1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

কোভিড-১৯ এবং আমাদের ট্যুরিজম: ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান

  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২১
  • ৭৪ দেখেছেন
ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান

এখন করোনা ভাইরাস কোভিড ১৯ মহামারিতে সাড়া দুনিয়াই আক্রান্ত আর আতঙ্কিত। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ছয়  লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এই অসুখে। মৃত্যু হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের  উপরে। পৃথিবীর প্রায় ২১৫টি দেশ এবং এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুশিয়ারি দিয়েছে নিয়ন্ত্রনবিহিন ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভাইরাস। সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন,শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসহ এমন কোন সেক্টর নাই যেখানে করোনা ভাইরাসের কালো থাবা পড়েনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভলিউমের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আন্তর্জাতিক পর্যটনের উপরও পড়েছে করোনার নিগেটিভ প্রভাব।

বিগত দশটি বছর ধরে আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্রমান্বয় উন্নয়ন ঈর্ষণীয় ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত দশ বছরে প্রতি বছর গড়ে ৩-৪ শতাংশ হারে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সঙ্খ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই হিসাবে চলতে থাকলে ২০৫০ নাগাদ আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বা সাড়ে চারশ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু করোনার জন্য সব হিসেবই কেমন যেন গরমিলের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছ।এই বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে UNWTO বা রাস্ট্রসঙ্ঘের টুরিজম অর্গানাইজেশনের হিসাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় ৩-৪% পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করোনার কালথাবায় সব সেক্টরের মত আন্তর্জাতিক পর্যটনও মুখ থুবড়ে পরতে বসেছে। ভর পর্যটনের মৌসুমেই করোনার আবির্ভাব সব লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক নিউজ বুলেটিনে জাতিসংঘের পর্যটন অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, এই বছর বিশ্ব পর্যটকের সংখ্যা বিগত বছরের চেয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ হারে কমে আসতে পারে। এবং সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে আয় কমে যেতে পারে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। করোনা  পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে এই ক্ষতির সংখ্যা ও পরিমান।

কোভিড-১৯ পর্যটন খাতকে প্রচন্ড ধাক্কা দিয়েছে

UNWTO ভাষ্য অনুযায়ী সব চাইতে যেই এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে তা হল আমাদের এশিয়া প্যাসিফিক এলাকা। তাদের অনুমান অনু্যায়ী এই বছর আমাদের এই রিজিয়নে অর্থাৎ এশিয়া প্যাসিফিক এলাকাতে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৯-১২ শতাংশ কমে যাবার আশংকা করা হচ্ছে  যা কিনা বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে। যদি তাই ঘটে, তবে বিগত দশ বছরের আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে এক নাগাড়ের উন্নতির লাগাম টেনে ধরতে পারে করোনা ভাইরাস। শুধু তাই নয়, বিশ্ব পর্যটনের ক্ষেত্রে করোনা যে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে তা কাটিয়ে উঠতে কত বছর লাগবে তার হিসেব নিকেষ হবে করোনার তান্ডব লীলা শেষ হলেই।

ইতালি, ইন্ডিয়া সহ অনেক দেশই বিদেশিদের জন্য তাদের দুয়ার বন্ধ করে দিয়েছে। বেশির আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস কোম্পানী গুলো যাত্রী সঙ্কটের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশে করোনা রোগীদের সুচিকিৎসা করার জন্য দেশে দেশে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। এই সবকিছুর নিগেটিভে প্রভাব পড়েছে পর্যটনের ক্ষেত্রেও।সামগ্রিকভাবে সমগ্র ইউরোপ এখন অন্তরীণ হয়ে আছে। অথচ এই ইউরোপেই বিশ্ব পর্যটকদের অর্ধেকই ভ্রমণ করতে যায়।

বাংলাদেশের পর্যটন এর উপর করোনার প্রভাব কি হতে পারে? এখনো সরকারি মহল মনে হয় তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরুই করেনি। আমাদের তিন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর অর্থাৎ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ২৮টি বিমান সংস্থা যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এর মধ্যে দেশীয় বিমান সংস্থা রয়েছে চারটি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে এই ২৮টি বিমান সংস্থার প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬০৬টি ফ্লাইট ছেড়ে যেত। কিন্তু গত জানুয়ারি থেকে অর্থাৎ প্রায় আড়াই তিন মাসের ব্যবধানে এই সংখ্যা বর্তমানে ৩৬৯–এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ, ২৮টি বিমান সংস্থা গত জানুয়ারি মাস থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত আড়াই মাসে ফ্লাইটের সংখ্যা ২৩৭টি কমিয়ে দিয়েছিল। আর বর্তমানে বাংলাদেশ সকল বিমান যোগযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন। সকল ধরনের ফ্লাইট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের ধারনায় এ অবস্থা চলতে থাকলে জানুয়ারি থেকে শুধু মার্চ মাস পর্যন্ত বিমানে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে ২৭০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ হোটেল সমিতির হিসাবে মার্চ মাসের শুরুতেই হোটেলগুলোর অগ্রিম বুকিং প্রায় ৪১ শতাংশ বাতিল করা হয়েছে। এখন সারা বিশ্বের যে অবস্থা তাতে এই বুকিং শতকরা ০ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এলেও বিস্মিত হবনা। কনভেনশন সেন্টার আর ব্যাংকোয়েট হলগুলো খালি পড়ে আছে। একটি ঐতিহ্যবাহী পাঁচতারা হোটেলে নাকি মাত্র নয় জন বিদেশী আছেন যারা প্লেন যোগাযোগ বন্ধ হবার কারণে আটকে পড়ে আছেন।  ট‍্যুর অপারেটরদের অবস্থা শোচনীয়। একাধারে ট্যুর ক্যানসেল হচ্ছে। ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড তো বটেই, ডমেস্টিক ট্যুরের জন্য এখন গ্রুপও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। সমস্ত কিছু কেমন যেন স্থবির হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের ট্যুরিজম সেক্টর সম্ভবতঃ এইবারই সবচেয়ে বেশি আঘাত পাবার দিকে এগিয়ে চলেছে। আমাদের দেশে ১৯৭২ সালে সম্ভবত অর্ধ লক্ষাধিক পর্যটক এসেছিলেন। ২০১৯—২০২০-২১ সালে এই সংখ্যা হয়তো কয়েক হাজারে নেমে আসতে পারে; অর্থাৎ বাংলাদেশের পর্যটন ইতিহাসে নিম্নমুখী পর্যটক আগমনের  রেকর্ড সৃষ্টিকারী বছর হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে।

ভবিষ্যতের পর্যটন

এখন প্রশ্ন হল এক্ষেত্রে আমাদের কি করা উচিৎ? সেদিন দেখলাম ট্যুর কোম্পানীগুলো এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছে সরকারের কাছে। এগুলোর বেশিরভাগই হাস্যস্কর এবং অবাস্তব। যেমন তারা সরকারের কাছে  তিন মাসের অফিস ভাড়া দাবী করেছে।করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ট্যুর অপারেটরদের  কাছে প্রফেশনালি যে প্রস্তাব আশা করা গিয়েছিল তার ধারে কাছেই তারা যায়নি। অন্যান্য সংগঠন গুলোও হাত  পা গুটিয়ে বসে আছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মনে হচ্ছে করার কিছুই নাই। তারা এখন বিমানের দুর্দশা নিয়ে হয়তো ব্যতিব্যাস্ত। সেটাই স্বাভাবিক। বিমানের রিহ্যাবিলিটেশন এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বিমান থেকে আয় তো সরাসরি মন্ত্রণালয়ের। পর্যটন থেকে আয় তো মন্ত্রণালয়ের পকেটে যায় না। সুতরাং সেই অর্থে পর্যটনের কোন অভিভাবক নাই। আমরা এইজন্যই বারবার বলে আসি পর্যটনকে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে একীভূত করে মিনিস্ট্রি অফ টুরিজম এন্ড কালচারাল এফেয়ার্স করা হোক।

যাই হোক, পর্যটন মন্ত্রণালয় আপাততঃ এই সমস্যা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে এবং ভবিষ্যতে কি ভাবে মাথা উচু করে দাড়াতে হবে এই বিষয়গুলি নিয়ে চিন্তা ভাবনার জন্য একটা টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে। তাদের লোকজন, প্র্যাক্টিশনার, একাডেমিকস এবং রিসার্চার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার নিয়ে এই টাস্ক ফোর্স গঠন হতে পারে। তারা বসেই ঠিক করবে ক্ষতির পরিমান, পথ খুজবে আপাতত এই পরিস্থিতিতে ক্রাইসিস ম্যনেজমেন্ট কি ভাবে হতে পারে এবং এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য ভবিষ্যতে কি পরিকল্পনা করা যেতে পারে।  আর একটা বিষয় মনে রাখতে হবে। এখন ঝড় বইছে, এখন কোন দূর্যোগ মোকাবিলার প্রয়োজন নাই। আমরা দূর্যোগ এর সাথে লড়তে পারিনা। সুতরাং দূর্যোগ আসার আগে এবং দূর্যোগ চলে যাবার পরেই কি করতে পারা যায় সেই পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। সুতরাং পর্যটন সংশ্লিষ্টদেরও সতর্কতার সাথে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

এবারে একটু ভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করি। ফেইসবুকে কিছুদিন আগে একটা সংবাদ ভাইরাল হয়েছিল। পর্যটক না থাকার কারনে নাকি কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের পানি নাকি একদম নীল হয়ে এসেছে এবং সেই সাথে সমুদ্রতটের অতি নিকটেই নাকি ডলফিনেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই সংবাদের সত্যতা কতটুকু জানিনা, কারণ যে ছবিটা ভাইরাল হয়েছে তাতে সমুদ্রের অবস্থান দেখে আমার ব্যক্তিগত ভাবে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তার পরেও ভাবি, সংবাদটা যেন সত্যই হয়। এই সংবাদ সত্য হলে সবাইকে বোঝানো সম্ভব হবে সাস্টেইনেবল টুরিজম কাকে বলে। এটি সাস্টেইনেবল ট্যুরিজম এর এক সুন্দর কেইস স্টাডি হতে পারে। শুধু তাইনা, এর উপর ভিত্তি করে আমাদের পর্যটন স্থানগুলোর সাস্টেইনাবিলিটির উপর পলিসি তৈরি করা যেতে পারে। যেমন ২/৩ বছর পরপর এই সমস্ত সংকটাপন্ন পর্যটন স্থানগুলোর রেশনিং করা যেতে পারে। অর্থাৎ এই সমস্ত সংকটাপন্ন স্থানগুলো ২/৩ বছর পরপর পর্যটকদের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে পারা যায়।   এতে আমাদের সংকটাপন্ন পর্যটন স্থানগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।  সুতরাং করোনা যে আমাদের শুধু ধ্বংসই এনেছে তা নয়, পর্যটন প্রকৃতির জন্য করোনা আশীর্বাদ বয়েও আনতে পারে। পরিশেষে বলব, পর্যটন অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি শিল্প। সুতরাং পরিকল্পনা ও পলিসি প্রণয়নের  ক্ষেত্রে পর্যটনকে চামড়া শিল্প, সিমেন্ট শিল্প, জাহাজ ভাংগা শিল্প এমনকি গার্মেন্ট শিল্পের সাথেও এক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ হবেনা।

-ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান: অধ্যাপক, মেরিটাইম টুরিজম ডিপার্ট্মেন্ট,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর        রহমানমেরিটাইম ইউনিভার্সিটি। সাবেক অধ্যাপক,টুরিজম এন্ড হসপিটালিটি বিভাগ,ঢাকা        বিশ্ববিদ্যালয়

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com