1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ‘কাজু বাদাম’- মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ১২ নভেম্বর, ২০২১
  • ১৪৭ দেখেছেন
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা যোগ করেছে কাজু বাদাম

কাজুবাদামরে উৎপত্তস্থিল ব্রাজিল সহ মধ্য আমেরিকা এবং উত্তর আমেরিকার উত্তর র্পূব ব্রাজিল। র্বতমানে প্রধানত ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, ভারত, কেনিয়া, মোজাম্বিক, তানজানিয়া,মাদাগাস্কার প্রভৃতি দেশে কাজুবাদাম উৎপাদতি হয়ে থাকে।কেডিনি আকৃতির বীজ কাজু বাদাম গন্ধ ও স্বাদে মিষ্টি জাতীয়। ওজন হ্রাস, রক্তে র্শকরার নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর হৃদয় গঠন, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সার প্রতিরোধ, ত্বক ও চুলের সুরক্ষায় এটি এক দারুণ পুষ্টিকর খাবার। আর্ন্তজাতিক বাজারে এর অবস্থান ৩য়।

কাজু বাদাম অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য। প্রতি ১০০ গ্রাম কাজুবাদামে ৩০.১৯ গ্রাম শর্করা, ১৮.২২ গ্রাম আমিষ, ৪৩.৮৫ গ্রাম চর্বি থাকে। কাজুবাদামে বিভিন্ন ভিটামিন, লৌহ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, জিঙ্ক খনিজ উপাদান রয়েছে। স্থানীয় ভাষায় তাম বা কাজু বাদাম এমন একটি ফসল। দামি ফল হিসেবে কাজুর পরিচিতি সবার কাছে। কাজু গাছ ( বৈজ্ঞানিক নাম: Anacardium occidentale; প্রতিশব্দ: Anacardium curatellifolium A.St.-Hil সপুষ্পক অ্যানাকার্ডিয়েসি পরিবারের বৃক্ষ। এটি একটি অর্থকরি ফসল। বীজ থেকে চারা তৈরি করা হয়। বেলে দো আশঁ মাটি, পাহাড়ের ঢালে ভাল জন্মে। কাজুবাদামের উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল। বর্তমানে প্রধানত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াা, ভারত, কেনিয়াা, মোজাম্বিক, তানজানিয়াা, মাদাগাস্কার প্রভৃতি দেশে কাজুবাদাম উৎপাদিত হয়। আমদানি নির্ভর এ ফলটি নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে পাহাড়ে। বাধা শুধু সংরক্ষণে আর পোস্ট প্রসেসিং বা উৎপাদনের পর খাওয়ার উপযোগী করে প্রস্তুতকরণে। উৎপাদন ও চাষাবাদ যে হারে বাড়ছে তাতে খুব শিগগিরই পাহাড়ে কাজু ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব ।

বাংলাদেশে কাজু বাদাম চাষের ইতিহাস প্রায় ৩০-৪০ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং উদ্যান উন্নয়ন বিভাগের সমন্বয়ে পার্বত্য এলাকায় কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের ফলের চারা/কলমের সঙ্গে কাজু বাদামের চারা সরবরাহ করে থাকে। কৃষকরা কাজু বাদামের চাষ করে বেশ লাভবান হয়। অর্থনৈতিক বাণিজ্যে কাজু বাদামের স্থান তৃতীয়। কাজু বাদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন এবং ফাইবার আছে। নিয়মিত কাজু বাদাম খেলে ক্যান্সার, হৃদরোগজনিত জটিলতা, স্থুলতা এবং টাইপ টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়। লাভ জনক কৃষির কথা মাথায় রেখে উচ্চ মুল্যের ফসল আবাদের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয় ।

কাজু বাদামের বীজ এবং কলম উভয় পদ্ধতিতেই বংশ বিস্তার করা যায়। চারা লাগানোর তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ফল ধরে। এ বাদাম গাছ ৬০-৭০ বছর পর্যন্ত বাঁচে এবং ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায় । পূর্ণবয়স্ক গাছ ১০ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ফেব্রুয়ারি-মার্চে ফুল ধরে। ফল সংগ্রহ করা হয় মে মাসে। এতে রোগ-বালাইও কম এবং পানি ও পরিচর্যাও কম লাগে। আর এক একটি গাছে জাত ভেদে ৪ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত বাদাম হয়। সাধারণত পেকে নিচে পড়ে গেলে সংগ্রহ করে শুকানো হয়। আর শুকালে ১ বছর রাখা সম্ভব। আমাদের পোস্ট প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পাইকাররা ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে কাচাবাদাম রপ্তানি করেন। আবার প্রসেসিং হয়ে বাজারে আসলে আমাদেরেই এগুলো কিনতে হয় কয়েক গুণ বেশি দামে।


ভৌগলিক অবস্থান,মাটি,জলবায়ু এবং পরিবেশ পার্বত্যাঞ্চলে কাজুবাদাম চাষের জন্য উপয়োগী। ঢালু জমিতে এটার চাষ ভালো হয় কারণ এর গোড়ায় তিন দিনের বেশী সময় ধরে পানি জমে থাকলে গাছটি মারা যায় । সিলেট ও রংপুর অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে । এ গাছের একটি বৈশিষ্ট এটি মাটিকে আকরে ধরে রাখে ফলে ভুমিক্ষয় অনেকাংশে রোধ হয়। বাদামের সঠিক মুল্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারের অভাবের ফলে চাষিদের মধ্যে হতাশা ছিল।

এ অবস্থায় পরিবর্তন আসে ২০১২ সালের দিকে। ওই বছর স্বল্প পরিমাণে হলেও দেশে পাহাড়ে উৎপাদিত কাজুবাদাম রফতানি করা হয়। প্রতি মণ কাচাবাদাম বিক্রি করা হয় মানভেদে ৫০০-৭০০ টাকায়। এর পরই কৃষকদের মধ্যে নতুন করে কাজুবাদাম নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে উৎপাদিত কাজুবাদামের মণ সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবাদে যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন কৃষক। ২০১৬ সালের পর সেই দাম গিয়ে ঠেকেছে কেজি প্রতি ১২৫ টাকা পর্যন্ত।

প্রতিটি কাজুবাদাম গাছ বছরে ৫০ কেজি করে গ্রিন হাউজ গ্যাস বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে তাহলে এর মোট পরিমাণ হবে ৭৫ লাখ টন। ইউএনএফসিসিসি ( ইউনাইটেড নেশান ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) প্রতি টন গ্রিন হাউজ গ্যাস বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করার জন্য প্রায় ২০ মার্কিন ডলার দেবে। সে হিসেবে প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বা ১২৪৫ কোটি টাকার সিডিএম ( ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম) ফান্ড পাওয়া যাবে। যা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের এবং গর্বের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজু বাদামের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক।

২০১৪ সাল থেকে বান্দরবানের রুমা উপজেলার পাশাপাশি থানচি, রোয়াংছড়ি ও সদর উপজেলা,খাগড়াছড়ি, এবং রাঙ্গামাটিতে কাজুবাদাম চাষ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। নিজস্ব চারা থেকে উৎপাদিত গাছ হতে উৎপন্ন বাদামে তারা লাভবান। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ কোটি গাছ রোপন করে ২ লাখ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আনা হবে । এতে করে উৎপাদন হবে প্রায় ১০ লাখ মে.টন বাদাম,যার বাজার মুল্য ২৬ হাজার কোটি টাকা। আমাদের ড্রাইং ইর্য়াড,ওয়ারহাউজ এবং প্রসেসিং কারখানা ব্যবস্থা নেই, প্রসেসিং করে রপ্তানি করা গেলে এই অর্থের পরিমান দ্বিগুন হবে। ফলন বৃদ্ধির জন্য ভিয়েতনামের উচ্চফলনশীল জাতের চারা প্রয়োজন ।

কাজুবাদাম আবাদ এর আবাদ বৃদ্ধির জন্য ভিয়েতনাম থেকে উচ্চ ফলনশীল জাতের চারা আমদানির করা হবে। প্রক্রিয়াজাতসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনে খামাড়িদের বিদেশে অভিজ্ঞতা অর্জন ও প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হবে। ভিয়েতনামের উন্নজাতের চারা আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে এমনটি জানালেন কৃষি মন্ত্রী ড.মো:আব্দুর রাজ্জাক। এই খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সকল সহযোগিতা করা হবে।

ভিয়েতনাম ১৯৮৮ সালে কাজুবাদাম চাষ শুরু করে এবং ১৯৯৮ সালে বাণিজ্যিক চাষে গিয়ে আজ তারা বিশ্বে এক নাম্বার হলে আমরা কেন পারব না। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষির জন্য যা যা করার সব করবে। কৃষিপণ্যটি রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যের তালিকায় উঠে এসেছে কৃষিপণ্যটি।

রুমা উপজেলার পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজুবাদাম আবাদের জন্য একর প্রতি ২০০টি গাছ রাখা ভালো। এতে বাগানের সঠিক পরিচর্যা করা যাবে, ফলনও ভালো হবে। ফল সংগ্রহ শুরু হয় মে-জুনে। বাদামের মুল্য বৃদ্ধিতে বর্তমানে অনেকেই নতুন করে কাজুবাদাম আবাদ শুরু করছেন। এই বাদাম চাষের সাথে বর্তমানে যুক্ত আছেন প্রায় ৭শ জন চাষী। প্রস্তুত করছেন নতুন জমি। তবে পাহাড়ে আবাদের জন্য কাজুবাদামের জাত নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন ।
শুধু বাদাম হিসেবেই নয়, কাজু ফলের (কাজু আপেল) খোসারও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কাজুবাদামের শেল বা খোশা থেকে উৎপাদিত তেল দিয়ে উৎকৃষ্টমানের পেস্টিসাইড বা কীটনাশক উৎপাদন করা যাবে এছারা ভিনেগার তৈরী হয়। যা নিরাপদ ফসল এবং খাদ্য উৎপাদনে অত্যন্ত জরুরী। অপরদিকে, মানবদেহ এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক রাসায়নিক কীটনাশক আমদানি প্রতিহত করে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। কাজু আপেল থেকে জুস বের করে নেয়ার পর যে মন্ড বা ছোবরা হবে তা দিয়ে হাজার হাজার টন মাটির প্রাণ উত্তম জৈবসার উৎপন্ন হবে। ঠিক একইভাবে শেল বা খোশা থেকেও তেল বের করে নেয়ার পর যে খৈল হবে তা দিয়েও জৈবসার হবে। এ আপেলে প্রায় ৮০ শতাংশ জুস থাকে যা অনেক ঔষধি ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। কমলা লেবুর চেয়ে ৬ গুন বেশী ভিটামিন সি রয়েছে। কাজু আপেল থেকে কাজু জুস উৎপাদন সম্ভব; যা দিয়ে আমরা দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পুরণ করতে পারে।


লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, চাষিদের প্রশিক্ষণ,কাজুবাদাম উৎপাদন, প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন ও রপ্তানি অবকাঠামোসহ নানা বিষয় বাস্তবায়ন জুরুরী। পাহাড়ের পতিত ভূমিতে সামান্য পরিচর্যায় প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ টন কাজুবাদাম পাওয়া সম্ভব। গত বছর বান্দরবানে ৭ দশমিক ২ টন ও রাঙ্গামাটিতে পাঁচ টন কাজুবাদাম উৎপাদন হয়েছে। গত বছর উৎপাদনের পর কাচা ৪০০ মেট্রিক টন কাজুবাদাম ভারত ও ভিয়েতনামে রপ্তানী করেছে।

উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান ধারায় বাংলাদেশের অব্যাহত সাফল্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও কর্মযোগ বিকিরণ করছে। সর্ব সাধারণের মৌলিক চাহিদা ও প্রাপ্য অধিকার পূরণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার যে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, তা আজ দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট এবং প্রকাশিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সিংহভাগ অর্থনীতি এখনও কৃষিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। কাজুবাদাম গতে পাড়ে অর্থনৈতির নতুন ধারা। অনাবাদি জমিতে পরিকল্পিতভাবে কাজুবাদাম চাষের যথেষ্ট সুযোগ আছে।

-মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জনসংযোগ কর্মকর্তা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com