চুলগুলো ওভাবে রং না করলে, ঠোঁটে কদর্য ওই দুলটা না থাকলে রোদের সোনালি আভায় কী অদ্ভুতই না লাগতো তাকে! কী একটা বিষণ্ণতা তার চোখে।

সুপ্রভাত বলি। সে ফিরে তাকায়, মাছের চোখের মত সুন্দর শীতল চোখ, কোনো কথা না বলে চলে যায়। গত সপ্তাহে অবিকল ওর মত দেখতে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিল পিতামহী। বয়েস ১৩, সীমাহীন বিষণ্ণতায় (depression) ভোগে। উৎকট উদ্বিগ্নতা (anxiety) খেয়ে গেছে প্লীহার অন্তস্থল। স্কুলে ফেল করছে, কোনোমতেই স্কুলে যাবে না, ভয় পায়, কেঁদে জার জার করে। একা হলে ব্লেড দিয়ে উরু, বাহু, পূর্ববাহু কাটে।

আত্মহত্যা করতে চাও?

না

কাটো কেন?

চুপ করে থাকে।

কেটে যে ব্যথা পাও, যে রক্ত ঝরে, তা মনের ব্যথাকে শিথিল করে-তাই?

হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ে।

বিষণ্ণ কেন?

জানি না।

আসলে জানে, কিন্তু সে কৃমির ক্যান উন্মুক্ত করতে চায়না।

মা ছিলো স্কুল শিক্ষক, বাবা চিট করেছিল। মা ডিভোর্স দিয়েছিলো তাকে। চার ভাই-বোন। থাকতো মায়ের সাথে। সন্তানদের কাস্টোডি নিয়ে কোর্টে চলছিল উন্মত্ত লড়াই। পাটার ওপরে ছোট্ট রসুনের কোয়া ছিলো বাচ্চাগুলো।

বিষণ্ণ কালি-ঝুলি মাখা দিনরাত। মায়ের জীবনে অন্য

এক পুরুষ আসে এবং তারা বিয়ে করে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নেয়।

এক রৌদ্রময় অপরাহ্নে বাবা আসে। প্রথমে মাকে, তারপরে তিন ভাইবোনকে একে একে গুলি করে হত্যা করে, তারপরে নিজের মাথায় বন্দুকের নল রেখে ……। সবকিছু ঘটে তার চোখের সামনে। মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত! কেন বাবা তাকেও হত্যা করলো না, কেন সারা জীবনের জন্য এই ‘হরর’ তার চোখের সামনে রেখে গেল, এ প্রশ্নের উত্তরটি সে আজও পায়নি। সব সমাধান হয়ে যেতো, যদি বন্দুকের নলটি তার প্রতি সদয় হতো। সেই থেকে বেঁচে থেকেও সে বেঁচে নেই, সর্বত্র হুল খোলা ভয়! গত সপ্তাহে স্কুলে একটা ঘটনা ঘটেছে যা তার মনের ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিনাশ করে দেয়। ক্যাফেটেরিয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছিলো। সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ছেলে, কোনো ভুমিকা ছাড়াই বলে, “ডু ইউ ওয়ান্ট মি টু রেইপ ইউ?”

 

তার হাতে যা ছিল পড়ে যায়, কে যেন তার গলা চেপে ধরে এবং তার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ডটা কাঁধে তুলে দৌড়াতে থাকে কে? সে নিশ্চিত হয় যে সে মারা যাচ্ছে। যদিও সে সব সময়ই মরতে চায় কিন্তু সেই মুহূর্তে মৃত্যুকে ভীষণ অপরিচিত মনে হয়। তার আর কিছু মনে নেই। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে এম্বুলেন্সে আবিস্কার করে। ইমারজেন্সি রুমে ডাক্তার পরীক্ষা করে বলে, প্যানিক অ্যাটাক! ভয় নেই, বাড়ি যাও।

ভয় নেই- ডাক্তার বলে, কিন্তু ভয় জানালার বাইরে, দরজার চৌকাঠে, অন্ধকারের থিক পরতে। তাই তারা আমার কাছে এসেছে। অসাধ্য সাধন হতে হবে। এই মেয়ের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া পৃথিবীটাকে ভয়-প্রুফ রিফু করে দিতে হবে।

অথচ আমার নিজেরই কত ভয়!

প্রশ্ন উঠবে ছুটিতে এসে জীবন-পাতিলের নীচের কালি গায়ে মাখি কেন? আমার পিতার দোষ। সেই জন্মের সময় আজান দিয়ে বলেছিলো, ঢেঁকি হয়ে বাঁচো বাপ, ঢেঁকি হয়ে নাচো।

সে নিজে ওভাবেই বেঁচে গেছে। আমিও নাচছি জীবন মঞ্চে, ঢেঁকি না বানর, না দুটোই বলা মুশকিল।

 

এই তো দেশ থেকে খবর এসেছে অযুত অর্বুদ টাকা খরচ করে যে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে তারই দেড়-দুই মাইলের মধ্যে পদ্মা গিলে খাচ্ছে লোকালয়, হাজার হাজার মানুষকে নি:স্ব ও গৃহহীন করে, গিলে খাচ্ছে শতবছরের পুরানো কালী মন্দির এবং পাঁচকুড়ি বছরের ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মনগাঁও হাই স্কুল, আমার পিতা ও পরিবারের ঘাম ও শ্রম যে স্কুলের মাটিতে ও দেয়ালে লেগে আছে। অথচ ক্ষমতার কুম্ভকর্ণদের ঘুম কী-ইনা গভীর!

আমার ঘরও আছে বাহিরও আছে। পদ্মাতীরের মানুষগুলোর ঘর বাহির দুটোই গেছে বা যেতে বসেছে। আমার ভিটা তো গেছেই, বস্তু মূল্যের চেয়ে স্মৃতিমূল্য যার অপূরনীয়। চোখে অশ্রু টল টল করে সেই স্মৃতির বেদনায়, কুমিরের অশ্রু মনে হতে পারে কিন্তু যা মনে হয় তার সবটাই সত্য নয়।

 

সুপ্রভাত!

সুপ্রভাত!

শ্বেতা উঠে এসেছে। ভোরের বিভাসা সে বিস্রস্ত নিশার গাউনে। দেখেও দৃষ্টি ফেরেনা।

চল একটু হেঁটে আসি।

চটপট তৈরি হয়ে বের হয়ে পড়ি।

নির্জন বন-পথ, পাশে কয়েকজন নেমে পড়েছে গল্ফ কোর্সে।

মাঝে মধ্যে একটা দুটা বালুবাহী ট্রাক যাচ্ছে নির্জনতা ভেঙে।

কিশোরি রোদ গায়ে উম দেয়। পাখির ডাক ঠাকুর দাশের দোকানের মুরলি ভাজার মত। হাওয়া যেন মায়ের হাতের পরশ!

কী প্ল্যান আজ, কোথায় যাবে?

গুগল সমাধান খুঁজে দেয়। নাস্তা শেষ করে ছুটি নর্থ হ্যাম্পটনের দিকে। ফুলার গার্ডেনে যাই প্রথম। গোলাপ আর গোলাপ, গোলাপের স্বর্গ। ১২৫ পদের ১৫০০টি গোলাপের গাছ আছে। বিশাল বিশাল গোলাপ, কোনো কোনোটি দুই মুঠোর চেয়েও বড়।

শেখ সাদীর বাগানের গোলাপ না ফুলার সাহেবের গোলাপ কোনটি যে বেশি বড় বলা মুশকিল। তবে নিজ বাগানের গোলাপের গন্ধে মাথা ঝিমঝিম সাদী নাকি প্রেমিকার বুক ছাড়া অন্য কোথাও চুমু খেতেন না, অন্তত সের্গেই ইয়েসিনিন তাই বলেন। আমি তারই দেশের এক রূপসীকে নিয়ে ফুলার সাহেবের বাগানে ঘুরছি। যদিও ফুলের মত বুক তার

বুকে সেটে থাকে কিন্তু ঐ যে শৈশবে সে শ্লোগান শিখেছে “ভিয়েতনাম থেকে মার্কিনিরা হাত গুটাও, হাত গুটাও!”

সে তা এখনও ভুলতে পারেনি। তার বুক যেন ভিয়েতনামের মাটি।

 

এখানেও সারা বাগান মাথা ঝিম ঝিম মাতোয়ারা গোলাপের গন্ধে। গোলাপ ছেড়ে যাই বড় বড় পিওনি ফুলের বেডে, সাদা বকের পালকের মত নরম অথবা হাল্কা গোলাপী মেঘের মত তুলো তুলো ফুল যেন হাতেই গলে যায়। তাদের পাশে মাথা নেড়ে ওড়ে ঘন গোলাপী ডালিয়ার ঝাঁক। সাদা রংয়ের একটি ভাস্কর্যে মগ্ন এক বালক হাতুড়ি বাটাল হাতে কোনো একটি মুখ খোদাই করছে।

গ্রিন হাউজ ভরে আছে নানা ধরনের অর্কিড, ক্যকটাস ও ট্রপিকাল গুল্ম-পাদপ। জাপানি গার্ডেনে একটি ছোট্ট পুকুরে সাঁতরায় রং-বেরংয়ের কৈ মাছ। পুকুরের ওপরে ছোট্ট কাঠের সেতু। তা পার হয়ে গেলে ডানদিকে ডালপালা বাঁকানো বৃদ্ধ সিডর বৃক্ষের সারি আর বামদিকে হাল্কা খয়েরি জাপানি মেপল গাছ। তারই  ছায়ায় ঝর ঝর করছে পাথরের ঝর্না।

 

নিউ ইংল্যান্ডের সফল ব্যবসায়ি এ. টি. ফুলার তার স্ত্রী ভাইওলার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে এই বাগানটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯২৭ সালে। অসম্ভব দারিদ্রে কাটে তার যৌবন, সপ্তায় মাত্র ৭.৫০ ডলার বেতনে কাজ করতেন একটি রাবার ফ্যাকটরিতে। রাতে রাতে পড়াশুনো করে শিক্ষা অর্জন করেন। সাইকেল চালানো ছিলো তার নেশা। একসময় বিশাল নিউ ইংল্যান্ড এলাকায় সাইকেল চালানোয় চ্যাম্পিয়ন হন। এরপরে গোয়াল ঘরে বসে পুরানো সাইকেল রিপেয়ার করে বিক্রি করতে শুরু করেন। ২১ বছর বয়সে ইওরোপ ভ্রমণ করে ঘরে ফেরার সময় দুটো গাড়ি নিয়ে আসেন। উঁচু দামে গাড়ি দুটি বিক্রি করে গাড়ির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। অঢেল অর্থের মালিক হন। তারপরে রাজনীতিতে ঢুকে ২ টার্মের জন্য ম্যাসাচুসেট স্ট্যাটের গভর্নর নির্বাচিত হন। সমুদ্রের তীরে তার একটি গৃষ্মকালীন ম্যানশন ছিল, তা এখন আর নেই। এখন সেখানে গ্রিলের দেয়াল ঘেরা শূন্যস্হান, তার পরে সমুদ্র। পাশেই একটি চ্যাপেল, এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

ফুলার ম্যানশনের পেছনে ৩ একর জমির ওপরে তৈরি করা হয়েছিল পরিপাটি এই বাগানটি। টিকেট কেটে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে বয়স্ক এক রেড উড ট্রি একদিকে, সাদা ফুলে ফুলে পাগল-পরাণ একটি ডগউড ট্রি অন্যদিকে।

 

অপার মুগ্ধতা নিয়ে বের হয়ে আসি।সমুদ্র তীরঘেষা অপূর্ব সুন্দর হাইওয়ে ধরে যাই পোর্টস্মিথ (Portsmouth) শহরের ডাউনটাউনে। সমুদ্রতীরবর্তী সুন্দর শহর। সময় কাটানো, ঘোরাঘুরি করার অনবদ্য স্থান। কিন্ত খুব বেশি সময় অপচয় না করে চলে যাই “স্ট্রবেরি ব্যাংক মিউজিয়াম” দেখতে। ফুলার গার্ডেন থেকে বেশি দূরে নয়। ১০ একর জুড়ে এই মিউজিয়মটি সপ্তদশ শতাব্দি থেকে শুরু করে এলাকার আদি ইওরোপিয়ান অধিবাসীদের অনেকগুলো বাড়িঘর সংরক্ষণ করেছে। এদের আনা হয়েছিল মুনাফার জন্য। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তাদের ফিরিয়ে নেবার কথা ছিলো কিন্তু যখন দেখা গেল তাদের ফিরিয়ে নেয়ায় অযথা খরচ, তাই ফিরতি জাহাজ আর আসে না। শীত প্রচণ্ড, শস্য নাই, বৈরি পরিবেশ। তারা আস্তে আস্তে বসতি স্থাপন করে। আকাশচুম্বী পাইন বৃক্ষের বন কেটে শুরু করে জমজমাট টিম্বারের ব্যবসা। সমুদ্রগামী জাহাজ ও জাহাজের মাস্তুলের জন্য ব্যবহৃত হতো।

১৯৫৭ সালের দিকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে পিসকাটাকুয়া নদী তীরবর্তী এই এলাকার পুরানো জরাজীর্ণ, সেই সপ্তদশ শতাব্দী থেকে চলে আসা বাড়িগুলো ভেঙে চুড়ে আধুনিক নতুন শহর তৈরি করা হবে এখানে। কিন্তু বাঁধ সাধে ডরোথি ভন নামে এক লাইব্রেরিয়ান, “আমাদের ইতিহাসকে এভাবে হারিয়ে দিতে দেয়া যায়না।” স্থানীয় রোটারি ক্লাব এগিয়ে আসে। সিদ্ধান্ত হয় একটি মিউজিয়াম করার।

তারাই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঐতিহাসিক মূল্য আছে এমন বাড়িগুলো এখানে এনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে।

 

আমাদের বৃদ্ধা ট্যুর গাইড দেখায় তার প্রপিতামহের ছবি, যে একটি ভেলায় করে ঘাস নিয়ে গুণ টেনে নিয়ে যাচ্ছে নদী তীর দিয়ে। ১০ একরের এই স্থানের ওপর দিয়ে নদী ছিল। তা এখন আর নেই, ভরাট করা হয়েছে। স্মৃতিময় কয়েকটি বাড়ি ঘুরে দেখি। বেশ বড় একটি বাড়িতে সেই কয়েক শ বছর আগে বপন করা হয়েছিল ফক্সগ্লোভ গুল্ম। এখনও আছে।

ট্যুর গাইড প্রশ্ন করে, বল তো এত আগে এখানে এই গাছগুলো কেন লাগানো হয়েছিল?

মাথা চুলকাই। মেডিকেল স্কুলে পড়ার সময় জেনেছিলাম ফক্সগ্লোভ থেকে তৈরি হয় ডিজিটালিস। প্রায় শতাব্দী জুড়ে হার্টের রোগের মহৌষধ ছিল তা-ই।

হার্টের রোগী ছিলো কি এই বাড়িতে?

তুমি কি ডাক্তার?

মাথা নাড়াই।

এই বাড়ির গৃহিনীর রূপ ছিলো চোখ ঝলসানো, পরিশ্রম করতো প্রচুর, বাগান করতে পছন্দ করতো, ধীরে ধীরে ক্লান্তি ঘিরে ধরে তাকে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ডাক্তারের পরামর্শ মত স্বামী এনে বুনে দেয় ফক্সগ্লোভ। এই গাছের পাতা সিদ্ধ করে নিয়মিত পান করতো সে। তার জীবন কিছুটা হলেও প্রলম্বিত হয়, একটু ভালো বোধ করে সে। কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়। তার যৌবন অক্ষয়ে স্তম্ভিত হয় এবং তারই হাতে বোনা ফুলগুলো অযত্নে মলিন হয়ে যায়। মিউজিয়মের অধীনে বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

 

পাশেই “গুডউইন ম্যানশন” আনুমানিক ১৮১১ সালে তৈরি। গভর্নর গুডউইনের বিলাসী বাড়ি। এ বাড়িটিও শহরের অন্য এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে। ইসাবড গুডউইন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন,তার বিশাল এক কাপড়ের ফ্যাক্টরি ছিল। গৃহযুদ্ধের সময়ে আব্রাহাম লিঙ্কনের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ অর্থে ফার্স্ট নিউ হ্যাম্পশায়ার রেজিমেন্ট গড়ে তোলেন।

বাড়িটি ঘুরে দেখি। বহু ইতিহাস এখানে। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন পির্স এ বাড়ির অতিথি ছিলেন, ম্যানিলা বে’ তে স্প্যানিশ-আমেরিকার যুদ্ধে স্প্যানিশ নৌবহরকে হারিয়ে দেয়ার খ্যাতিমান যোদ্ধা জর্জ ডিউই এই বাড়ির জামাই। গৃহকর্ত্রী সারাহর ছিল গাল-পালা ফুল ও লতা-গুল্মের

শখ। তৈরি করিয়েছিলেন একটি গ্রিন হাউজ। বহু গাছপালা সেখানে। জাঙ্গলার ওপরে জড়াজড়ি করে আছে প্যাশন ফ্লাওয়ারের লতা। কী যে অপূর্ব সুন্দর একটি ফুল ফুটেছে!

আগে কখনই দেখিনি।

 

হেঁটে অন্য এক বাড়ির সামনে যাই। লম্বা একজন লোক কাঠের কাজ করছে। আমাদের দেখে ফিরে দাঁড়ায়, শুভদিন-অভিবাদন জানায়।

শুভদিন-কী করছেন?

কাঠের ব্যারেল বানাচ্ছি। আগের দিনে জাহাজীরা খাদ্য ও পানীয় নিত এইসব ব্যারেলে করে। দেখতে সহজ হলেও বানানো কিন্ত সহজ নয়। সে তার ট্রেডের খুঁটিনাটি দেখায়।

তোমরা কোথা থেকে এসেছো?

ফ্লোরিডা!

বাহ্ বেশ দূর তো!  তারপরে শ্বেতার দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার ইংরেজীতে রাশিয়ান এক্সেন্ট। আমার বেশ কিছু রাশিয়ান বন্ধু আছে, তোমার মত করে কথা বলে।

আমি সেইন্ট পিটার্সবুর্গের মেয়ে।

তাই নাকি? আমার পূর্বপুরুষেরা লিথুনিয়ান। সেই জারের আমলে চলে এসেছে। আমি সেইন্ট পিটার্সবুর্গ বেড়াতে গিয়েছিলাম, খুবই সুন্দর শহর।

আর তুমি?

বাংলাদেশ।

বাহ্? আমি তো কিছুদিন ঢাকায় ছিলাম। সে আমাদের খাদ্য ও লোকজনের প্রশংসা করে। তোমাদের ওখানে ট্রাফিক জ্যাম একটু কমেছে কি?

অনেকগুলো লম্বা লম্বা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একটি বেশ ঝাঁকড়ানো ও সুন্দর।

ওই যে ওই কোণায় গাছটি ওটা কী গাছ বলতে পারো?

জাপানি কাতসুরা।

যখন হেরনান্দো যাই হ্রদ-সংলগ্ন আমাদের লগ কুটিরে, ছোট একটি রাস্তা পড়ে-কাতসুরা। ওটা যে একটি গাছের নাম জানতাম না। এত জানা বাকি রেখেই মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে! ভদ্রলোকের সাথে বেশ গল্প জমে, প্রায় মিনিট বিশেক, কথা তার থামে না। সম্ভবত কাজই তার কথা বলা, ব্যারেল বানানো ফাও।

আরও একটি বাড়ি আছে, একজন কালো মানুষ ছিলো সেই বাড়ির মালিক।এতকাল আগেও কালো মানুষদের কেউ কেউ বেশ সম্পন্ন ছিলো, যদিও তা ছিল নিতান্তই ব্যতিক্রম।

এরপরে বৃষ্টি নামে, আমরা গাড়িতে চড়ে বসি।

গাড়ি চলছে মসৃন হাইওয়ে ধরে, গতি চমৎকার! কোনো বাঁধা ট্রাফিক জ্যাম নেই।

পাশের সিটে বাইরে তাকিয়ে আছে শ্বেতা।

বলি একটু ঘুমাও।

আমি ঘুমালে তোমাকে পাহারা দেবে কে?

হাসে।

একবার হাইওয়েতে ৮৫ মাইল বেগে একা গাড়ি চালাতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ২০০৩ সালে। সাউথ ডাকোটার হাইওয়ে গড়ের মাঠের মত, গাড়ি বার দুয়েক পল্টানি খেয়ে দুমড়ে মুচড়ে দাঁড়িয়েছিল সবুজ ভুট্টার ক্ষেতে। যে আমি লিখছি সে আদৌ আমি কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

 

 

তৃতীয় দিন। গাড়ি ছাড়ি ম্যানচেস্টারের দিকে। নেটে ছবি দেখেছি, বড় সুন্দর শহর। শহর ঘুরে যাবো মেসাবেসিক হ্রদ দেখতে। জলে অ্যামিওবা হয়ে জন্মেছিলাম ঈশ্বরেরও স্বয়ম্ভু হবার বহু আগে, জল তাই টানে পায়ে দড়ি বেঁধে।

GPS বলে এই দিকে যাও, আমি যেহেতু জন্ম থেকে কনফিউজড, যাই অন্য দিকে। পথ হারানোতে সচরাচর লোকসানই বেশি কিন্তু সারপ্রাইজ! আমাদের তুমুল লাভ হয়েছে।

গফসটাউন নামে একটি ছোট্ট শহরের প্রেমে পড়ে গেছি। গাছে গাছে আলুঝালু আঁকা বাঁকা উঁচু-নীচু রাস্তা এবং

সেই রাস্তায় অপূ্র্ব সুন্দর সুন্দর বাড়ি-ঘর, রূপকথায় দেখা

গৃহদের মত।

একটার থেকে চোখ ফিরাই অন্যটায় দেখি দিবার গালের রোদ আদিবা’র চোখে, প্রতিভার চুলের ঢেউ প্রতিমার পিঠে। রাস্তা অনেক উঁচুতে অথচ গাছের দেয়াল ভেদ করে বহু নীচে দীঘি চিকচিক করে।

কিন্তু GPS ঘ্যানর ঘ্যানর করে আমাদের ঠিকই সৎ পথে তুলে দেয়। চলছি। ডানে বড় পরিপাটি গোরস্থান, মনে হয় ওখানে গিয়ে শুয়ে একটু বিশ্রাম নেই, কিন্তু এগিয়ে যাই।

সুন্দর বাড়িঘর রাস্তা।

এরপরে বামে পড়ে আরও একটি গোরস্থান। তেমনি সুন্দর, পরিপাটি, সমাধিস্তম্ভগুলো বেঢপ সাইজের নয়, প্রায় সম-সাইজের, সামঞ্জস্য রক্ষা করে। ফুলের তোড়ায় সাজানো প্রায় প্রতিটি। তবে সৈন্যদের গোরস্থানের মত সবই এক সাইজ বা একই ডিজাইনের মত নয়। আমাদের দেশে গোরস্থান ভুতে আর সাপে ভাগাভাগি করে ভোগ করে, এখানে মানুষের গোরস্থান মানুষই পরিস্কার রাখে।এবং লোকালয় থেকে সুদূরে বহিস্কৃত নয়। কী জানি এইসব দেশে মরেও আরাম কিনা। তবে কোভিড মড়কের যুগে আপাতত আমি জীবনের প্রেমেই হাবুডুবু।

এবার পাশ দিয়ে নদী ল্যাংড়াচ্ছে। নদী নয় খাল, কিন্তু স্রোত আছে। ধীর স্রোত, ছোট ঢেউ, তারও চেয়ে ছোট ছোট পাথরের দ্বীপ। গোল পাথর, লম্বা, ত্রিকোণ, চৌকোণ

সবধরনের পাথর। দ্বীপের এই পাশ দিয়ে জল যায় তো অন্যপাশ দিয়ে যায় তার ছোট বোন। জলের পাশ দিয়ে, বনের কেশ ঘেঁষে যেতে যেতে ম্যানচেস্টারে পৌঁছাই।

মেরিম্যাক নদীতীরে অপূর্ব শহর। ডাউন টাউনে গাড়ি পার্ক করে দেখি পাশেই তথ্য ব্যুরো। ভেতরে ঢুকি। মোটা সোটা

এক যুবক, ওর বোধ হয় পেট-ফাঁপা।

গুড আফটারনুন!

ব্যাদান মুখ।

ম্যানচেস্টারে কী দেখা যায় কিছু তথ্য দেবে?

ওই ওখানে বুকলেট আছে, সেখানে সব পাবে।

একটা হাতে তুলে নেই।

ঝকঝকে পাতায় দোকান পাট ব্যবসা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি সবকিছুর খবর আছে কিন্তু আমাদের জন্য কিছু নেই। পাশেই একটা পার্ক এবং কোনো একটি যুদ্ধবিষয়ক মনুমেন্ট। একটু হাঁটাহাঁটি করি। একটি বৃক্ষপ্রজাতির ছোটবড় অনেকগুলো গাছ ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ঘ্রাণে ঘ্রাণে রাস্তাগুলো মাতাল খৈয়াম। রাশিয়ায় থাকতে গাছটিকে খুব ভালো লাগতো। কারণ যে ছিলো না তা নয়। কোনো এক জুলাই মাসে সামারের প্র্যাকটিকাল চলছিল। নিয়মিত ক্লাসের তুলনায় শিথিল রুটিন, ফ্রি-টাইম পর্যাপ্ত এবং বাইরে গ্রীষ্মের মোহন মাদকীয়তা।মেয়েরা কোকোন-ফ্রি প্রজাপতি। যৌবনের খুশবো ছড়িয়ে অনেকগুলো মুহূর্তের জন্ম হয়েছিল ফুলেল এক বৃক্ষের নীচে।

“তার চামড়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, মুখচ্ছবি দেখে মনে হতো সে যেন সকাল বেলাকার শিশির দিয়ে গড়া!” ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে সৈয়দ মুজতবা আলীর চাচা কাহিনী পড়তাম। “তার চুল যেন রেশমের সুতো, ঠোঁট দু’খানি প্রজাপতির পাখা, ভুরু উড়ে-যাওয়া পাখি এবং বোঝাই যেতো না সে দাঁড়িয়ে আছে, না হাওয়ায় ভাসছে।”*

(চাচা কাহিনী, কর্নেল)

শিশির দিয়ে গড়া যে, তার নাম ধাম মোকাম নিয়ে বিশেষ কিছু লিখতে মন চায়না, নীচের হাইকুটিতে তার বিস্তারিত লেখা আছে:

 

The white bush clovers

Drop the dewdrops

Frequently.

Yosa Buson (1716-1784)

মনে হয়েছিল জীবন শেষ। কিন্তু এক জীবনের শেষ যেখানে

অন্যজীবনের শুরু সেখানেই। তাই শুরুর শুরু বড় রহস্যময়, শেষের শেষ অনবহিত।

মন্ট্রিয়েলের বাসায় দোতলার বারান্দার পাশে এমন একটা গাছ ছিল বেশ ঝাঁকড়ানো। শীতের বন্ধাত্ব শেষ হয়ে গেলে বসন্তে ফুল আর ঘ্রাণে ভরে দিতো চারিদিক। ঘরে থাকতে কষ্ট হতো।

অপূর্ব সুন্দর পাতাগুলো। রুশ ভাষায় নাম তার লিপা, ইংরেজিতে টিলিয়া বা লিন্ডেন। বহুদিন পরে দেখে মনটি গাছে ঝুলে-থাকা শিম্পাঞ্জি। যেন সেই মেয়েটির সাথে হঠাৎ দেখা এবং তার এখনও দাঁত পড়ে নাই, চুল পাকে নাই, কণ্ঠার ত্বক অশিথিল ও ঠোঁটে অমলিন সৌষ্ঠব।

 

রুশ ভাষায় “লিপা” শব্দের আরও একটি অর্থ আছে। লিপা মানে ফলস, ভূয়া। যেমন তুমি ১০০ ডলারের একটি নোট দিলে, আর দোকানি বললো, এ তো লিপা! তোমার শুধু পিলে নয়, অন্ত:স্থলের ৮০ তলা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। তোমার টাকা তো গেলোই, এখন না পুলিশের হাতে নাজেহাল হতে হয়।

এই লিপার দৌড়াত্ব দেখেছি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার সময়। আমি “পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু” নামে যে উপন্যাসটি লিখছি তাতে এর কথা উল্লেখ না করে পারিনি এর সৌন্দর্য্যের দ্বৈত অর্থের কারণে।

 

মেরিম্যাক নদীর ওপরে বিশাল যে ব্রিজটি গাড়ি চলাচলে ব্যস্ত, তার ফুটপাত ধরে ব্রিজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নদী দেখি। জলের ড্যাম তৈরি করে এর কণ্ঠ চেপে ধরা হলেও

সে নদী। জল হয়তো এক হাটু। আমাদের শীতলক্ষ্যার সমান প্রশস্থ। কিন্তু স্বচ্ছ জল। আবর্জনা নেই, জল পচেনি, দুর্গন্ধ নাক স্পর্শ করেনি। দুই তীরে শহর, ইমারত, পার্কিং, হাইওয়ে, বিভিন্ন স্থাপনা ও জীবনের কোলাহল ব্যাতি-ব্যস্ত।

 

একটি লেবানিজ দোকান থেকে “চিকেন সোয়ারমা” ও “ফালাফেল” কিনে রওনা দেই মেসাবেসিক হ্রদের দিকে।

মেসাবেসিক- রেড ইন্ডিয়ান শব্দ, “অনেক জল”- এর অর্থ।

নামের মর্যাদা রক্ষা হয়েছে, হ্রদটি ছোট নয়।

পার্কে অনেক লোক পরিবার-পরিজন নিয়ে। জলজ ঘাসের মধ্যে একটা সারস বসে আছে চঞ্চু উঁচু করে। তার গলা যেমন লম্বা, ঠোঁটও তাই। তার ছবি তোলার জন্য এক লোক ট্রাইপডের ওপরে ক্যামেরা তাক করে বুদ্ধের মত ধ্যানে মগ্ন।

আকাশের নীল কাঁপছে জলের মৃদুমন্দ ঢেউয়ে। বুনোহাঁসের ঝাঁক জলে সাঁতরাচ্ছে স্বাধীন। এক মা তার দুই শিশুকে নিয়ে জলের খুব কাছে বসে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এক গণ্ডার সদৃশ ভদ্রোলোক আমাদের উল্টা বেঞ্চে একা বসে আইসক্রিম খাচ্ছে।

একজন বড়শী পেতে তিমি শিকারের স্বপ্ন দেখছে।

চমৎকার না-ঠাণ্ডা না-গরম দিন। বেঞ্চে বসে লাঞ্চ সারি। হাঁটি এদিক সেদিক, হ্রদের তীর ধরে বন। গাছের পাতা ভেদ করে রোদ ও ছায়ার খেলা। প্রকৃতির অপূ্র্ব আবহে শ্বেতাকে সূর্য-কন্যা তপতী মনে হয়। রাজা সংবরণ যার অসামান্য রূপ দেখে আত্মসংবরণ করতে পারেনি বরং মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে প্রেমের তীব্রতায় অবশ ও সংজ্ঞালুপ্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। তপতীর মায়া হয়েছিল, সে এগিয়ে এসে রাজাকে ধরে উঠিয়েছিলো। আমি কি অমন সংজ্ঞালুপ্ত হয়েছিলাম কোনোদিন? কে জানে, সাক্ষী দেয়ার কেউ নেই।

 

মাউন্ট ওয়াশিংটন যাবার ইচ্ছে ছিল প্রকট। সাড়ে তিন ঘণ্টা করে ৭ ঘণ্টার ড্রাইভ কিন্তু শ্বেতা চটপট গুগলে দেখে নিলো যে পাহাড়ের ওপরে প্রচণ্ড শীত ও কনকনে বাতাস, ভাল্লুকও সোয়েটার জ্যাকেট পরে হাঁটে। আমাদের সাথে কোনো শীতের বস্ত্র নেই। রেল বা গাড়িতে করে পর্বতের ওপরে যাওয়া যায় কিন্তু শ্বেতা বাস্তব জগতের মানুষ, বেঁকে বসে।

তুমি যাবে যাও, আমাকে নিয়ে টানাটানি করো না, বাপু।

তার জোর হলো এই যে, সে জানে তাকে রেখে আমি যাবো না। তার শৈশবে পথ-ঘাট-মাঠ-প্রান্তর কোমর পর্যন্ত সাদা বরফে ঢেকে যেতো, তাতে রৌদ্রে ঝিকঝিক করতো পুশকিনের সকাল। সেই বরফে ওরা স্লাইড বানিয়ে খেলা করতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্ষুধার কথা ভুলে।

সেই মেয়ে যদি শীতের ভয় পায়, তা অবহেলা করা আমার কম্ম নয়, যে গুনী স্ত্রীর কথা শোনে সে বহুদূর যায়। সিদ্ধান্ত হয় মেইন যাবো। বাংলাদেশের চেয়ে ২২ হাজার বর্গমাইল ছোট, আটলান্টিকের তীরবর্তী মেইন আমেরিকার সর্বউত্তরের কচি খুকি স্ট্যাট, তার নীচে নিউ হ্যাম্পশায়ার, ওপরে ও পাশে কানাডা।

বন পাহাড় নদী-নালা ও গলদা চিংড়ি সমৃদ্ধ দেশটির লোকসংখ্যা খুব কম। পোর্টল্যান্ড মেইনের সবচেয়ে বড় শহর।

 

সুতরাং ৪র্থ দিন আমরা পোর্টল্যান্ড শহরের কেইপ এলিজাবেথ লাইট হাউজের দিকে রওনা দেই। পৌঁছি সমুদ্র তীরে যেখানে অর্ধবৃত্তাকার একটি পোতাশ্রয়ের মত তৈরি হয়েছে। এখানে সামান্য একটু বালু বিচ, বাকিটা সলিড রক দিয়ে ঢাকা। ফ্ল্যাট এই রকের বিছানায় কত কোটি বছরের ইতিহাস ও মানুষের পদচিহ্ন রয়েছে কে জানে। সৌন্দর্যের অসামান্য অবয়ব এখানে।

“ককেশিয়ার দিনরাত্রি” উপন্যাসে কিসলোভদস্কের পাহাড়ের চুড়ায় এমনি একটি রকের বিছানায় নাস্তিয়ার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিল শিশির। চাঁদনীরাতে শিশির বিন্দুর মত তার মুখে ঝরে পড়েছিল কয়েকফোঁটা অশ্রু কিন্তু নাস্তিয়া স্বীকার করেনি যে তা ছিলো তার চোখের জল।

 

অদূরে সমুদ্রস্তর থেকে ১২৯ ফিট উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রে পথ হারানো বহু মানুষের জীবনরক্ষাকারী বাতিঘর ( Lighthouse)। ১৮৭৪ সালে তৈরি ৬৭ ফিট উঁচু এই স্থাপনা থেকে প্রতি ১৫ সেকেন্ড পর পর দেয়া আলোর শিখা ১৫ নটিক্যাল মাইল দূর থেকে দেখা যায়। বেশ কিছুক্ষণ কাটে রকের ওপরে বসে বা হেঁটে। সমুদ্র জলের কাছে একটি রক বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করি শৈশবের স্বভাববশে। ঝুলে আছি। নীচে ফেনায়িত ঢেউ এসে তীরে আছাড় খাচ্ছে। বহুদূরে আবছা দৃশ্যমান বড় একটি জাহাজ কোথায় যাচ্ছে কে জানে। হু হু করছে সমুদ্র হাওয়া।খৈয়ামের সাকীর ওড়না ওড়ানো হাওয়া।

“ঝুলে আছে তো! হ্যাঁ নিশ্চয়ই! তুমি এদের থেকে এর বেশি কীইবা আশা করতে পারো, আত্মীয়-স্বজন, পূর্ব-পুরুষরা

তো গাছ থেকেই নেমে এসেছে, নাকি নয়?”

আমার ঝুলন্ত দশা দেখে যে দীর্ঘনাসা এই মন্তব্যটি করতে ছাড়তো না, ভাগ্যিস সে না আমার ভাবী, না-বেয়াইন। পাশেও ছিলো না।

ফলে যা হবার তাই হয়, পা পিছলে যায়। পতন ঠেকানো গেলেও হাঁটুর চামড়া ছিড়ে যায়। এবার যার মুখ খোলার, সে খোলে:

“দেখি দেখি! উহ্ হু! পই পই করে বললাম ওখানে ওঠো না, ব্যথা পাবে, বয়েস আর পনেরো নয়।”

ভাগ্যিস তার ব্যাগে কী নেই? হ্যান্ড স্যানিটাইজার, এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল ক্রিম, ব্যান্ড-এইড। পরিচর্যা শেষে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গাড়িতে উঠি।

“গাড়ি চালাতে পারবে, না আমি চালাবো?”

সুবিধা এই, যতটা না ক্ষত, তার চেয়ে বেশি মনোযোগ।

একেই বলে ছুটি।

আমিই চালাই।

“জানো, ছোটকালে আমি যখন অ্যাথলেটিক্সে ছিলাম, প্র্যাকটিসের সময় একবার আমার জিভ কেটে গিয়েছিল।”

৩৩ বছর ধরে একসাথে আছি, শৈশবের অনেক কথাই শুনেছি, এ খবরটি নতুন।

ঘটনাটি যখন ঘটে রাশিয়ার ভলখভ শহরে সে তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। প্রথম ক্লাশে সে মিউজিক স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো, মাস তিনেক যেতে না যেতে পিতা মাতা উত্তর-দক্ষিণে হাঁটা ধরে। পিয়ানো কেনার পয়সা না থাকায় তাকে মিউজিক ছাড়তে হয়। কিন্তু বিনে পয়সার ক্লাব ছিল প্রচুর। সে সাঁতার ক্লাবে যোগ দেয় এবং বছরখানেক ভালোই সময় কাটে।

“আমি যে ভালো সাঁতার কাটতে পারি, সেটা ওখানেই শেখা।” তার চোখ চিকচিক করে স্মৃতির ক্লোভার প্রান্তরে।

কিন্তু একবার সুইমিং পুলের ভাঙা টাইলে পা কেটে রক্তারক্তি দশা হয়।

“বাদ দে তোর সাঁতার ক্লাব। অন্য কোথাও যা”- মা বলে।

সে যায় থিয়েটার ক্লাবে। মাস তিনেক যেতেই

বুঝে ফেলে, সে যা নয় তা হবার গুণ তার নেই। অর্থাৎ অভিনয় করা তার ধাতের বিপরীত। এ আমি সারাজীবন ধরে জানি। সুতরাং সে নিজেই ছেড়ে আসে।

দীর্ঘতনু, দীর্ঘপাদ সে ছিলো স্কুলের পিটি ক্লাশে দ্যুতিময়।

পিটি শিক্ষক আসখাত সাবিরোভিচ ঘুরে ঘুরে দেখতো স্টুডেন্টদের শারীরিক গড়ন ও পিটি টেকনিক, এন্ডুরেন্স এবং পারফর্মেন্স। সে ছিল একটি অ্যাথলেটিক ক্লাবের ট্রেইনার।

“সোয়েতলানা, তুই আমার ক্লাবে আয়, আমি তোকে অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন বানাবো।”

সে যাতে ক্লাবে একাকী বোধ না করে, উৎসাহিত করার জন্য বলে, “তুই যদি সাথে তোর বান্ধবীদের নিয়ে আসতে চাস, তাও পারিস।”

সে অ্যাথলেটিক সামর্থ্যের শিশুদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ সেই প্রৌঢ় বয়সী শিক্ষকের কথা বলে, তার কণ্ঠে এক অসম্ভব সজীবতা পুঁইডগার মত লকলক করে।

সে প্রতিদিন স্কুল শেষে প্র্যাকটিস করতে যায় ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত। ওয়ার্মিং-আপের সময় স্ট্যাডিয়ামের ট্র্যাকে ২ রাউন্ড দৌড়সহ ৩০ মিনিট ব্যাপী বিভিন্ন ব্যায়াম সেরে শুরু হয়

মূল প্র্যাকটিস। হাই এন্ড লং জাম্প, স্টপ ওয়াচ অন করে স্প্রিন্ট ও লং ডিস্টেন্স দৌড়, স্ট্রেংথ ও এনড্যুরেন্স ট্রেইনিং, একস্থানে দাঁড়িয়ে দ্রুত গতিতে হাত-পা নাড়িয়ে দৌড়ের টেকনিক প্র্যাকটিস, সহপাঠীকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় পায়ের আঙুলে ভর করে গোড়ালি উঁচু করে সারা শরীর ১০০ বার ওপরে ওঠানো, পেছন থেকে কোমরে ওজনদার টায়ার বেঁধে দৌড়ানো- কত ধরনের ট্রেইনিং।

“দৌড়ে আমার টেকনিক ছিল ১০০ % , দৌড়াতাম সারস পাখির মত লম্বা লম্বা পা ফেলে। কিন্তু আমার সাথে ছিলো আর এক সোয়েতলানা। বেটে ও ছোট, কিন্তু ছোট ছোট পা ফেলে সে দৌড়াতো আমার চেয়েও দ্রুত। আসখাত সাবিরোভিচ আফসোস করে বলতো, যদি তোদের দুই সোয়েতলানাকে এক করতে পারতাম, তবে ভলখভ দৌড়েএকজন অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন পেতো।”

“এত দীর্ঘ সময় এত কঠিন প্র্যাকটিস করে টায়ার্ড হয়ে পড়তে না?” আমি ভজাদা’র মত ব্যাকুল প্রশ্ন করি।

“না, ঐ বয়সে কেউ টায়ার্ড হয় নাকি? প্র্যাকটিস শেষ করে কী যে ভালো লাগতো, মনে হতো যেন উড়াল দেই।”

ভাবি আমার পাশে কী এক অসামান্য মানুষ প্রায় তিনযুগ ধরে, অথচ আমি তার কত কম জানি। ভাবি সে আমার, অথচ সারা পৃথিবীর হবার মেধা ছিলো তার।

আমি সত্যিই কত ছোট!

সে বলতে থাকে:

“আমাদের পুল-আপ বারে ঝুলে সারা শরীর সামনে পিছে দুলিয়ে লাফ দিতে হতো কখনও সামনে এবং কখনও পেছনে। ট্রেইনার উল্ফনের দূরত্ব মাপতেন। একবার পেছনে জাম্প দিতে গিয়ে আমার জিভ পড়ে দাঁতের নীচে। মনে হলো জিভটা কেটে দু’টুকরো হয়ে গেছে। ব্যথায় অজ্ঞান হবার দশা, মুখভরা রক্ত আর রক্ত, খালি গিলছি আর গিলছি। আসখাত সাবিরোভিচকে বলি নাই। আরো ১৫ মিনিট প্র্যাকটিস বাকি। সেই ব্যথা ও রক্তের  মধ্য দিয়েই প্র্যাকটিস শেষ করে বাসায় যাই। মা কেঁদে কেটে একসার হয়ে এম্বুলেন্স কল করে।”

গাড়ির জানালা ছুঁয়ে রোদ এসে পড়েছে ওর গালে। দীধিতি দীপিত মুখ! দীপ্র দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে কিন্তু চোখ তার শৈশবের মাঠে, যেখানে স্টপ ওয়াচ হাতে দাঁড়িয়ে আছে আসখাত সাবিরোভিচ!

0Shares

One response to “দোল দিয়ে যায় হাওয়া: শাহাব আহমেদ”

  1. সম্মোহিত ! বশীভূত !! পাগল প্রায় !!! লেখকজুটিকে একটিবার দেখার ইচ্ছে রইলো , সত্যি হউক মিথ্যা হউক তার বর্ণনা তাঁর সামনাসামনি হয়ে একটিবার শুধু উচ্চারণ করতে চাই : সম্মোহিত !
    Fb / Rana Rana Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com