1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ০১:৫১ পূর্বাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ(ষষ্ঠ পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির 

  • আপডেট সময়: মঙ্গলবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৯৮ দেখেছেন
স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
কলেজ ক্যাম্পাস কয়েকদিন থেকে মিছিল-পাল্টামিছিল,  স্লোগান-পাল্টাস্লোগানে সরগরম হয়ে উঠেছে। কারণটা কী প্রথম দিকে না বুঝলেও মাঝেমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদসূত্রে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একটা বিভাজনের হাওয়া টের পাচ্ছিলাম। ছাত্রলীগ ভেঙে যাচ্ছে। নেপথ্যের মূল মানুষদের তখনো চিনি না।আমরা চিনি সত্তুরের নির্বাচনের আগে-পরে, বিশেষ করে অসহযোগ আন্দোলনের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তৃতা-বিবৃতি ও প্রকাশিত সংবাদ থেকে ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন,ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজকে। তারা দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে, ভাবতেও খারাপ লাগছে।
আ স ম আবদুর রব, তিনি আমার খালাতো ভাই। তাঁর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয় নি। কারণ মাঝখানে বিশাল বাঘাদোনা নদী, একপাড়ে আমাদের চর জব্বার,অপর পাড়ে তাঁদের রামগতি। খালিচোখে আমাদের এই পাড় থেকে ওই পাড়কে দেখা যায় সরু নীল ফিতার মতো। শৈশবেই মায়ের কোল ছেড়ে আমি লাফিয়ে পড়লাম দূর ভূবনে। আমাদের দেখা হবার সুযোগ কোথায়!
মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিশেষ আদর্শ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয়নি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুঃশাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনে বিজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, পাকিস্তানিরা আসলে পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশই মনে করে, তখনই বাঙালি তার ভাষা ও সংষ্কৃতিকে অক্ষুন্ন রাখা ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয়তাবাদের চেতনা থেকে চুড়ান্তভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্খা করে, যে কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আহ্বান জানান যা থেকে  মুক্তিযুদ্ধের সুচনা।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আাসার পর দেখা গেল ছাত্র সমাজের আকাঙ্খা হয়ে উঠেছে সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর তিনিও তাদের আকাঙ্ক্ষার সাথে একমত হলেন। যদিও বঙ্গবন্ধু  সমাজতন্ত্রের কথা আগে কখনো সরাসরি বলেননি, তবুও পঞ্চাশের দশকে চীন ভ্রমণের সময় চীনা কমিউনের সমবায়ী পদ্ধতির চাষবাসের ধারণা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুূদ্ধের সময় পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য সহযোগিতার কথা মনে রেখে তিনি ছাত্রদের আকাঙ্খিত সমাজতন্ত্রের ভাবনার কথা ভাবেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন স্বদেশভূমিতে ফিরে আসার দুই মাসের মাথায় কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং যুদ্ধ-বিধ্ধস্ত বাংলাদেশকে পূণর্গঠনের সহযোগিতা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়ন  ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণের সময়ও তিনি উন্নত সোভিয়েত দেশকে দেখে সমাজতন্ত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রথম স্বাধীনতা দিবসের বেতার ভাষণেও তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।
বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র সোভিয়েত নাকি চৈনিক কাঠামোর আলোকে  প্রতিষ্ঠিত হবে তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা তখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অথবা তাঁর অনুগত ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ভাবেননি। যদিও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ তাঁর দল ন্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশে সোভিয়েতের আদলে সমাজতন্ত্র কায়েমের রাজনীতি করছেন পঞ্চাশের দশক থেকে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে অনুপ্রাণিত কমরেড মনি সিংহ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯২৫ সাল থেকেই কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দলের নাম কমিউনিস্ট পার্টি। অপরদিকে  মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেও পরবর্তীতে চীনা কমিউনিস্ট ভাবধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন। চীনপন্থী অনেকগুলো ছোট ছোট রাজনৈতিক দল পাকিস্তান আমল থেকেই কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার কথা বলে রাজনীতি করছেন,যারা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগ, যারা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জীবনমরণ পণ করেছিল, লড়াই করেছিল,তারাই বিভাজনের রজনীতিতে জড়িয়ে পড়ল। আপাতদৃষ্টিতে এমনটা মনে হতে পারে এ বিভাজনের খেলা বুঝি সাম্প্রতিক, কিন্তু না,ছাত্রলীগের দুই প্রবাদপ্রতিম নেতা শেখ মণি ও সিরাজুল আলম খান, যারা ষাটের দশক থেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন,এবং  তাদেরই অনুসারীরা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দুইধারার রাজনীতি চালু রেখেছিল। শেখ মণির অনুসারীদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পথে ক্ষমতা অর্জন লক্ষ্য হলেও  সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা স্বাধীনতার স্বপ্নকে সামনে রেখেই আন্দোলন সংগ্রামের কঠিন পথ ধরে এগোতে থাকে। চুড়ান্ত বিজয় অর্থাৎ স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কৌশলগত কারণে বঙ্গবন্ধুরও দুটো ধারারই প্রয়োজন ছিল।
স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্ধস্ত দেশটির যখন পুনর্গঠন দরকার, সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ দরকার তখনই পুরাতন সেই ব্যক্তি-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ। যুদ্ধের ভেতরই সেই বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিএলএফের ট্রেনিং ক্যাম্পে অক্টোবরের শেষ দিকে সিরাজুল আলম খান অতি আবেগের আতিশয্যে তাঁর মোটিভেশনাল বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ‘মুজিববাদ’ বলে প্রকাশ করলেন। স্বাধীনতার পর তারা স্লোগান দিল,বিশ্ব এলো নতুন বাদ, মুজিববাদ,মুজিববাদ। জুন মাসের ৩ তারিখ ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে পালটাপালটি স্লোগান দেওয়া শুরু হলো। সিরাজ গ্রুপ স্লোগান দিল, বিপ্লব বিপ্লব সামাজিক বিপ্লব। শেখ মণির গ্রুপ স্লোগান দিল পাতি বিপ্লবী খতম কর,মুজিববাদ কায়েম কর। মুজিববাদ চলে গেল শেখমণির কোর্টে। একপক্ষ মারমুখী স্লোগান দিল, সি আই এর দালালেরা হুশিয়ার সাবধান।  অপরপক্ষ স্লোগান দিল, চীন-রাশিয়ার দালালেরা হুশিয়ার সাবধান।
রাজধানী থেকে এই মেরুকরণের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল সারাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। সদ্য মুক্তিযুদ্ধ করে ঘরে ফেরা ছাত্রলীগের বীর তরুণেরা যারা একদিন মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল,তারা প্রথমে বিভ্রান্ত হয়,পরে ধীরে ধীরে বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
মেরুকরণের সেই ঢেউ আমাদের সিলেট শহরেও চলে আসে। মেরুকরণের এইসব নেপথ্যকাহিনী আমার তখনকার জ্ঞানসীমার নয়, এসব আমার পরবর্তী সময়ের উপলব্ধি। আমরা কেবল দেখলাম, আমাদের ক্যাম্পাস হঠাৎ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুইখণ্ড মিছিল দুই দিকে চলছে, দুইটা আলাদা জায়গা দখল করে আবার মিটিং করছে, মারমুখী স্লোগান দিচ্ছে। আমরা কখনো বোকা বালকের মতো একবার এই দল,আরেকবার ওই দলের মিটিংয়ে গিয়ে  দাঁড়াই। কোনো কোনো নেতা তাদের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে মুজিববাদের ব্যাখ্যা দেন। মুজিববাদ হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র,জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মিশেলে এক নতুন সমাজব্যবস্থা,সেই সমাজে মানুষের সাম্য আর অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা হবে।অপরপক্ষের সভায় মুজিববাদ নিয়ে কটাক্ষ করে বলা হলো, মুজিববাদ হলো একটা সালসা। দিনাজপুরের মাটি,খুলনার মাটি, সিলেটের মাটি আর রাঙামাটির মাটি বুড়িগঙ্গার পানিতে গুলিয়ে এই সালসা তৈরি হয়।
নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তৃতায় যতনা আদর্শিক বক্তব্য দেন,তার চেয়ে বেশি কেন্দ্রীয় নেতাদের চরিত্র হনন করতে থাকেন। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের দুই নাম,একদলের নাম রব গ্রুপ, অপর দলের নাম মুজিববাদী গ্রুপ। কয়েকদিন পর দেখলাম ছাত্র ইউনিয়নও একইভাবে ক্যাম্পাসের রাস্তায় মিছিল করছে, মিটিং করছে।
 আমাদের কলেজ ক্যাম্পাসটা খুব সুন্দর। একটা টিলার উপর আছে প্রশাসনিক ভবন। টিচারদের কমনরুমও সেখানে আরেকটা এক্সটেন্ডেড দালানে। আরেকটা টিলার উপর আছে দোতলা কলা ভবন। ভবনের সামনে বিশাল সবুজ চত্বর। প্রশাসনিক ভবনের পেছন দিকে টিলাগড়ের মেইন রাস্তার পাশে প্রফেসরদের ডরমিটরি। টিলাগুলোতে ওঠানামার জন্য আছে সিঁড়ি। কলেজের সামনের দিকে সমতলে আছে বিজ্ঞান বিভাগ। দুটো বড় বড় টিনশেড ভবনে আছে ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট। কলাভবনের বামপাশের সমতলে আছে কলেজ ক্যান্টিন। ক্যান্টিনের সামনে আছে বিশাল দিঘি।দিঘির পাড় জুড়ে পামগাছের সারি। দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় চারতলা বোটানি ডিপার্টমেন্ট। এই দালানের পেছন থেকেই শুরু হয়েছে এমসি ইন্টারমিডিয়েট সরকারি কলেজ।
 কলেজের প্রধান প্রবেশ পথ থেকে ক্যম্পাসের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে কলেজ ক্যান্টিন পর্যন্ত। আমাদের মিছিল-মিটিং এই রাস্তা আর রাস্তার পাশের উন্মুক্ত জায়গা, পামতলা এবং ক্যান্টিন পর্যন্ত। আমাদের কলেজেও নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছিল। কলেজ ক্যাম্পাসের উত্তাপ এবার হোস্টেল পর্যন্ত এলো। এবং টার্গেট হলাম আমরা যারা ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। আমাদের দলে টানার খেলা শুরু হলো। ছাত্রনেতারা আমাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেন, গ্রামের বাড়ি, বাবা-মা, পড়াশোনার খবর নেন। দলে ভেড়ানোর জন্য তারা দলবেঁধে আমাদের রুমে চলে আসেন। একদিন হলো কী,ছাত্র ইউনিয়নের ভাইয়েরা আমার কাছে এলেন। তাঁরা সহজ ভাষায় সমাজতন্ত্র সম্পর্কে একটা ধারণা দিলেন,পাশাপাশি সমাজতন্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের উত্থাপিত প্রস্তাবকে ভুল বলে মত প্রকাশ করেন। আমার মনোভাব বুঝার জন্য তারা টেবিলের উপর রাখা আয়নাকে( লুকিং গ্লাস) এমনভাবে ঘুরিয়ে রাখেন,যাতে আমার মুখের পরিবর্তনটুকু তারা ধরতে পারেন।
ছাত্রনেতারা যারা কলেজ ক্যাম্পাসে বক্তৃতা করতেন, সবাই আমাদের কলেজের নয়। তারা মদন মোহন কলেজ, মেডিকেল কলেজ অথবা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে আসতেন। তাদের কেউ কেউ সিলেট জেলা কমিটির নেতা। হোস্টেলে আসার কারণে তাদের নামও জানা হচ্ছিল। লালা ভাই,লামা ভাই, সিরাজ ভাই,রাইসুল ভাই, শোয়েব ভাই। আবু হোসেন ভাই, মনজু ভাই তো আমাদের ব্লকেই থাকেন। ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে আহমাদ আল কবীর ভাইকে চিনি। তিনি আমাদের ২ নম্বর ব্লকে থাকেন।
এরইমধ্যে একদিন খবর পেলাম ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব সিলেট আসবেন। সারদা হলে তিনি কর্মী সমাবেশে বক্তৃতা দিবেন। ডাকসুর সহসভাপতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততদিনে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মার্চের ১ তারিখ  প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন স্থগিত করলে পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ডাকসুর সহ-সভাপতি স্বাধীন বাংলার পতাকা দুলিয়ে বলেছিলেন,আজ থেকে এটাই বাংলাদেশের পতাকা। পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে এটা ছিলো প্রকৃত অর্থে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ। সেদিন থেকেই সমগ্র ঢাকা এবং পূর্ব বাংলার সর্বত্র এই পতাকার আদলে নির্মিত পতাকা উড়তে থাকে। সেটাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পতাকা যা আজও (মানচিত্র বাদে) বাংলাদেশেরই পতাকা। এবং  তার পর থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা হিসেবে তাঁর গৌরবজনক ভূমিকার কথা কারো অবিদিত নয়।
শৈশবে কখনো দেখা হয়েছিল কিনা মনে পড়ে না। তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য চলে গেলাম সারদা হলে। বিশাল হল,কানায় কানায় পূর্ণ। আমি যখন পৌঁছলাম তখন তিনি বক্তৃতা শুরু করছেন। বারান্দার ভিড় কাটিয়ে দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে পারলাম। তাঁর পরনে লম্বা সাদা পাঞ্জাবি আর ঢোলা পায়জামা। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে তিনি খুব শান্ত কন্ঠে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে,তা নিয়ে কথা বলছিলেন।  বক্তৃতামঞ্চের পেছনে দেওয়ালে লাগানো ব্যানারে লেখা ‘আমাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ লেখার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি সমাজতন্ত্র নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। সেই আলোচনা, সমাজতন্ত্র নিয়ে তাত্ত্বিক  বিশ্লেষণ- এসব আমি তেমনটা বুঝতে পারছিলাম না, আমি কেবল অবাক হয়ে, মুগ্ধ হয়ে ডাকসুর সহ-সভাপতির বক্তৃতা শুনছিলাম।  তিনি  দেয়ালে ঝোলানো একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘শ্রেণি সৃষ্টির শিক্ষা নয়,মানুষ সৃষ্টির শিক্ষা চাই ‘- এই লেখাটা পড়লেন, তারপর সবার উদ্দেশে বললেন, আমরা এই শিক্ষাটাই এই দেশে কার্যকর করতে চাই। একটা বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং একইসঙ্গে সকল মানুষের বাধ্যতামূলক শিক্ষাগ্রহণের নানা কৌশল নিয়ে কথা বলেন।
 দুপুর গড়িয়ে গেলে বক্তৃতা শেষ হয়। মঞ্চে বসা অনেককেই ততদিনে আমি চিনে গেছি। ডাকসুর সহ-সভাপতির বক্তৃতার পর হলের ভেতর নড়াচড়া শুরু হলো। সভাপতি দু-চার কথা বলে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। উপস্থিত নেতাকর্মীদের লক্ষ্য হয়ে উঠল তাদের আজকের অতিথি। একবার অন্তত নেতার দৃষ্টিতে পড়ার আকাঙ্খা।
 সারদা হলের বারান্দা, বারান্দা ছাড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত দীর্ঘ পথের দুই পাশে সার করে দাঁড়িয়ে আছে নেতাকর্মীরা,কারণ এখনই এই পথে বেরিয়ে যাবেন তাদের নেতা। আমি কোথায় দাঁড়াব,আমি তো আর তাদের কর্মী নই। নুড়ি পাথরের মতো ধাক্কা খেতে খেতে কোনোভাবে পথের শেষপ্রান্তে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালাম তারপর কাছিমের মতো মাথাটা নেতা আসার পথের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
সবার মাথাকে ছাড়িয়ে একসময় রাজপুরুষের মতো দীর্ঘদেহী সুদর্শন আ স ম আবদুর রবকে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে আসতে দেখলাম। তাঁর সঙ্গে আসছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তাদের আসার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে পথ,মনে হচ্ছ জোয়ারের পানিতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে শূন্যস্থান।
আর মাত্র চার-পাঁচ হাত দূরে। আমি হঠাৎ করে ভিড় ঠেলে লাফিয়ে পড়লাম পথের মাঝখানে। ততক্ষণে তিনিও সামনে এসে পড়েছেন। ততক্ষণে হইহই করে উঠল নেতাকর্মীরা। আমি বেপরোয়ার মতো বলে উঠলাম, ভাইয়া আমি মনি। তিনি আমাকে চিনতে পারলেন না। আমি দ্রুত আমার পরিচয় দিলাম। আমাকে তিনি চিনতে পারলেন।বললেন, তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস। এখানে কোথা থেকে এলি?
বললাম, আমি তো এমসি কলেজে পড়ি। ইন্টারমিডিয়েটে।
আমার গায়ে নীল চেকের খদ্দরের শার্ট। ধাক্কাধাক্কিতে দুটো বোতাম খুলে গেছে। আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি আমার বোতামগুলো লাগিয়ে দিলেন।
রব ভাইয়ার পাশেই ছিলেন ছাত্রনেতা লামা ভাই। আমি তাঁকে চিনি। তিনি দলবল নিয়ে একদিন আমদের হোস্টেলে এসেছিলেন।
তিনি এগিয়ে এসে বললেন, তুমি ফার্স্ট ব্লকে থাকো না নি?
আমি বললাম, জি।
ভাইয়া বললেন, লামা,তোরা খেয়াল রাখিস। আমার ভাই।
আমাকে বললেন, আমি তো কিছুক্ষণ পর চলে যাব। ঠিক আছে, সাবধানে থাকিস। সমস্যা হলে লামা, রইসুল,শোয়েব ওদের বলিস।
আমি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলাম। সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের হোস্টেলে এলেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। আমাকে সঙ্গে নিয়েই তারা ঘুরলেন এই রুম সেই রুম। সবাই আমাকে সমীহর চোখে দেখতে থাকে।
আমাদের সিনিয়রদের মধ্যে প্রায় সকলেই মুজিববাদী ছাত্র সংগঠন করতেন। নুরুল হক মনজু তাঁদের নেতা। বড় ভাইয়েরা আগে জানতেন আমি ১১ জনের নেতা,সেখানে দলমত ছিল না।এখন ধরেই নিলেন আমার দলের ১১ জনের সবাই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী। আমি তো জানি আমাদের চুনারুঘাটের আকবর আলী ইতিমধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে গেছে। আমাদের আসাদ তারপর খালিক, আরাফাত, সিরাজ এদের ভাব বুঝা দায়।  আসলে রাজনীতির আমিই বা কী বুঝি!  না চাইতেই রাজনীতি আমাকে পেয়ে বসে। আমার ক্লাস এইটের বছর আরেকবার আমাকে রাজনীতি পেয়ে বসেছিল।
ক্লাস সেভেন থেকে আমি নতুন ক্লাসে উঠেছি। বরাবরের মতো ফার্স্ট হয়ে। একদিন শুক্রবার বিকেল বেলা আমাকে তাঁর বাসায় যেতে বললেন খাদিম স্যার।খাদিম স্যার আমাদের পিটি স্যার। তাঁর বাড়ি আখাউড়ায়।
স্যারের বাসায় গিয়ে দেখি ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত কয়েকজন ছাত্র বসে আছে। সবাই ভালো ছাত্র।  স্যারের সঙ্গে অপরিচিত আরো দুইজন ছিলেন। কিছুক্ষণ তারা কী সব কথাটথা বললেন। তারপর একটা কাগজে নাম-টাম লেখা হলো। আমাকে করা হলো সভাপতি। অন্যান্য সবাইকে নানা পদ দেওয়া হয়েছে। আমি তো মহাখুশি, আমি সভাপতি হয়েছি।
স্যার বললেন, তুমি তো ফার্স্ট বয়,আমরা ফার্স্টবয়দের সভাপতি বানাই। আমি ছাত্র সংঘের সভাপতি হলাম। তখন এটাও জানতাম না যে এটা হলো জামায়াত ইসলামের ছাত্র সংগঠন। যুদ্ধের সময় জেনেছিলাম জামাতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগী হিসেবে  রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করে মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালির বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযানে অংশ নিয়েছিল।
আমি সভাপতি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আমার নামে একটা চিঠি এলো। ঢাকা থেকে ছাত্র সংঘের সভাপতির লেখা। সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা চিঠি, উপরে সুন্দর নকশায় আঁকা ‘আল্লাহ আকবর’। সঙ্গে এলো কয়েকটা স্লিম সাইজের বই। আমার খুশি দেখে কে? আমার নামে বই আসছে, ঢাকা থেকে বড় কেউ একজন আমাকে চিঠি পাঠাচ্ছে, এটা কী আমার জন্য কম কিছু? কিন্তু আরো পরিণত সময়ে বুঝতে পারলাম, রাজনীতিকে তারা একটা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। উনসত্তুরের গণ আন্দোলনের আগেই পূর্ব বাংলায় তারা তাদের রাজনীতির বীজ বপণ করে ফেলেছিল।
আমার কাছে চিঠি এবং বই আসতো নিয়ম করে, প্রতি সপ্তাহে, স্কুলের ঠিকানায়। এভাবে তিন-চার সপ্তাহ এলো। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক স্যার। স্যারের মেয়ে মঞ্জুও আমার সঙ্গে পড়ে। একদিন  সকালবেলা আমার ডাক পড়ল স্যারের রুমে। আমি এর আগে কখনো হেডস্যারের রুমে যাইনি।
স্যারের রুমে গেলাম ভয়ে ভয়ে। ঢাকা থেকে আসা একটা বইয়ের প্যাকেট স্যারের সামনে।
স্যার বললেন, এগুলো তোর?
আমি খুব গর্বের সঙ্গেই বললাম, জি স্যার।
স্যার বললেন, তুই জানিস যারা তোকে এগুলো পাঠায় তারা কারা?
বললাম, জানি না।
স্যার বললেন, কে তোকে এর সঙ্গে জড়িয়েছে।
বললাম,খাদিম স্যারই তো আমাকে সভাপতি বানিয়েছেন। আমি তো ফার্স্ট, তা-ই আমাকে সভাপতি করা হয়েছে।
স্যারের একটা কমন গালি ছিল, বেহুভ (বেকুব)।  বললেন, বেহুভ, তুই জানস,তুই তোর কত বড় ক্ষতি করছস? আর কে কে আছে?
বললাম,  স্যার,আমার কী দোষ? খাদিম স্যারই তো ক্লাস সেভেন, এইট আর নাইনের কয়েকজনকে বাসায় ডেকেছিলেন।
স্যার খুব রেগে গেলেন।তাঁর মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। আমাকে আর কিছু বললেন না। খাদিম স্যারকে ডেকে পাঠালেন দপ্তরিকে দিয়ে। খাদিম স্যার এলেন একটু পরেই। হেড স্যার সরাসরি বললেন,আপনি এটা কী শুরু করেছেন? এরা আমাদের স্কুলের অ্যাসেট। বোর্ডে পজিশন পাবে।আর আপনি তাদের মাথায় রাজনীতি ঢোকাচ্ছেন?
খাদিম স্যার কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হেড স্যার বললেন, আপনি যদি এসব বন্ধ না করেন,আমি কতৃপক্ষের দৃষ্টিতে আনব।
সেদিনই টেলিফোনে বিষয়টা আমার অবিভাবককে জানানো হলো। সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরলেন কাকু। অগ্নিমূর্তি।  একটা বড় লাঠিও জোগাড় করে নিয়েছেন এরইমধ্যে। ছোটবেলায় পড়া বুঝানোর সময় তিনি আমাকে চড়-থাপ্পড় দিয়েছিলেন। তা-ও সুবিধা করতে পারতেন না, কাকীমা সামনে দাঁড়িয়ে যেতেন। বড় হতে হতে যখন দেখলেন, ফার্স্ট হওয়াটা থামছে না, তাই বকাঝকাটা থেমে গেছে। কিন্তু আজ আমাকে কে রক্ষা করবে? দুর্গতিনাশিনী দুর্গার মতো আজও কাকিমা হা-হা করে ছুটে এলেন।
সে যাত্রায় আমি কেবল কাকুর মুগুর থেকে রক্ষা পেলাম না,রক্ষা পেয়ে গেলাম এক অশুভ শক্তির অপছায়া থেকে। আমাদের হেড স্যার ছিলেন মুক্তচিন্তার মানুষ। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে ছিল তাঁর অবস্থান। তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, কারণ তিনি আমাকে একদল উন্মাদ রাক্ষসের কবল থেকে সময়মতো উদ্ধার করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলো আমাদের খাদিম স্যার পাকিস্তানি প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং তার নাম দালালের তালিকায় উঠেছিল। দালাল আইনে গ্রেফতার হয়ে তিনি জেলে চলে গেলেন।
(চলমান…….)
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন