1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (৭ম পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ১৬৮ দেখেছেন
 দিনগুলো পার হয় রোদ-ঝিলিক দিয়ে, চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উড়ে আসা মেঘ-বরিষণের খেলা দেখে। হোস্টেলের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমাদের সবুজ মাঠ, মাঠ পেরুলেই কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ,মাঠের সবুজ যেন শেষ হয় না, মন উদাস হয়ে যায় কখনো। ঘাসের সবুজ ডগায় রোদের রঙ ছড়ালে সারা মাঠ এক অপূর্ব বিভায় ঝলমল করতে থাকে, রোদের সুষ্মিত ভালোলাগাটুকু উপভোগ করতে করতেই একদিন দেখা গেল আকাশের নীল ঢেকে গেছে মেঘের ঘন আস্তরণে। এরপর শুরু হয় বৃষ্টির অবিরাম ঝরঝর। সবুজ ঘাসগুলো তখন আশ্চর্য এক যৌনতার স্পর্শ পেয়ে শিহরিত হতে থাকে।
আমাদের হোস্টেলের বেশ খানিকটা দূরে, দক্ষিণে, ঘন সবুজ আচ্ছাদিত নিচু পাহাড়, আমি কখনো কাছে যাইনি। আমার মনে হতো পাহাড়ের পরে আছে তেপান্তরের মাঠ। ওখানে আমি এক কিশোর-কিশোরীকে সাদা পোশাকে হাত ধরাধরি করে ছুটতে দেখি।
আমাদের করিডোরের এক্সটেনশনে টিনের চালার নিচে একজোড়া চড়ুই বাসা বেঁধেছে। খুব হুটোপুটি করে, তাদের চঞ্চল ডানায় ঝলমল করে রত্তি রত্তি  সোনা। আনমনে খেলা দেখি তাদের। একদিন অনুমান করি, তাদের বাড়িতে নতুন অতিথিরা এসেছে। খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ওরা উঁচুতে থাকে। আমি পাহারা দিয়ে রাখি,আমার ভয়, নুরু মিয়া না আবার খোঁচাখুঁচি করে! আমি একা একাই এই খেলা দেখি, কাউকে দেখাই না,বলি না।
আমি আমার মধ্যে এক আশ্চর্য পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম, কেন (?),  আমি তাহলে সত্যিই কী তার প্রেমে পড়েছি! অনেকদিন আগে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমাদের পুরান বাজারের রাস্তায়। সে তখন স্কুল থেকে  ফিরছিল,দলবেঁধে, সতীর্থরা একসঙ্গে। ঘরে ফেরার আনন্দ হয়তো, তাদের চোখ-মুখ খুশিতে নাচছিল, তারা হেসে গড়িয়ে পড়ছিল একজন আরেকজনের উপর। কিন্তু সে ছিল সবার থেকে আলাদা, সাদা ওড়নায় জড়িয়ে নিজেকে আরো অভিজাত করে রেখেছিল। এক পলকের জন্য সে তার স্নিগ্ধ চোখজোড়া তুলে আমার দিকে তাকালো, অমনি মনে হলো বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অজানা শিহরণের কম্পন।
আমাদের  প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। রেজাল্টের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না। অপেক্ষায় আছে দ্বিতীয় বর্ষের  ক্লাস রুটিনের জন্য। এই ফুরসতে ঘুরে বেড়াও কদিন। একদিন ফার্স্ট ব্লকের সবাই চললাম তামাবিল-জাফলংয়ে পিকনিক করতে। একটা বড় বাসে করে চললাম সারা রাস্তায় মাইকে গান বাজাতে বাজাতে। বড়ভাইরা আমাদের গাইড, তবে আজ আমাদের জন্য সিনিয়র-জুনিয়রের ব্যরিকেড  উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমরা  অল ফ্রেন্ডস’। কিন্তু আমরা সচেতন থাকলাম, আমাদের সিগারেটের প্যাকেটগুলো যাতে প্যান্টের উপর থেকে দৃশ্যমান না হয়। বড়ভাইরা আমাদের হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিলেন। আমরা ইচ্ছে মতো হাবিজাবি বকলাম। সিনেমার গানগুলোকে সিলেটি ভার্সনে গাইলাম, ‘হিদিন তুমি কী যেন কি ভাবছিলায় /এখলা বইয়া দ্বারো / খতা যে সে প্রশ্ন খরি,বাবছ কি আমারে!’ অথবা
‘আহা এখটি মেয়ে আমি দেখছি হিদিন / এলোচুলে চুলে জনালায় উবাইয়া আছিল / বিয়ালের সুনারোদ আখতা আইয়া / অনুরাগে দেহখানি জড়াইয়া ছিল / আহা এখটি মেয়ে আমি দেখেছি হিদিন।’এভাবে যে যার মতো করে গান করলাম, কেউ কেউ চুটকি শুনিয়ে হাসিতে আনন্দে ভাসিয়ে দিল। শুধু মুজিব বলল, কী তা বা, প্রেমো ফড়ছ না কি তা?
আমি ভাব ধরে থাকি।
আমরা প্রথম গেলাম তামাবিল কাস্টমস চেকপোস্টে। কাস্টমসের অফিসাররা আমাদেরকে খুব কদর করলেন। একটু দূরের সীমান্তরেখা দেখালেন, নিজেরা সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ভরতীয় ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের অফিসের সামনে। তখন কমলার সিজন। কমলা বোঝাই হয়ে ট্রাক এসে থামছে। শ্রমিকরা বড় বড় টসটসে কমলার ঝুড়ি নামাচ্ছেন। এগুলো সব বাংলাদেশে আমদানি হয়ে আসবে।  সেখানে বেশিসময় থাকা হলো না। আমাদের কাস্টমসের অফিসার বললেন,  একটু পরেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে সব। চলেন, ফিরে যাই।
ফিরে আসলাম কাস্টমস অফিসের সামনে। তখন কাস্টমসের কেউ একজন বড় একটা  কমলার ঝুড়ি আমাদের সামনে এনে দিল। আমাদের পায় কে, যে যার মতো কমলা নিল,দশটা পনেরোটা। নিমেষেই ঝুড়ি খালি। আমাদের অবস্থা দেখে কাস্টমসের বয়স্ক একজন ভদ্রলোক, সম্ভবত তিনি সবার বস, খুব মায়াভরা কন্ঠে বললেন, বাইচ্চাইনতোরে আরেকটা খাঁচা বার খরি দেওরে বা। তখন অফিসের ভেতর থেকে আরেকটা খাঁচা বের করে দেয় একজন কর্মচারী। সেটাও খালি হতে সময় লাগে না। আমরা কমলা খাই, আর পাহাড়ের ঢালুতে দাঁড়িয়ে কমলার রস প্রস্রাব করি।
আমাদের বাস দাঁড়ানো ছিল ঢালুতে। আমরা হেঁটে হেঁটে নেমে এলাম। বাস চলল পাহাড়ের পথে এঁকেবেঁকে। এবার আমরা এলাম পাহাড়ঘেরা এক সুন্দর সমতলভূমিতে। সিনিয়র কেউ একজন বললেন, এই জায়গার নাম শ্রীপুর। এটাই পিকনিক স্পট।
আমরা হইচই করে নেমে গেলাম। রান্নাবান্না একরকম করেই আনা হয়েছে। বাবুর্চিরাও সঙ্গে এসেছে। কাজেই ভাবনা নেই। আজির ভাই, তার সঙ্গে আরো সিনিয়র  চার-পাঁচজন থাকলেন। আমাদের বললেন, যাও, ওই তো ওদিকে নদী আছে। ঘুরে বেড়াও। শোনো, খাবার সময় হলে মাইকে ডাক দেবো। দেরি করবে না।
আমরা ১১ জনও ভাগ হয়ে গেলাম। আমরা একদলে এলাম পাঁচজন। কিছুদূর হাঁটতেই চোখের সামনে পাহাড়ি নদী। কী সুন্দর! কুলকুল করে জল ছুটছে, কী স্বচ্ছ! নদী শুয়ে আছে নুড়ি পাথরের বিস্তৃত প্রচ্ছদপটে, নদীর বুকজুড়ে বড় বড় পাথর যেন জলের ওপর ভেসে আছে  তারা।
হাঁটু গেড়ে আঁজলাভরে জল তুলে মুখে  দিলাম। শীতল মিষ্টি জলে তৃষ্ণা মিটে যায়। নুরুল হকের মনে হলো,হাঁটুজল। জলের নিচে পাথরের বুকে ঝাঁক বেঁধে খেলা করে স্বচ্ছ মাছেরা। মনে হয়, হাঁটু জল,হাত বাড়িয়েই মাছগুলো ধরা যাবে। মাছ ধরবে বলে নুরুল হক  জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে যে-ইনা নামতে গেল, অমনি শরীরটা ডুবে গেল বুক পর্যন্ত। আমরা টেনে তুললাম তাকে।
নদীর ওপারেও বৃক্ষশোভিত সমতল ভূমি। এবং তার পরেই শুরু হয়েছে পাহাড়সারি। পাথরের উপর সতর্ক পা ফেলে ফেলে আমরা পার হয়ে গেলাম নদীর ওই পারে। একটু সামনে যেতেই  চোখে পড়ল উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে পত্রপল্লবের আড়াল চিরে  ছুটে চলেছে গাড়ি। আমরা মনের খুশিতে হাঁটছি তো হাঁটছি, পেছনে আমাদের পিকনিক স্পট থেকে মাইকের ভেসে আসা গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছি অস্পষ্ট। হঠাৎ আমাদের সামনে পড়ল এক পাহাড়ি শুকনো ছড়া, পায়ের নিচে শুকনো বালু অথবা সুক্ষ্ম পাথর। মাথার উপর দীর্ঘ সামিয়ানার মতো ঝুলে থাকে লতাঝোপ। দেখতে বেশ একটা সুড়ঙ্গপথের মতো। আমরা স্বচ্ছন্দে শুকনো ছড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটছি তো হাঁটছি। যেতে যেতে হঠাৎ আমাদের পথটা বেঁকে গেল বাম দিকে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের চোখের সামনে অনেকগুলো কমলা গাছ। গাছে গাছে ঝুলে আছে সবুজ কমলা, কমলা রঙের কমলা। আমাদের এবার পায় কে! আমরা কমলাবনে ঢুকে গেলাম। কমলা বাগান তো দূরের কথা আমাদের কেউই এর আগে কমলা গাছ পর্যন্ত দেখনি। কমলা কিভাবে পাড়তে হয় তা-ও জানি না। আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে অথবা গাছের ডাল বাঁকা করে  কমলা পাড়লাম। পাড়তে পাড়তে খেলাম।
একসময় মনে হলে এইসব কমলা নেবো কীভাবে! কেউ একজন দ্রুত হাতে তার জামা খুলল, গায়ের স্যাণ্ডো গেঞ্জিটার বটমটা একটা বুনো লতা দিয়ে বাঁধল।  কাঁধের ফিতা ধরে আমাদেরকে তার নতুন শিল্পকৌশল দেখাল। আমরা তার আবিস্কার দ্রুত হাতে কপি করলাম। কমলাগুলো নতুন আবিস্কৃত ব্যাগে ঢুকিয়ে হালকা মেজাজে আড্ডা দিতে দিতে কমলার খোসা ছাড়াচ্ছি, ঠিক তখনই কোথা থেকে হঠাৎ করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো অল্পবয়সী চারটা ছেলে।
    ওরা বলল,তোমরা বাংলাদেশের?
    বললাম, হাঁ।
    ওরা বলল, এটা ইণ্ডিয়া।
    ওরা পাহাড়ের রাস্তার দিকে আঙুল তুলে দেখাল, বলল, ওই যে দ্যাখো, বিএসএফ টহলে
    নেমেছে। তোমরা পালাও।
    ওরা আমাদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিল। দেখতে খর্বাকৃতি। বলল, তারা খাসিয়া। ক্লাস
    এইটে পড়ে।
    একটা ছেলে বলে উঠল, তোমরা বাগান থেকে কমলা পেড়েছ?  এটা ফেয়ার না।
    আমরা সত্যি ভয় পেলাম। বললাম, তাহলে এগুলো রেখে দাও। আমরা তো ভাবিনি, এটা
    আরেকটা দেশ।
    কী যেন ভাবল ছেলেটি। বলল, না নিয়ে যাও। কিন্তু এখনই পালাও। বর্ডার সিকিউরিটি
    দেখলে  তোমাদের ধরে নিয়ে যাবে।
    আমরা ওদের ধন্যবাদ দিলাম। ভয়ের পাশাপাশি লজ্জাও আমাদের ঘিরে ধরেছে। আমরা
    আমাদের কমলাগুলো মাটিতে ঢেলে দিলাম।
    ছেলেগুলো খুব অবাক হলো। আমরা বললাম, আমরা জানতাম না,এটা তোমাদের দেশ।
    ওরা খুব জোর করল, কিন্তু আমরা কমলা আনলাম না। ওরা আমাদের ছড়ার পথ ধরে
    আরেকটু উজানে নিয়ে এলো। এখানে পাহাড় আছে, ছড়াটা বেঁকে গেছে ডানে।
    ওরা বলল,এই পাহাড়টা তোমাদের। পাহাড়ের গা ঘেঁষেই সেই নদী। ওরা বলল, এইবার নদী
    পার হয়ে যাও।
    তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা নদী পার হয়ে এলাম। এখানে নদী পার হওয়া সহজ।
    এখানকার পাথরগুলো বড় বড়।
নদী পার হয়ে এলাম সত্যি, কিন্তু আমাদের ভেতরের কম্পন তখনো শেষ হয়নি। আমরা একটা বড় পাথরের উপর কিছুক্ষণ শুয়ে-বসে কাটালাম। তাতে  লাভ হলো একটা, ধীরে ধীরে আমাদের মনের ভয় অথবা অস্বস্তি কেটে গেল।
আমরা যেখানে বসেছিলাম,সেটা বেশ খোলামেলা জায়গা। ছেলেগুলো বলেছে, সামনের পাহাড়টা আমাদের। এটা পাহাড় কোথায়, উঁচু টিলা! মনে মনে দুঃখ হলো, আমাদের কোনো উঁচু পাহাড় নেই, পাহাড়ের ভেতর খাঁজকাটা রাস্তা নেই। কমলার বাগান নেই, থাকলে কী আর এভাবে অপমান হতে হতো!
বললাম, সবাই শোনো, ফিরে গিয়ে কিন্তু কেউ কমলা পাড়ার কথা কাউকে বোলো না।
একসঙ্গেই সবাই বলল,পাগল! মাথা খারাপ!
সত্যি এই আন্তর্জাতিক চুরির কথা আমরা কাউকে কোনোদিন বলিনি।
ঘড়ি দেখে চমকে উঠলাম। তিনটা বেজে গেছে। সূর্য হেলে আছে, বুঝলাম সেটা পশ্চিম।  আমাদের পশ্চিম চেনার দরকার নেই, আমাদের ফিরতে হবে। কিন্তু আমরা মাইকের আওয়াজ পাই না।
আমরা বিজন বনে হারিয়ে গেছি সত্যি, কিন্তু আমাদের ‘সেন্স অব ইন্টেলিজেন্সিয়া’ এখনো হারায়নি। আমরা ভাটির পথ ধরে নদীর জলতরঙ্গের মিষ্টি শব্দ শুনতে শুনতে  হাঁটতে থাকি। একসময় মাইকে গানের শব্দ শুনতে পাই,জলতরঙ্গের শব্দ মাইকের শব্দের মধ্যে হারিয়ে যায়।
বড়ভাইদের বকা শুনতে হল। আমাদের জন্য সবাই দুশ্চিন্তা করছিল। আজির ভাই তখনো না খেয়ে অপেক্ষায় বসে আছেন।
পিকনিকও শেষ হলো। ক্লাস না থাকায় আমরা কিছুটা বোর হয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের অলিখিত ছুটি চলছে। আসাদ-বাবুলরা বলল, চল বাসায় যাই। বাসা মানে ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানা। আগেও আমরা সপ্তাহান্তে প্রায়ই চলে যেতাম।বৃহস্পতিবার বিকেলের ট্রেন ধরে চলে যেতাম, ফিরে আসতাম শনিবার সকালের ট্রেনে। মাঝেমধ্যে লম্বা ছুটি পাওয়া যায়। তখন ঢাকা, সিলেট, হবিগঞ্জ যে যেখানে আছে, সবাই আসে।
 আমরা তখন দলবেঁধে ঘুরে বেড়াই বিআইডিসির গল্পভরা রাস্তাগুলোয়, অলিগলি চেনা পথে,কখনো চলে যাই ইন্দানগর চা বাগান, মনিপুর  চা বাগান অথবা জেটিঘাটের রাস্তা ধরে। এই সব পথের প্রতিটি ধূলিকণা, পথের পাশের গুল্মলতা তা যতই তুচ্ছ হোক, সবই যে  আমাদের চির আপন।
এরকমই একদিন অনির্দিষ্ট হাঁটার তালিকায় পথ পেল পুরাণ বাজার। আম বাগান কলোনিকে ডানে রেখে হাঁটছি, মোড় ঘুরলাম হাতের বাঁয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতাল রেখে, তখনই চোখে পড়ল স্কুলফেরা মেয়েদের দলটাকে। তারাও আমাদের এনজিএফএফের মেয়ে, এখানকার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিকট স্বজন।
তাকে আমার সেই প্রথম দেখা, সে-ও অনেকদিন আগে। এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। অজানা অদ্ভুত শিহরণ বুকে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে  চলে গেলাম ফরিদপুর গ্রামে, আমাদের সহপাঠী তারা মিয়ার বাড়ি। ক্লাস নাইনের বছর সে নাম পরিবর্তন করে সুলতান আহমেদ হয়েছে। আমরা তারা মিয়াই ডাকি।
 আমাদের দেখে তারা মিয়া অবাক হলো। আমরা এর আগেও বহুবার তার বাড়ি গেছি,গ্রীষ্ম-বর্ষায়। তাদের পুকুর পাড় জুড়ে অনেক পুরনো কাঁঠাল গাছ। গাছের গায়ে কালো শেওলার আস্তর। পরগাছার ঝুরি ডালের গাঁটে গাঁটে। ময়না পাখিরা বাসা বাঁধে সেখানে। তারা মিয়া বলে,মাঝে মধ্যে সাপ ওঠে পাখির খোঁজে। তারাদের গাছের একেকটা কাঁঠালের ওজনের এত বেশি যে আমাদের আগলে তুলতে কষ্ট হতো। একেকটা কোয়া এত বড় যে আমরা দুই হাতের তালুতে তুলে নিতাম। আর কী তার উজ্জ্বল-হলুদ রঙ, কী তার স্বাদ!
আমাদের বন্ধু তারা মিয়ার কথা একটু বলে নেই। সে আমাদের  চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়ই ছিল। ছাত্রও ভালো ছিল। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর সে আর পড়াশোনা করল না। সিভিল অ্যাভিয়েশনে চাকরি নিয়ে ঢাকায় গেল।সেখানে দুই বছর চাকরি করল তারপর গেল সৌদি আরব। সেখানে দু-তিন বছর চাকরি করল।  হঠাৎ মনে হলো বুকের খাঁচায় ব্যথা। ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, পারো তো তুমি আজই বাড়ি ফিরে যাও। হৃষ্টপুষ্ট একটি ছেলে, কিভাবে মেনে নেবে ডাক্তারের এই চরমপত্র! তার চিন্তা করারও অবকাশ হলো না। দুই দিন পরেই ঘটল ঘটনাটা। হার্ট অ্যাটাক। তাৎক্ষণিক মৃত্যু, হাঁ এটা আমাদের সবার জন্যই ছিল মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদ। আমাদের বন্ধু তারা মিয়া অতি অল্প বয়সে, অকালে, আমাদের সবাইকে পেছনে ফেলে আকাশের তারা হয়ে গেল।
সেদিন সারা বিকেল-সন্ধ্যা আমরা বন্ধুরা তারা মিয়ার বাড়ি মাতিয়ে রাখলাম। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে তার সুন্দর  মুখ আর তার চোখ দুটো আমার মনে পড়ে। আমি আনমনা হয়ে যাই। এবং সেই দিন থেকে  আমার জীবন বদলে যেতে থাকে। কিন্তু তাকে আমি চিনি না, মাঝে মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জ যাই, স্কুলের পথে একা একা দাঁড়াই,তাকে দেখতে পাই না।
সৈয়দ মুজিবের প্রেম আছে, সুলু। আমাকে বলেছে। একদিন আমি বললাম, ওসব বাদ। নাম তার সুইট সিক্সটিন, ষোলো। সুইট সিক্সটিনকে আমি দেখিনি। আমরা দুজনে মিলে সুইট সিক্সটিনকে দূর বিজনে বসে রঙ আর কথার খেলায় রাঙিয়ে রাখি। কিন্তু আমি সুন্দর মেয়েটির কথা মুজিবকে বলতে পারি না। আমার মন পড়ে থাকে পুরাণ বাজারের রাস্তায়, একজোড়া স্নিগ্ধ-নিবিড় চোখের মায়ায়।
আসাদ-বাবুল যখন বলল,চল বাসায় যাই, অমনি বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন টের পেলাম। সুন্দর মেয়েটির দেখা পাবো তো!
 -বললাম,যাবো
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com