1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ০১:৩০ অপরাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (৯ম পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: শনিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৮৩ দেখেছেন
এভাবেই আমি পরিচিত হয়ে উঠলাম সিলেটের সাহিত্য-সংষ্কৃতি কর্মীদের সঙ্গে। সেখানকার সাপ্তাহিক ও সাময়িকীগুলোর লেখক হয়ে উঠলাম।
সেই বিকেলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল। ইচ্ছে করেই সবার শেষে স্কুল থেকে বের হয়েছিল সে। সঙ্গে ছিল শিবানী। তার ক্লাসমেট। তাকে পটিয়েছে, বুকে জড়িয়ে বন্ধু বানিয়েছে। শিবানী আসে ইন্দানগর চা বাগান থেকে ৷
      আমি একাই গিয়েছিলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলল,তোমাকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। আর তোমাকে কে না চেনে?
           আমি বললাম, কখনো তো বলোনি।
           সে বলল,তুমি তো বলেছ।
            কখন বললাম?
            সেই যে স্কুল থেকে ফেরার পথে।
            কিছু বলিনি তো।
            বলেছ। তুমি চোখে চোখে বলেছ। চোখ দিয়ে বলেছ।
           সে আমার চোখে চোখ রাখল। বিকেলের ছায়াচ্ছন্ন আলো তার ফরশা মুখের উপর  ‘নীল জোছনার আলো’  ছড়িয়ে দিল। আমি বিস্ময়-বিমুগ্ধ হয়ে তাকে দেখি। সে বলল, এবং সেদিন থেকে আমি তোমার অপেক্ষায় আছি।
 পরদিন আমি ফিরে এলাম হোস্টেলে। কিন্তু রেখে এলাম নিজেকে। আমার মন পড়ে থাকে সেখানে। জীবন যেন এক স্বপ্নের মায়াজালে হারিয়ে যেতে থাকে। জগতের সবকিছুকে ভালো লাগতে থাকে, প্রকৃতি যেন নানা রঙরূপে সেজে থাকে চোখের সামনে। জোরে জোরে  কবিতার পঙক্তি আবৃত্তি করি,  গান করি উচ্চস্বরে। হাঁক-ডাক করে কথা বলি সবার সঙ্গে। অন্যরা আমার এই পরিবর্তনকে হয়তো ধরতে পারে না, কিন্তু সৈয়দ মুজিব একদিন বলে বসল, মনে রঙ লাগছে তুমার। ইফ আই এম নট রং,দেন টেল মি হু ইজ সি?
        বাণী চিরন্তনী’র পাতায় কোনো মহাজনের উক্তি আছে, ধোঁয়া আর প্রেমকে লুকিয়ে রাখা যায় না। একবার ধোঁয়া লুকিয়ে রাখতে পারিনি টেবিলের ড্রয়ারে, আর এবার প্রেমকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না। একদিন আনমনে গাইছিলাম, ‘ কী নামে ডেকে বলব তোমাকে / মন্দ করেছ আমাকে ওই দুটি চোখে / আমি তো মাতাল হাওয়ারই মতো হয়ে/ পায়ে পায়ে গেছি জড়িয়ে /  কী করি ভেবে মরি বলবে কী লোকে। ‘  মুজিব গলা জড়িয়ে ধরে বলল, কে সে যুগীর মন রাঙায়ে দিল?
        মুজিবের বলার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে ওকে না বলে পারলাম না। শুনে মুজিব রবীন্দ্রনাথের গান থেকে দু’লাইন আবৃত্তি করল-
        ‘ এ তো খেলা নয়, খেলা নয়-এ যে হৃদয়দহনজ্বালা সখী/ এ যে প্রাণভরা ব্যাকুলতা,গোপন মর্মের ব্যথা’।
        মুজিবের  সুবিধে হয়ে গেল, সুইট সিক্সটিনের সঙ্গে আর একজনকে আসরে যোগ করল। আর আমার হলো পরিবর্তন, একটা খোলসের ভেতর আমি শান্ত হয়ে বসলাম। আমার ভাবনাগুলো হয়ে ওঠে অন্তর্গত; কবিতার হৃদয়দহনজ্বালা, প্রাণভরা ব্যাকুলতা আর গোপন মর্মের ব্যথা।
        বি আই ডি সি থেকে ফিরেই আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসলাম। নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ থাকতে চাইলাম না। জীবনে কোনোদিন খবরের কাগজের জন্য সংবাদ লিখিনি,সে-ই আমিই বসে গেলাম সংবাদ লিখতে। পাতার পর পাতা লিখছি তো লিখছিই,শেষ হতে চায় না।আট পাতা লিখার পর আমার মন ভরল।মনে হলো পিপিএম স্কুলের সব সমস্যার কথা আমি তুলে ধরতে পেরেছি। ওটা আর সংবাদ থাকলো না,হয়ে গেল ফিচার। আমি একটা শিরোনাম দিলাম, ‘বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত পিপিএম উচ্চ বিদ্যালয়’।
        দু-চারটা পুরনো গণকন্ঠ আমার টেবিলেই আছে। সেখান থেকে ঠিকানা নিলাম। একটা খামে ভরে ফিচারটা পাঠালাম। কিন্তু এমনটা ভেবেও পাঠাইনি,ওটা ছাপা হবে। আমি তো ওদের কেউ না,যাদেরটা ছাপা হয়, তারা তাদের ‘সংবাদদাতা’ অথবা ‘নিজস্ব সংবাদাতা’। পত্রিকার খবর পড়তে পড়তে আমার এসব জানা হয়েছে।
        কিন্তু এক অপ্রত্যাশিত সংবাদ অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। পরের শুক্রবার ফারুক ভাই গণকণ্ঠ পত্রিকা হাতে আমার রুমে এলেন। পত্রিকাটা আমার চোখের সামনে মেলে ধরলেন।
        আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি না। পত্রিকার অর্ধপৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয়েছে পিপিএম স্কুলের  সমস্যাজর্জর কাহিনি। আমার দেওয়া শিরোনামও হুবহু এক আছে। জীবনে প্রথম ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখলাম।
        ফারুক ভাই বললেন, আমি কনফিউজড্ ছিলাম,এটা তুমি কী না! তোমার প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারছি, এটা তুমি। ভালো লিখেছ।
        পরদিন আমার কলেজ খোলা। তারপরও আমি বিকেলের ট্রেনে চলে গেলাম বিআইডিসি। যাবার সময় বন্দর বাজার থেকে কয়েকটা গণকন্ঠ কিনে নিলাম।
        আজ আর আমার কোনো ভয় নেই, সংশয় নেই। একটু পরিপাটি পোশাকেই গেলাম। এমন সময় করে গেলাম,যখন লেজার পিরিয়ডের ঘন্টা বাজে। হেড মাস্টার সাহেবের পরের রুমটা টিচার্স কমনরুম,তার পরেরটা মেয়েদের কমনরুম। আমি যখন হেড মাস্টার সাহেবের রুমের সামনে দাঁড়ালাম,তখন সে এলো কমনরুমের সামনে। আমাদের চোখ মনের কথা বলল। আর তখনই ভেতর থেকে বের হয়েএলেন হেডমাস্টার সাহেব। আমাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলেন, বললেন, আমরা কালই দেখেছি। অনেক ধন্যবাদ।
 আমি হাতের কাগজগুলো তাকে বাড়িয়ে ধরলাম। তিনি কাগজগুলো হাতে নিলেন। টিচার্স কমনরুমের সামনে দাঁড়িয়ে  দুজন টিচারকে ডাকলেন। তারা এলে হেডমাস্টার সাহেব আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
        গতকাল আমাদের স্কুলের যে স্টোরি ছাপা হয়েছে, সেটা উনার লেখা। তারা আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। আমি আড়চোখে দেখি,আরও কয়েকজনের সঙ্গে সে-ও দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
        আমরা এরপর সবাই হেডমাস্টার সাহেবের রুমে গেলাম। চা খেলাম,কিছু সময় গল্প করলাম। যখন বের হয়ে এলাম,তখন কমনরুমের জটলা নেই।
        কয়েকদিন পরের কথা। আমাদের বাসার ঠিকানায় একটা চিঠি এলো। আমি যখন পিপিএমের প্রতিবেদন পাঠাই তখন আমাদের বাসার ঠিকানা দিয়েছিলাম। চিঠির খাম সাদা, উপরে গণকন্ঠের লোগো ছাপা। চিঠি পড়ে আমি অবাক। আমাকে দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। আমাকে তারা সংবাদদাতা নিয়োগ করতে চায়।
        তখনই ছুটলাম মাসুক ভাইয়ের স্টুডিওতে। মাসুক ভাইয়ের পুরো নাম মাসুকুর রব চৌধুরী। স্টুডিওর নাম,রব ফটো স্টুডিও, বিআইডিসির একমাত্র স্টুডিও। ফরশা, হাসিখুশি ভদ্রলোক, এক পায়ে সমস্যা, তাই খুঁড়িয়ে হাটেন। আমাদের সঙ্গে তারও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তার স্টুডিওতেও আমরা দলবেঁধে আড্ডা দেই।
        দিনে দিনে ছবি তুলে দিলেন মাসুক ভাই। পরদিন সেটা ডাকে পাঠিয়ে দিলাম।  পরের সপ্তাহে পেলাম একটা সাংবাদিকের আইডি কার্ড। আমাকে ‘ফেঞ্চুগঞ্জস্থ সংবাদদাতা’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাক্ষর করেছেন কাজী আরেফ আহমেদ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক।
        সাংবাদিক হিসেবে আমার অভিষেক হলো। ছাপার অক্ষরে আমার নাম ছাপা হলো।  এই আনন্দ, এই অনুভূতি অপ্রার্থিব। মনে মনে ‘নীল জোছনার আলো’কে ধন্যবাদ জানালাম। সে-ই এখানে অনুঘটক, আমি নিমিত্ত মাত্র।
     পড়ালেখার চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি  পাল্লা দিয়ে ছোটে তার জন্য একান্ত ভাবনা। বইয়ের পাতাজুড়ে ভেসে থাকে তার মিষ্টি মুখটা। একদিন সারাদিন ঝরল বৃষ্টির ধারা,আমরা কলেজে যেতে পারলাম না। কাজেই অকারণ আড্ডা আর গুলতানি চলে দুপুর অব্দি। দুপুরে সাতকরার লিল্লা আর খাসির মাংশে ভুরিভোজ হলো। টিনের চালে বৃষ্টির ধারাপাত,মন্দ্র আবেশে চোখের পাতা বুঁজে আসে। ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। কেবল ঘুমোতে পারি না আমি। আমি এক নতুন সত্তার জাগরণ অনুভব করি। জলোচ্ছ্বাসের পর যেভাবে আমার হৃদয় মথিত হয়ছিল এক তীব্র ভাবাবেগে, তেমনি আজ বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ আমার ভেতর এক অদ্ভুত ঘোর তৈরি করে। আমার কলম ছোটে প্রাণের উচ্ছ্বাস আর বেদনার ভাষাকে বহন করে। দিনের আলো ফুরিয়ে যায়, রাতের আঁধার ঘুচিয়ে আলো জ্বলে ওঠে,আর আমার নিবিষ্ট মন একটি গল্পভূবন নিয়ে জেগে থাকে।
     ‘যুগভেরী’ সিলেট থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের  প্রাচীনতম সাপ্তাহিক  পত্রিকা। হোস্টেলে কেউ কেউ যুগভেরী রাখেন। আমরা মাঝেমধ্যে পড়ি। সমকালীন  লেখকদের লেখায় সমৃদ্ধ থাকে সাহিত্যপাতা। আমি গল্পটা পাঠিয়ে দিলাম যুগভেরীর ঠিকানায়। এক সপ্তাহ পর গল্পটি ছাপা হয়। আমার লেখা প্রথম গল্প,আজ আর নামটি মনে নেই, ‘বিভ্রান্ত অনুভব ‘ অথবা ‘বিপন্ন ভাবনা’- এরকম কিছু নাম হবে। উত্তম পুরুষে লেখা, কেবল তারই বন্দনা,স্বপ্ন-কল্পনায় ভরা প্রতিটি শব্দ,বাক্য। যুগভেরীর কপিটি অনেকদিন যত্ন করে রেখেছিলাম,একদিন  কোথায় যে হারিয়ে গেল। এটা আমার ভাগ্যও বটে, আমার যত্নে রাখা জিনিসগুলো কেন যেন হারিয়ে  যায়।
     যুগভেরীর গল্পের কথা চাপা থাকে না।কীভাবে যেন আমার বন্ধুদের কাছে চলে যায়। কেউ কেউ আমার কাছে নাম জানতে চায়, আমি বলি, এ কেবলই কল্পনা।

যুগভেরী সিলেট থেকে প্রকাশিত দেশের প্রাচীন সাপ্তাহিক পত্রিকা

    তখনই একদিন,শুক্রবারের ভোরবেলা, সালেহ হোস্টেলে হাজির। বলল,চল,কুরুয়া চল।
     কুরুয়া ওদের গ্রামের বাড়ি। বালাগঞ্জ যেতে পথে পড়ে। বাড়িতে মা একা থাকেন। বোনদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইয়েরা সবাই চাকরিজীবি। বড় ভাই ঢাকায়,মেজো ভাই হবিগঞ্জ থাকেন। সে-ও হবিগঞ্জ থাকে মেজো ভাইয়ের বাসায়।
     মা-কে দেখার জন্য যাচ্ছে সালেহ। আমাকে সঙ্গে নেবে, সেজন্যই তার এপর্যন্ত আসা। তো খুশি মনেই চললাম তার সঙ্গে। সারা পথ তেমন কোনো কথা হলো না। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে শানবাঁধানো পুকুরঘাটের হেলান দেয়া চেয়ারে বসে চেপে ধরল, তুই আমার লগে মিছা মাতলে খেনে?
     আমি?
     জি অয়।
     খ্যাপা কন্ঠ। বলল,হেদিন তরে জিগাইছলাম, ফুড়ি অওগুর খতা। তুই খইলে চিনস না। তুই আমার লগে মিছা মাতলে! এখন দ্যাখ,সত্য আফনে আফনে বারঅইয়া আইছে।
     সালেহ চৌধুরীর খেপে যাওয়ার কারণ আমি বুঝলাম। তারও যুগভেরী পড়া হয়ে গেছে।
     যুগভেরীর গল্প অনেকেই পড়েছে। কেউ বলেছে, সুন্দর হয়েছে, কেউ বলেছে,কী লিখেছ,আগামাথা নাই!
     বিয়াল্লিশ বছরের সমৃদ্ধ একটি পত্রিকা,সেদিন কেন এই গল্পটি ছাপল,আমি আজো ভেবে পাই না। আমার এখন মনে হয়,আদৌ ওটা কি গল্প হয়েছে? গল্প হোক বা না-হোক, আমার প্রথম গল্পটি ছেপেছে যুগভেরী। গল্পকার হিসেবে প্রথম নামটি ছেপেছে যুগভেরী। আমার গল্পকার হবার নেপথ্যের মানুষ এক স্কুল-বালিকা, যাকে আমি ভালোবাসি।
হোস্টেলের সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করে। আমিও করি। তবে আমার নতুন রোগে পেয়েছে। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার প্রলোভন। আমাকে ফেঞ্চুগঞ্জের সংবাদদাতা নিয়োগ করা হলেও আমি তেমন কিছু মানতাম না। চোখের সামনে কোনো ঘটনা দেখলেই সেটা লিখে পাঠিয়ে দিই। ছাপাও হয়। নাম থাকে না,’সংবাদদাতা’ লেখা হয়। যুগভেরীর গল্প ছাপা হবার পর কীভাবে যেন আমার সঙ্গে কয়েকজন কবি-লেখকের  পরিচয় হয়ে গেল। একদিন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আহমদ আল কবীর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা।
     বললেন, তোমার গল্প দেখলাম যুগভেরীতে।
     আমি লাজুক হাসি।
     কবীর ভাই বললেন, আমাদের একটা ম্যাগাজিন বের হয়। দীপশিখা নাম।আমি বকুলকে বলে দেব তোমার গল্প নেওয়াার জন্য।
   বাহার উজ জামান বকুল পরদিন আমার রুমে এলো। দীপশিখা’র সম্পাদক সে। আমার সঙ্গেই সে পড়ে।
আমি গল্প লিখলাম। নাম ‘কুলি মেয়ে’। দুই কুলি মেয়ে,চা বাগানের মেয়ে তারা। নাম কৃষ্ণা ও তৃষ্ণা। বড় বোন কৃষ্ণার ভালোবাসার পুরুষকে কৌশলে আপন করে নেয় তৃষ্ণা। দুঃখ ও হতাশায় অন্ধকার অমাবস্যায় কৃষ্ণার হারিয়ে  যাওয়ার গল্প এটি। গল্পে পাত্রপাত্রী তাদের নিজস্ব সংলাপে কথা বলে।তখনকার আবেগ ছিল ছেলেমানুষী, গল্পের ভাষা ছিল কাঁচা, পরবর্তী কালে আমি কখনো গল্পটিকে গ্রন্থভূক্ত করিনি।
একদিন এলেন কবি খলিলুর রহমান কাসেমী। আমাদের কলেজের ছাত্র নন। তিনি ‘সমীকরণ’ নামে একটা ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। আমার কাছে গল্প চাইলেন। তারও সূত্র যুগভেরীর গল্প।তার সমীকরণ পত্রিকায় পরবর্তী সময়ে আমি অনেক গল্প লিখেছি।  কাসেমী ভাই আমাকে সিলেটের অনেক লেখকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।  জিন্দাবাজারে আকছার বকসের ছোটো একটা প্রেস। নাম ছাপাঘর। সিলেটের সব তরুণ লেখকের আড্ডা সেখানে। আকছার বকস নিজেও ‘আবির্ভাব’ নামে একটা ছোটো পত্রিকা বের করেন। কাসেমী ভাই নিয়ে গেলেন সেখানে।  সেখানেই পরিচয় হয় সিলেটের তৎকালীন কয়েকজন কবি,ছড়াকার, গীতিকার, গল্পকার,লিটলম্যাগ সম্পাদকের সঙ্গে। ধীরে ধীরে পরিচয়ের গণ্ডি বাড়তে থাকে। রাগিব হাসান, নৃপেন্দ্র লাল দাস,কুমার দিলীপ কর,লায়লা ইউসুফ, মহির উদ্দিন আহমদ শীরু,তুষার কর,মুকুল আশরাফ, আবদুল বাসিত,শামসুল করিম কয়েস,বিদ্যুৎ কর,বুদ্ধদেব চৌধুরী, ভীষ্মদেব চৌধুরী, মানিক লাল, লুৎফুন্নেসা লিলি,শামসুদ্দিন হারুন,গোবিন্দ পাল,মহিবুল হক তুলা, অতুলরঞ্জন দেব, কিশোয়ার ইবনে দিলওয়ার, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, ভবতোষ চৌধুরী, ফয়জুর রহমান, শাখী দাশ পুরকায়স্থ, শেখর ভট্টাচার্যসহ অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারা কবিতা ও ছড়া লিখতেন, তবে তারা পারদর্শী ছিলেন ছড়া ও লিমেরিক রচনায়।
    কয়েকজন গীতিকারের সঙ্গেও পরিচয় হয়। এদের মধ্যে মিহির দাস,অজয় পাল,সুনির্মল কুমার দেব মীন রয়েছেন। অজয় পাল সাংবাদিকতাও করেন,কবিও। সুনির্মল কুমার দেব মীন গল্পও লিখেন। কুমার দিলীপ কর বিভিন্ন সংকলন ও সাময়িকীর প্রচ্ছদ আঁকতেন।
    গল্প লেখকদের মধ্যে আরো আছেন জামান মাহবুব, আবদুল বাসিত,আবদুল হামিদ মোহাম্মদ, ইশতাকুল হোসেন,  আহমদ হোসেন মারুফ, গিয়াসউদ্দিন আউয়াল ।
      মহির উদ্দিন শীরু কবি,সাংবাদিক। ‘গ্রাম সুরমা’ নামে একটা পত্রিকার সম্পাদক।  তার অফিস তালতলায়। শীরু ভাই একদিন তার অফিসে নিয়ে গেলেন।  তিনি ‘শাপলা’ নামে একটা একটা সাহিত্য ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতেন।
    সেখানেও সিলেটের কয়েকজন সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয়। সিরাজুল ইসলাম মোসাহিদ,আবদুর রহমান বদরী,আবদুল মালিক রুনু, আবদুল মুনিম ইরা সহ কয়েকজনের সঙ্গে।
    ঠিক মনে নেই,কোথায় যেন একদিন পরিচয় হয় নিজামুদ্দিন লস্কর ময়না ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সিলেটের বিশিষ্ট নাট্যকর্মী। পরবর্তীতে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত পান।
     কবি রাগিব হাসান সম্পাদনা করতেন জাগরণ। গিয়াস উদ্দিন আউয়াল ‘জন্মেসুখ’, বয়োকনিষ্ঠ ছড়াকার সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী সম্পাদনা করতেন ‘জীবন মিছিল’ নামে একটা ম্যাগাজিন। ওই সময়ে প্রকাশিত লিটলম্যাগের মধ্যে আমার কাছে ওটাকেই ছিমছাম সুন্দর লিটলম্যাগ মনে হতো। একটা সংখ্যায় আমি কবিতা লিখলাম, ‘নির্জনতায়ঃ নতুন পৃথিবীর সংলাপ’।  অনিয়মিতভাবে হলেও এই ম্যাগাজিনটি প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রকাশিত হয়।
    এভাবেই আমি পরিচিত হয়ে উঠলাম সিলেটের সাহিত্য-সংষ্কৃতি কর্মীদের সঙ্গে। সেখানকার সাপ্তাহিক ও সাময়িকীগুলোর লেখক হয়ে উঠলাম।
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন