1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ০২:৫২ অপরাহ্ন

কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঠাটারী: মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২২
  • ২৮ দেখেছেন
আধুনিকতার ছোঁয়া আর আরাম প্রিয় মানুষদের ভিড়ে আজ ঠাটারী কারিগরদের পেশা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।

বাংলার ইতিহাসে নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন চারু ও কারুশিল্প। বগুড়ার মহাস্থান গড় কুমিল্লার ময়নামতি এবং ২০০১ সাল থেকে নরসিংদি জেলার ওয়ারি বটেশ্বরীর খনন কার্য এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫০০ অব্দ থেকে জনপদের প্রাচীন বঙ্গের অধিবাসীগণ মৃৎশিল্প, লৌহনির্মিত হাতিয়ার, কাঠের তৈরি বস্ত্তসামগ্রী, নানা প্রকার কৃষিসামগ্রী, ধর্মীয় ও গৃহকার্যের সামগ্রী প্রস্ত্তত করত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো ধরণের সংস্কৃতির পরীক্ষা নিরীক্ষায় জনসাধারণের তৈরিকৃত চারু ও কারুশিল্পের মূল বিষয়। জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান, তাদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ এবং সামাজিক মূল্যবোধের মূল মানদন্ড হচ্ছে হস্তশিল্প সামগ্রী।

প্রযুক্তির প্রসারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই। নতুন প্রজন্ম ঝুঁকে পড়ছে যন্ত্রসভ্যতার সংস্কৃতির দিকে। ফলে ক্রমাগতভাবেই বিলীন হতে চলেছে প্রকৃতির সেই পুরাতন সংস্কৃতি।

সময় আসে, সময়  চলে যায়। এই সময়ের মাঝে হারিয়ে যায় অনেক কিছুই। সেই পথ পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়া থেকে বাদ পড়েনি কাঁসারু বা ঠাটারী কারিগরদের পেশা। আধুনিকতার ছোঁয়া আর আরাম প্রিয় মানুষদের ভিড়ে আজ ঠাটারী কারিগরদের পেশা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। নানা প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে একসময়ের গৃহস্থালী পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য মেরামতের সাথে জড়িত নিপুণ কারিগর ঠাটারী পেশা।

কাঁসার তৈরী তৈজসপত্র বা গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী তৈরী করে তারা কাঁসারু বলে পরিচিত। এই সম্প্রদায়ের লোকজনকে ঠাটারি নামেও ডাকা হয়। কাঁসারুদের তৈরী প্রধান দ্রব্যসামগ্রীগুলো হল, কাঁসা বা পিতলের হাড়ি. কলসি, বাটি, চামচ, ফুলদানি, আতরদানি, চিলমচি, গরদানি, ঘটি ইত্যাদি। প্রাচীনকালে কাঁসা পিতলের দ্রবসামগ্রীতে বিভিন্ন কারুকার্য ও নকশায় লোকজ কাহিনী অঙ্কনরীতি দেখা যেত। অতীতে বাংলাদেশের ধামরাই, জামালপুর, নবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ এই সমস্ত দ্রব্য তৈরিতে প্রসিদ্ধ ছিল। বিয়ে এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে কাঁসার তৈরী জিনিস উপহার দেবার প্রচলন ছিল। ইরান,পাকিস্তান সহ বহু দেশে কাঁসার তৈরী জিনিসের কদর আছে।

বাংলার চন্দ্র বংশীয় রাজবংশের শাসনামল থেকে পদ্মা-কীর্তিনাশার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কাঁসা-পিতল শিল্প। বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার পালং, বাঘিয়া, বিলাসখান, কাঁসাভোগ, মধ্যপাড়া, আংগারিয়া ও কোটাপাড়া এলাকায় কাঁসারু বা কংসবণিকদের বসবাস ছিল। আর এ সকল এলাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁসা-পিতল তৈরীর কারখানার অস্তিত্ব ছিল। ভারত, নেপাল, বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) প্রভৃতি দেশ থেকে বিদেশী বনিকারও এসব দ্রব্য সামগ্রী কিনতে আসত । ধারণা করা হয় কাঁসারুরা হিন্দু ধর্মালম্বি স্বর্ণকার সম্প্রদায় থেকে এসেছে। কেউ কেউ তাদের কামারদের উপসম্প্রদায় হিসাবেও মনে করেন। কাঁসারুদের মধ্যে বাল্যবিবাহ প্রচলিত। জাতপাতের বিচারে কাঁসারুদের অবস্থান অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের চাইতে উঁচুতে। হস্তশিল্পে নিয়োজিত অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো তারা বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন।

একটা সময় মানুষের গৃহস্থবাড়ির নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন- হারিকেন, ল্যাম্প( কুপি),বালতি, ড্রাম, তামার তৈরি স্প্রে মেশিন সহ নানা রকমের পণ্য সামগ্রী মেরামতের কাজ ছিল প্রচুর। সময়ের পথ-পরিক্রমায় মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তনের সাথে সাথে মূলত প্লাস্টিকের ব্যবহার এসেই এ পেশায় ধস নেমেছে। আগে বাড়িতেই গৃহস্থালী ব্যবহারের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারজাত করা হত। তখন বাজারে এসব পণ্যের কদরও ছিল অনেক বেশি। এখন কোন কদর না থাকায় ঠাটারী শিল্পের সাথে জড়িত লোকজনও এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছে। মানুষ এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে প্লাস্টিকের পণ্য সামগ্রীর উপর। আর এ শিল্প বাঁচাতে হলে দরকার আধুনিকায়নের।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাঁসার দ্রব্যাদির প্রচলন এখনও আছে। ধামরাইয়ের ভাকুর্তা গ্রামের ছোট ছোট কারখানায় কাঁসা ও পিতলের গহনা তৈরী হয়। ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের বহুল প্রচলন ও কম মূল্যের কারণে কাঁসার তৈরী দ্রব্যাদির ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়ছে।

নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র একটি ‘ঠাটারি’ (তৈজসপত্র মেরামতকারী) পেশা। এক সময় কামার শিল্পের আদলে গড়ে উঠা গৃহস্থালি নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র মেরামতের ঠাটারি কারিগরদের কদর ছিল ব্যাপক। এসব কারিগর গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে  রাস্তার মোড়ে বসে ভাতির হাওয়ায় আর টুংটাং শব্দে মেরামত করত গৃহস্থালি পরিবারের ব্যবহার্য পুরনো হাড়ি, পাতিল, বালতি, জগ। এ পেশায় সম্পৃক্ত থেকে অনেকে সংসারও চালাত। এখন পুরনো তৈজসপত্র মেরামতের কারিগররদের অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

এক সময় মানুষ টিনের প্লেট, পাতিল, হারিকেন, বাতিসহ কতকিছুই জোড়াতালি দিয়ে চালাতেন। টিনের প্লেট ‘ফুটা’ (ছিদ্র) হলে মানুষ সেসব মেরামত করিয়ে নিতেন। অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল, জগ বা টিনের বালতি নষ্ট হলে মেরামত করে নিতেন। হরেক রকম বালতি, সিসা সবই থাকত ঠাটারি শিল্পীদের কাছে। হাতুড়িসহ কিছু ভাঙা বালতি নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতো তারা। এখন সংসারের জিনিসপত্র বদলে গেছে। ফলে ঠাঁটারি শিল্পীদের প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে না। করলেও হাতের কাছে আর পাওয়া যায় না। তাই কালের বির্বতনে হারিয়ে যাচ্ছে এই পেশাটি।

কিশোরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুশা হাজিপাড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‌‘অন্য কাজও জানি না। বাধ্য হয়ে ৪০ বছর ধরে কোনো রকমে এ পেশায় চলছে জীবিকা। হাট-বাজারসহ গ্রামে গ্রামে ঘুরে তৈজসপত্র মেরামত করি। এক সময় আয় রোজগারও ভাল ছিল। তবে সেই সব দিন আজ শুধুই স্মৃতি।

নীলফামারীতে এক সময় ঠাটারি পেশা খুবই পরিচিত ছিল। ঠাটারি বলে পরিচিত শিল্পীরা বালতি, গামলা, হাড়ি, পাতিল, জগ ইত্যাদি ব্যবহার করা সামগ্রী মেরামত করার কাজে গ্রামে গ্রামে অথবা পাড়ায় পাড়ায় হকারের মতো ঘুরে বেড়াত এবং এভাবেই জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে মানুষের জীবনযাত্রা বদলের সঙ্গে সঙ্গে পেশাটিও আজ বিলুপ্ত হচ্ছে।

নানা প্রতিকুলতা আর প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এক সময়ের গৃহস্থলীর নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য মেরামতের দেশিয় এ শিল্পটি(ব্যবসা)। সময়ের সাথে সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে দেশিয় এই শিল্পটি। আধুনিক যুগে মানুষের রুচি পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে অলস সময় ও বেকার হয়ে পড়েছেন এই শিল্পের সাথে জড়িত লোকজনরা। এক সময়ের জনপ্রিয় কামার শিল্পের(ব্যবসা) আদলে গড়া ঠাটারি শিল্পটিও আজ কালের গর্ভে বিলিন হতে চলেছে।

আগের মত এদের ব্যবসা নেই। সবাই এখন প্লাষ্টিক সামগ্রি ব্যবহারে অভ্যস্ত।এদের এই ব্যবসাটিকে বাঁচাতে হলে এর আধুনিকায়ন জরুরি।এতে পুঁজির দরকার। ব্যাংকগুলো যদি এদের সহজ শর্তে সামান্য সুদে লোনের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে এই ব্যবসার সাথে জড়িত লোকজনরা উপকৃত হতো।

-মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর, ঢাকা।

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন