1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ: (তৃতীয় পর্ব) সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২১
  • ৮৯ দেখেছেন
এনজিএফএফ স্কুলের একটি দৃশ্য
ঢাকা থেকে আমাদের এনজিএফএফে পত্রিকা আসে একদিন পর, দিনশেষে। কোনো কোনো দিন পাঠকের হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে পরদিন সকাল।আজকাল সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে থাকে নির্বাচনের খবর, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী জনসভায় যে ভাষণ দিয়েছেন, তার বিস্তৃত বিবরণ। অন্য সবদলের নেতাদেরও খবর ছাপা হয়, কিন্তু গুরুত্বসহকারে নয়।
জলোচ্ছ্বাসের বিশদ খবর ছাপা হয়ে যেদিন পত্রিকা এলো,ততদিনে সাতদিন পার হয়ে গেছে,আমরা তিনদিন আগের ছাপা সংবাদ দেখলাম। সেদিনও অতোটা বোঝা গেল না। কিন্তু উড়োউড়ো খবর আসছিলো, উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ রকমের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। আমি ছোট মানুষ, সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা।
সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় এলেন নুরুল ইসলাম কাকু এবং মফিজুর রহমান কাকু। তাদের বাড়ি আমাদের পাশের ইউনিয়ন চরবাটায়। আমাদের ইউনিয়নের নাম চর জব্বার। এগুলো বর্তমানে সুবর্ণচর উপজেলার অধীন। নোয়াখালী জেলা শহর থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব পনেরো মাইল।
নুরুল ইসলাম কাকুদের আসার কারণ সম্পর্কে বলার আগে আমার নিজের কথা একটু বলে রাখি। যদিও আমার ‘ছেলেবেলা’য় আমি এসব কথার কিছু বলেছি। আমি যখন কাকু-কাকীমার সঙ্গে ফেঞ্চুগঞ্জ চলে আসি তখন আমি নিতান্তই শিশু। বয়স সাড়ে ছয় কী সাত। তখন ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানারও নবীন বয়স, দুই বছর মাত্র। কাকু যুক্ত হলেন উৎপাদন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই। তখন তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে সদ্য বিএসসি পাশ করে সোনাপুর আহমদিয়া স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, আর তখনই ডাক আসে এনজিএফএফের প্রোডাকশন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদানের।
আমার দাদারা (আব্বার বাবা- চাচা) তিন ভাই। তাঁরা তাঁদের ছোটবোনের মেয়ে অর্থাৎ তাদের সবার স্নেহের ভাগনিকে কাকুর জীবনসঙ্গিনী করে দিলেন।
কাকীমা আগে থেকেই আমার ফুপু। তাকে কাকুর কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়। দাদাদের চোখে তাদের ভাগনি ছোট মানুষ, একা থাকতে তার কষ্ট হবে। কাকু বললেন আমার কথা। আমি তাঁর বড় ভাইয়ের বড় ছেলে। তাদের ভাইবোনদের মধ্যে আমিও পরিবারের প্রথম সন্তান। আমিও সবার আদরের, তাদের চোখের মনি। আমি ছোট মানুষ, এখনো চাঁদনি রাতে মায়ের কোলে মাথা রেখে ফুপুদের বলা গল্প শুনি। ভোরবেলায় বাড়ির অন্যান্য সমবয়সীদের সঙ্গে মক্তবে যাই, লাফিয়ে লাফিয়ে মক্তব থেকে ফিরে আসি, তারপর আবার সবার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে জুবিলি ফ্রী প্রাইমারি স্কুলে যাই, ‘স্বরে অ-তে অজগর,স্বরে আ-তে আম’ পড়ি।
আমাকে নিয়ে যাওয়ার সংবাদে আমার মায়ের বুক ভেঙে গিয়েছিল,এটা সত্য। আব্বার চোখেও জল ঝরছে,কিন্তু কাকু যখন বললেন, ওখানে বড় স্কুল হয়েছে, আমাকে মানুষ করার দায়িত্ব তার,তখন আব্বাও চোখের জল মুছে ফেললেন।
আমার বিদায় ছিল রাজসিক, সেই স্মৃতি আমাকে স্মৃতিকাতর করে। আমি ক্লাস টু-তে ভর্তি হলাম এনজিএফএফ স্কুলে। তখন এটা ইংরেজি স্কুল। তখনো আমি ইংরেজি বর্ণমালা চিনি না। আমার বইয়ের প্রথম শব্দ MOTHER. আমি এখান থেকেই শুরু করলাম। তারপর আট বছরের এক আশ্চর্য স্বপ্নাচ্ছন্ন জীবন! আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলে আমি এসএসসি পরীক্ষা দিব।
নুরুল ইসলাম কাকুরা কয়েকটা খবরের কাগজ হাতে বাসায় এলেন। আমরা প্রথম যখন এখানে আসি তখন কলাবাগান কলোনির সামনের সারির ই-টাইপ কোয়ার্টারে আমরা উঠেছিলাম। এরপর প্রমোশন পেতে পেতে তিনি এখন প্রোডাকশন ম্যানেজার। আমরা এখন হাউজিং কলোনির বড় বাসায় থাকি।
নুরুল ইসলাম কাকু কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন,চৌধুরী সাব, খবর যা পেয়েছি,তাতে তো মনে হয় না,কেউ বেঁচে আছে। সোনাপুর থেকে দক্ষিণ দিকে লাশের গন্ধে যাওয়া যায় না। বেড়ীবাঁধের দুই পাশে মানুষ, গরু-মহিষের লাশ,দুর্গন্ধে মানুষ যেতে পারছে না।
মফিজ কাকু একটা খবরের কাগজ সামনে মেলে ধরলেন। পূর্বদেশ। বিশাল হেডলাইন, ‘বাংলার মানুষ কাঁদো, গাছে গাছে ঝুলছে লাশ’। আরেকটা পত্রিকায় হেডলাইন ‘সত্তুরের স্টালিনগ্রাদ চরজব্বার’। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় জার্মানীর দুর্ধর্ষ সিক্সথ আর্মি ব্যাটালিয়ন এবং অক্ষশক্তির রোমানিয়া ও হাঙ্গেরি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনগ্রাদ আক্রমন করে। দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা সেই ভয়াবহ যুদ্ধে অক্ষশক্তির ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। শহরের ভেতরে অক্ষশক্তির অন্যান্য ফোর্সকে নাস্তানাবুদ করে শহরের বাহিরে বরফ আচ্ছাদিত যুদ্ধক্ষেত্রে সিক্সথ্ ফোর্সকে ঘিরে ফেলে সোভিয়েত বাহিনী। জার্মান বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সৈন্য হতাহত হয়, অবশিষ্টরা আত্মসমর্পণ করে। সেই যুদ্ধে দুইপক্ষে পনেরো লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। হয়তো সেদিন যুদ্ধ ও দুর্যোগে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর তুলনা করেই পত্রিকা এই শিরোনাম করেছিল।
নুরুল ইসলাম কাকু বললেন, আমরা আগামীকাল রাতের ট্রেনে নোয়াখালী যাব। আমার মনে হয়,আমাদের বাড়িতে আর কেউ বেঁচে নেই।
কাকুর চোখ জল ছলছল করে। মফিজ কাকুর চোখেও এক অনিশ্চয়তার আভাষ।
পরদিন পত্রিকায় আরেকটা খবর ছাপা হয়, চর জব্বার খাসের হাট দিঘির পাড়ে এক কবরে ২২০ জনকে সমাহিত করা হয়েছে। এই খবরটি দেখার পর কাকু-কাকীমা আরো বিচলিত হয়ে পড়লেন। খাসের হাট আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরেই। আমাদের বাড়ি বাঘগাদোনার পাড়ে। খাসের হাটেরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে তো নদীপাড়ের আমাদের সবাই ভেসে গেছে। আমাদের কেউই তাহলে বেঁচে নেই! আমার মনে হলো তাহলে আমার দাদাজান,দাদাসাবু,আব্বা, মা, ভাইবোন কেউ-ই বেঁচে নেই! আমার যে কী হলো তখন, আমি বইগুলো ছুড়ে ফেললাম। আমার মনে তখন অবুঝের মতো এক প্রশ্ন জাগে ,তাহলে কার জন্য এই পড়াশোনা, এই বেঁচে থাকা!
সেদিন রাতের চট্টগ্রাম মেইলে কাকু আমাকে নিয়ে বাড়ির পথে চললেন। লাকসাম স্টেশনে আমাদের ট্রেন বদল হলো। ওটা লোকাল ট্রেন, সব স্টেশনে ট্রেন থামে, যাত্রী ওঠে,যাত্রী নামে। তবে অনেকগুলো বগি ভর্তি করে ঘুর্ণিঝড় উপদ্রুতদের জন্য সাহায্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে অনেকগুলো স্বেচ্ছাসেবক দল। চৌমুহনী স্টেশনে আমাদের কামরায় কয়েকজন যাত্রী উঠল,তারা ছাত্র। তারা চৌমুহনী কলেজের ছাত্র, তাদের সঙ্গে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের দুইজন নেতা। তারা তিনদিন আগেই সাহায্য সামগ্রী নিয়ে উপদ্রুত অঞ্চলে এসেছে। তাদের টিম কাজ করছে রামগতি অঞ্চলে। তাদের আরেকটা টিম কাজ করছে চর বাটায়। ছাত্রলীগের দুইজনের বাড়ি চৌমুহনীতে। তারা কাজের সুবিধার্থে আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।
কাকু তাদের সঙ্গে কথা বললেন। তারা বললেন, কেয়ামত কেমন হবে জানি না। আমরা কেয়ামতের বর্ণনা শুনেছি , এটা তার চেয়েও ভয়াবহ। শুনেছি ঘুর্ণি বাতাসের সঙ্গে উড়ে গেছে মানুষ,গাছের ভাঙ্গা ডাল-পালায় গেঁথে গিয়ে ঝুলেছিল মৃত মানুষ, জলোচ্ছ্বাসেও খড়কুটোর মতো মানুষ ভেসে গেছে , যারা বেঁচে আছে তাদেরও খড়কুটোর জীবন। পঁচা লাশের গন্ধে জীবন বের হয়ে যেতে চায়।
তারা আমাদেরকে কতগুলো ন্যাপথলিন দিলেন। রুমাল দিয়ে নাকে ন্যাপথলিন বেঁধে দুর্গত এলকায় যেতে বললেন।
সোনাপুর থেকে যাওয়ার জন্য আগে ছোট ছোট কয়েকটা রিকন্ডিশন্ড বাস চলতো, বেবিট্যাক্সি চলতো। জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে রাস্তা ভেঙে কোথাও কোথাও গর্ত হয়ে গেছে, এবড়ো- থেবড়ো হয়ে গেছে। বাড়ি পর্যন্ত দীর্ঘ পনেরো-ষোলো মাইল পথ হেঁটে যেতে হবে,খুব দুশ্চিন্তা করছিলেন কাকু। তখন অভয় দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।তাদের সঙ্গেই পরে ত্রাণকর্মীদের জীপে চড়ে, কোথাও কোথাও জীপ থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে, এভাবে দক্ষিণ ওয়াপদা পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে গেল আমাদের। তার পর থেকে পুরো বেড়িবাঁধটাই ধ্বসে গেছে।
এখান থেকে আরো ছয় মাইল হাঁটতে হবে। এরপর সারাটা পথ আমরা গামছা দিয়ে নাক-মুখ বেঁধে রাখলাম। বাড়ি পৌঁছার আগে বাজারে চেনাজানা গ্রামবাসী,নিকট-দূরের আত্মীয়দের কারো কারো সঙ্গে দেখা হয়। তাদের কাছেই জানা গেল আমাদের বাড়ির সবাই বেঁচে আছে, তবে আমাদের অনেক আত্মীয় পরিজন ভেসে গেছে।
আমরা যখন বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন পড়ন্ত বিকেল, দূর থেকে মনে হলো বাড়িটা আগুনে পুড়ে গেছে। কয়েকটা পাতাশুন্য গাছের ডালপালা রিক্ত অসহায়ের মতো আকাশে উল্টো করে পা মেলে রেখেছে।
আমাদের আসার খবর কেউ একজন আগেই বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে হয়তো। কাচারি ঘরের সামনে একবাড়ি মানুষ আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। কোথায় আমরা কাঁদবো তাদের জন্য, উল্টো তারা সবাই আমাদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এটা তাদের বেঁচে থাকার আনন্দের কান্না নাকি এ জীবনে আর কোনোদিন আমাদের সঙ্গে তাদের দেখা হতো না,সেই আবেগের কান্না ছিল, জানি না।
এরকম ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে দু-এক বছর পরপরই তাদের দেখা হয়, কিন্তু এবারের জলোচ্ছ্বাস যে তাদের জীবনে এক ভয়াবহ রকমের অভিজ্ঞতা, মৃত্যুর ফেরেশতা যেন তাদের চোখের সামনে দিয়ে ভয় দেখিয়ে গেছে, সেই ভয় ভেঙে এখনো তারা স্বাভাবিক হতে পারেনি। তাদের বিলাপের ভিতর থেকেই জানলাম, জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে বাড়ির বাকি চারটা ঘর যখন ধ্বসে পড়ছিল,সেসব ঘরের বাসিন্দারা একবুক সাঁতরে এসে বড় ঘরটাতে আশ্রয় নেয়। কাচারি ঘরে ছিল ধান কাটার পনেরোজন কামলা। কাচারি ঘর ভেঙে পড়ার আগেই কামলারা স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে বড় ঘরটাতে এসে ওঠে। স্রোতের ঘুর্ণিটানে বাড়ির ধ্বসে যাওয়া ঘরগুলো বড়ঘরটাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। এটা ছিলো এক অলৌকিক ঘটনার মতো। সারারাত পনেরো জন কামলা আর বাড়ির লোকজন মিলে মোট বত্রিশ জন মানুষ একটা ঘরের মধ্যে জীবন-মরণের টানাটানির মধ্যে পার করে দিয়েছিল। আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে নদী হলেও জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়েছিল পূর্বদিক থেকে। সমুদ্রের জল সুনামির মতো ফুলে উঠে পূর্ব-দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি স্থলভাগে আছড়ে পড়ে তারপর সবকিছু তছনছ করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চর ক্লার্ক, চর বাটা, চর জব্বারের বিশাল ভূভাগ পাড়ি দিয়ে তবে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত আসতে আসতে তার গতি কিছুটা কমে যায়,জলোচ্ছ্বাসের থাবা তথা উচ্চতাও কমে গিয়েছিল। প্রথম ধাক্কাটা যারা সামলাতে পেরেছিল, তারা বাঁচতে পেরেছে। এইসব বিশ্লেষণ শুনতে শুনতে এটাও মনে হতে থাকে, কতই আর গতি কমেছিল! আমাদের পাশের বাড়ি থেকে ভেসে গেছে আট জন। আব্বার বড় ফুপুর বাড়ি তো আমাদের খুব কাছেই। তাঁর ফুপাতো ভাইয়েরা চারজন।চার ভাইয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েরা সহ ষোলোজন, সবাই ভেসে গেছে।
জলোচ্ছ্বাস থেকে বেঁচে যাওয়া আমাদের পরিবারের সদস্যদের পরদিন সকাল বেলা মুখে তোলার মতো দানা থাকে না। উপবাসে দিন যায়। বাড়ির টিউবওয়েলের মাথা ভেঙে চলে গেছে। একফোঁটা পানি নেই। বাজারে আমাদের বড় দোকান আছে, ছোট দাদা দোকান চালান। দোকানটা রক্ষা পায়। তখন গ্রামের দোকানে আটা ময়দা বিক্রি হতো না। ধান ওঠার মৌসুম, এসব এলাকায় দোকানেও কেউ চাল বিক্রি করে না। ছোট দাদা দোকানে বিক্রির সব গুড়-মুড়ি-চিড়া নিয়ে এলেন।সেটাই পাখির দানার মতো দুদিন ধরে খেলো সবাই। মাঠের ধান,পারার ধান- সব ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, কুটোর মতো ভেসে গেছে। কামলারা এসেছিল উজানের কোনো জেলা থেকে। তাদের আর প্রয়োজন নাই। তারা নিজেরাই চলে যায়। তারা নিজেরা যে বেঁচে আছে, এই শুকরিয়া নিয়ে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যায়।
গ্রামের বাড়িতে আমরা সাত দিন থাকলাম। আমাদের নিকট স্বজনরা বেঁচে আছে,আমরা অবশ্যই খুশি ছিলাম। কিন্তু যে স্মৃতি নিয়ে আমি ফেঞ্চুগঞ্জ ফিরলাম, তা সারাজীবনে আমি কখনো ভুলতে পারলাম না। এই সাত দিন আমি ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস দেখিনি, দেখেছি সে-ই তাণ্ডবের রেখে যাওয়া দাগ।
আমাদের বাড়ির অদূরেই বাঘাদোনা নদী। উত্তাল সমুদ্রের মুখে মেঘনার অববাহিকায় ছোট্ট মোহনা। ছোট হলেও রামগতি ও চর জব্বারের মাঝখানে চার মাইল চওড়া নদী। এখন চর পড়তে শুরু করেছে। জোয়ার-ভাটার নদী, প্রতিদিন দুই বেলা জোয়ার-ভাটা হয়। নদীর তীরেও বিশাল চওড়া চর পড়েছে। জলোচ্ছ্বাসের পরদিন জোয়ার নেমে যাওয়ার সময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চরের বালুতে আটকা পড়ে শত-শত লাশ। জলোচ্ছ্বাস থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা কোনোভাবে লাশগুলোর উপর মাটি চাপা দেয়। কিন্তু তাতে করেও মৃত লাশের পঁচা গন্ধ বন্ধ হয় না। সমস্যা দেখা দিল শকুন আর কুকুর নিয়ে। নদীর চরজুড়ে প্রতিদিন শকুন আর কুকুরের ভোজ উৎসব চলে। নাকে গামছা বেঁধে গিয়েছিলাম সে দৃশ্য দেখতে। কুকুর-শকুন মৃত শরীরের উপর থেকে মাটি সরিয়ে ফেলেছে। পেটের ভেতরের নাড়ি টেনে নিয়ে গেছে বারো-চৌদ্দ হাত দূরে। চোখ মুখ খুবলে খেয়েছে,বিভৎস সে দৃশ্য। বমি করতে করতে ফিরে এলাম।
শ’য়ে শ’য়ে হাজারে হাজারে মানুষ মারা গেল, অবাক ব্যাপার এত কুকুর বেঁচে রইল কিভাবে? রাস্তার পাশে, ধানের মাঠে অথবা নদীর চরে আটকে থাকা মানুষের লাশ খেয়ে খেয়ে কুকুরগুলো বিশাল বিশাল দানবের আকার নিয়েছে। সাধারণত দেখা যায়,এক কুকুর আরেক কুকুরকে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে যায়। কিন্তু এবার দেখলাম উল্টো। কুকুরগুলো দলবেঁধে রাস্তা দখল করে হাঁটছে আর পথচারী মানুষ সভয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কুকুরকে পথ ছেড়ে দিচ্ছে।
অবাক হয়ে আমি আরেকটা দৃশ্যও দেখলাম। রাস্তার দু’পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন লেপ্টে আছে জমিনে। কদিন আগেও এখানে সোনালি ধান ঢেউ খেলছিল। ঝরে যাওয়া ধানগুলোর অঙ্কুরোদগম হচ্ছে, ছোট ছোট সবুজ চারা মাথা বের করছে, ধীরে ধীরে সবুজ হচ্ছে মাঠ। জীবন হয়তো এভাবেই জেগে ওঠে।
আমি ফিরে এলাম আমার প্রিয় এনজিএফএফে। কিন্তু আমি যেন আর আগের আমিটি নেই। আমার ভেতরে জন্ম নিয়েছে আরেকজন মানুষ,দুঃখভরা,আবেগভরা,যন্ত্রণাকাতর।তার বহিঃপ্রকাশ ঘটল কবিতায়। আমি একটা কবিতা লিখলাম। জীবনের প্রথম কবিতা। কবিতার নাম ‘কাঁদে বাংলা’।
“কাঁদে বাংলা, বাংলা কাঁদে, কাঁদে বাংলার মানুষ –
বাংলা মায়ের এ কী রূপ আজ কোথায় রূপের জৌলুস।
দক্ষিণ বাংলা নীরব আজি;নীরব পল্লী বাট;
নিভিয়া গিয়াছে জীবন প্রদীপ অন্ধকারে সোনার হাট।
ভয়াল ভয়ংকর ঘুর্ণিঝড় আর প্রমত্ত জলোচ্ছ্বাসে
সোনার বাংলার লাখো সোনামনি গিয়েছে ভেসে।
হায়রে রাক্ষুসি সত্তর, হায়রে বারোই নভেম্বর
জনমদুঃখী বাংলার বুকে এঁকেছ ধ্বংসের স্বাক্ষর।
বারো লাখ মানুষ সঁপিল তাদের জোয়ার ফণার তলে
মহাপ্লাবন বুঝি আঘাত হানিল বাংলার উপকূলে।”
এটা ছিল প্রথম আখ্যান,তারপর ধ্বংসযজ্ঞের করুণ বিবরণসহ দীর্ঘ কবিতা। আজ জীবনের অপরাহ্নবেলায় মনে হয়, কৈশোরিক আবেগ ছাড়া এই কবিতায় সাহিত্য নেই। ভাষা,ছন্দের মিল যা আছে,তা গোঁয়ার্তুমি। সেই কবিতাটা আমি পাঠ করেছিলাম স্কুলের শেষ বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। আবৃত্তির মাধুর্যে অথবা করুণ কান্নায় ভরা আমার তখনকার আবেগে হয়তো সাহিত্য-প্রকরণের ভুলগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল।
আমাকে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তির জন্য প্রথম পুরষ্কার দেওয়া হলো। স্কুলে আমদের পুরষ্কার ছিল বই। নিয়মবাঁধা কিছু পুরষ্কার ছিল, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার জন্য, বিভিন্ন সাবজেক্টে হাইয়েস্ট মার্কসের জন্য, গুড কন্ডাকটের জন্য, হাইয়েস্ট উপস্থিতির জন্য। এ বছর নিয়মবাঁধা পুরষ্কার পেলাম নয়টি বই। কবিতার জন্য অতিরিক্ত পেলাম একটি বই, আরেকটা পেলাম ম্যাজিক দেখিয়ে। আমি কেমিস্ট্রিতে নাম্বার কম পেতাম। কখনো ষাটের উপর নম্বর পেতাম না। একদিন ফখরুজ্জামান স্যার বললেন, বাসায় এসো। ভলো ছাত্র বলে একটা আলাদা স্নেহ-মমতা তো ছিলই আমার জন্য। নাইন-টেনের কয়েকজন ছাত্র পড়তে যেত স্যারের বাসায়।
স্যারের বাসায় আমি তিনদিন গিয়েছিলাম। প্রথম দিন তিনি আমাকে কেমিস্ট্রিতে কী করে বেশি নম্বর পাওয়া যায় সেই কৌশল শেখালেন। তিনি আমাকে বললেন মৌলিক ও যৌগিক পদার্থের নাম কথায় না লিখে প্রতীক দিয়ে লিখবে। ইকোয়েশন করার নিয়ম শেখালেন। সেই পুঁজি নিয়ে টেস্ট পরীক্ষায় আমার নম্বর লাফিয়ে উঠল সাতাশিতে।

পরের দুইদিনে স্যার আমাকে জাদু শেখালেন। প্রথম দিন কথায় কথায় তিনি জাদুর কথা বলেছিলেন। আমিও বিস্ময়-বালকের মতো মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। তারপর আগ্রহ দেখালাম,জাদু শিখবো। পরের দুইদিন জাদু শেখালেন। স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমি জাদুকর হয়ে উপস্থিত হলাম। সবাই তো অবাক! তো সেজন্যও পেলাম একটা বই।

স্কুল লাইব্রেরির বই পড়ে ফেরত দিতে হতো,কিন্তু পুরষ্কার পাওয়া বইগুলোতো আমার নিজের। আমি বইগুলো জমাতাম। এভাবেই স্কুল জীবনেই বইয়ের প্রতি আমার আসক্তি গড়ে ওঠে।
‘কাঁদে বাংলা’ কবিতার পুরষ্কারে অনুপ্রাণিত আমি সেই স্কুলবেলার মধ্যেই কোনো এক কোজাগরী জ্যোৎস্নার রাতে স্মৃতিকাতর হয়ে রচনা করলাম আরেকটি কবিতা,চাঁদনী রাতে। সেটাকেও আজ মনে হয় পল্লীকবি জসিমউদদীনের কবিতার ব্যর্থ অনুকরণ। জীবনের পথটা দীর্ঘ তো বটেই। চলতে চলতে কত প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বোঝা ভেবে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু ওই দুটি কবিতার পৃষ্ঠাগুলো বড় মায়াভরে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
“চাঁদনী রাতে’ কবিতার কয়েকটি চরণ বিনম্র লজ্জা নিয়ে উপস্থাপন করলাম।
” আজো ভুলিনিতো চাঁদনীরাতের সে-সব কথা –
স্মরিয়া আজিকে হৃদয়গগণে পুঁঞ্জিছে শত ব্যথা।
আজিকে নিশীথের চন্দ্রিমা তলে বসে ভাবি যত
অতীত আবার ঘুরিয়া ফিরিয়া কাছে ডাকে অবিরত।
সে রাতের যত স্নেহ-সোহাগের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি
চোখের জলে জোছনা মাখিয়া বারে বারে তারে ডাকি।
সে-ই চাঁদ হায় আজো উঠেছে তারার মেলায়;
আজো সে আবার দোল দিয়ে চলে আকাশের দোলনায়।
চাঁদের আলোতে সিনান করিয়া মায়ের সোহাগরাজি
নতুন করিয়া মনে পড়ে গেল চাঁদোয়ার তলে আজি।
মিষ্টি হাতের মায়ের পরশ আজো যাইনিতো ভুলে-
স্নেহমাখা কথা আজো বাজে
আমার হৃদয়কূলে।
এমনি করিয়া চৈত-বৈশাখের জোছনা ঝরা রাতে ;
মায়ের আদর লুটিয়া লইতাম বুকেতে মাথাটি পেতে।
দূর আকাশের চাঁদটি তখন উঁকি মেরে মেরে-
উপমা হইয়া দেখা দিত আসি মায়ের মনের দোরে।
আমি হইতাম চাঁদটি তাহার তিনি হইতেন বুড়ি-
চুলেতে আমার বিলি কেটে কেটে দিতেন যে সুড়সুড়ি
চন্দ্রিমা রাতে বাড়ির উঠোনে মাদুর পাতিয়া যতনে
ফুপুরা আমাকে কথার জাদুতে নিয়ে যেত স্বপনে।
চাঁদনী রাতের এমনি লগণে কখনো আসিতেন দাদু
পিকরাঙা মুখে লইয়া আসিতেন সোনালি কিসসার জাদু।
মায়ের আদর,দাদুর স্নেহ, ফুপুদের ভালোবাসা –
সব কিছু আজ দূরের জোছনা দূর অতীতের ভাষা।”
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন