1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (১০ম পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: সোমবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৭৮ দেখেছেন
কয়েকদিন পরেই পেলাম বাংলাদেশ বেতারের খাম। খামে ভরা থাকে আনন্দ সংবাদ। নিউজ এডিটর বজলুন নুর স্বাক্ষরিত চিঠি
একদিন সিনিয়র বড়ভাই নুরুল হক মনজুর সঙ্গে মীরের ময়দান রেডিও স্টেশনে গেলাম। ভলিবল খেলার ঘটনার পর থেকে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক চমৎকার হয়ে উঠল। মনজু ভাইয়ের সঙ্গে  একজন প্রোগ্রাম প্রোডিউসারের রুমে ঢুকলাম। বাইরের নেমপ্লেটে লেখা  এনামুল হক চৌধুরী।
এনামুল হক চৌধুরীর রুমে রেডিও-সংশ্লিষ্ট ছাড়াও অনেক লোকজন যাওয়া-আসা করছিলেন। তাকে অনেক প্রভাবশালী মনে হচ্ছিল।মনজু ভাই লাইজু নামের একটা মেয়েকে রবীন্দ্র সঙ্গীত অথবা নজরুলের গান করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলেন।  তিনি একদিন সময় করে মেয়েটাকে নিয়ে আসার জন্য বললেন।
আমার হঠাৎ মনে হলো,আমিও চেষ্টা করলে রেডিওতে খবর পড়তে পারি। আমি এনামুল হক সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, রেডিওতে খবর পড়ার নিয়ম কী?
       বললেন, অডিশন দিতে হবে। আপনি খবর পড়তে চান?
       আমি মাথা নেড়ে সলজ্জ সম্মতি জানালাম।
তিনি আমাকে একটা কাগজ বের করে দিলেন। কলম দিলেন। বললেন, আঞ্চলিক পরিচালক , বাংলাদেশ বেতার,সিলেটকে অ্যাড্রেস করে একটা আবেদনপত্র লিখেন।
       আমি আবেদনপত্রটি লিখলাম।
       এনামুল হক চৌধুরী একজন পিয়নকে ডাকলেন বেল বাজিয়ে। তার হাতে আমার আবেদনপত্রটা দিয়ে বললেন, এটা  আর ডি সাহেবের পি এ-র কাছে দিয়ে এসো।
 পনেরো-ষোলোদিন পর এলো বাংলাদেশ বেতারের খামে ভরা চিঠি। মীরের ময়দান রেডিও অফিসে আমার অডিশনের দিন ও সময় জানিয়ে সে চিঠি এলো।
       দুরুদুরু বুকে নির্দিষ্ট দিনে অডিশন অর্থাৎ কণ্ঠস্বর পরীক্ষা দিতে গেলাম।আমার জীবনে এ ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। অনেকেই এসেছিলেন অডিশন দিতে। আমাদেরকে হাতে লেখা একটা সংবাদ পড়তে দেওয়া হয়েছিল।
কয়েকদিন পরেই পেলাম বাংলাদেশ বেতারের খাম। খামে ভরা থাকে আনন্দ সংবাদ। নিউজ এডিটর বজলুন নুর স্বাক্ষরিত চিঠি। সম্ভবত সাতজনতে নির্বাচিত করা হয়েছিল। মঈনুদ্দিন মুনশি, রাশেদ নিজাম, অজয় পাল, দিলীপ ভট্টাচার্য, ফজলুল কবীর,এনামূল কবীর আর আমি।
আগে থেকেই খবর পড়তেন বদরুল ইসলাম ও শিবু ভট্টাচার্য।  তাদের সঙ্গে  যুক্ত হলাম আমরা। নিউজ রিডারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শিডিউলে সংবাদ-বুলেটিনের সংখ্যা কমে গেল। তাতে কী, আমার আনন্দ ছিল আকাশপ্রমাণ।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় সংবাদ বুলেটিন প্রচার হয়। যেদিন সংবাদ প্রচার হয়,সেদিন আমাকে হোস্টেল থেকে বের হতে হতো বেলা তিনটার মধ্যে। প্রথমে যেতে হবে মধুশহীদ বার্তা বিভাগের অফিসে। রিকশায় যেতে সময় লাগে একঘন্টা। চারটার সময় সংবাদ বুলেটিন হাতে আসে। ততক্ষণে সেখানে চলে আসে বেতারের মাইক্রোবাস। তারপর আবার উল্টোপথে টিলাগড় ট্রান্সমিশন স্টেশন।
      মীরের ময়দানে আছে বাংলাদেশ বেতার, সিলেটের আঞ্চলিক অফিস। একজন রিজিওনাল ডিরেক্টর (আর ডি) এই অফিসের প্রধান। এটা সিলেট বেতারের প্রশাসনিক ভবন, একইসঙ্গে এই ভবনেই রয়েছে স্টুডিও রুম। নাটক,গানসহ সব ধরণের অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং হয় এখানে। এইসব রেকর্ডকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য টেপবন্দি হয়ে স্পুলে করে চলে যায় টিলাগড় ট্রান্সমিশন সেন্টারে। সরাসরি লাইভ প্রোগ্রাম যাদের অর্থাৎ অনুষ্ঠান ঘোষক ও সংবাদ পাঠকদের সেখানে গিয়েই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হয়।
মঈনুদ্দিন মুনশি, রাশেদ নিজাম, কবীর ভ্রাতৃদ্বয় মেডিকেল কলেজের ছাত্র, মধুশহীদ অফিস থেকে তাদের হোস্টেলের দূরত্ব বেশি নয়। অজয় পাল,দিলীপ ভট্টাচার্য শহরে থাকেন,তাদের সবার সুবিধা হলো,তারা অল্প আয়েশেই ব্রডকাস্টিং স্টেশনে পৌঁছে যান। আর আমার সুবিধা হলো, খবর পড়ার পর গাড়িটা আমাকে আমার হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে যায়।
রেডিওতে খবর পড়ার খবর সিলেটের কবি-লেখক বন্ধুরা ছাড়িয়ে এনজিএফএফের সবার জানা হয়ে যায়। আমার নিজেরই মনে হতে থাকে, সবাই যেন আমাকে সমীহর চোখে দেখছে।
রাত দশটায় প্রচারিত হয় গানের অনুরোধের আসর। খবর পড়া শেষ হলে কিছুটা সময় স্টুডিওতে আড্ডা দেই। তখন অনুরোধের আসরের স্ক্রিপ্ট নিয়ে রিহার্সাল করতে থাকেন উপস্থাপক আমানুল্লাহ খান, দুখতার বেগম ও অন্যরা। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে  অনুরোধকারীদের তালিকায় যুক্ত করে দেই এনজিএফএফে ছেলেপেলেদের নাম। আমাদের বাসার কাছেই খোকন ভাইদের বাসা। খোকন ভাই মানে রেজাউল করিম খোকন। স্কুলে আমার এক ব্যাচ সিনিয়র। তিনি পরবর্তীতে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির মধ্যগগণে যখন তার অবস্থান, তখন সম্ভবত ২০০৯ সালে গাড়ি নিয়ে  মাওয়াঘাটে ফেরীতে ওঠার সময় স্ত্রী-কন্যাসহ গভীর পানির নিচে তলিয়ে যান। টয়োটা স্পেসিও গাড়িটা তিনি নিজেই চালাচ্ছিলেন। সেই বিয়োগ ব্যথার সংবাদ দেশের সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার হয়েছিল।
খোকন ভাই থাকতেন মামার বাসায়। তার অনেকগুলো মামাতো ভাই,মনজু,জিয়া,গওহার,সালাউদ্দিন, সাইফুদ্দিন।  ওরাও সবাই পরবর্তীতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে। আমার চাচাত ভাইদের সংখ্যা বাড়ছিল, যদিও তখন অথবা আজো তাদেরকে আমার চাচাতো ভাই বলে মনে হয় না। ওরাই আমার বুকের ভাই,আপন ভাই। এখানে আমাদের  কোনো বোন নেই। তো তাদের সবার নাম, এই পাড়ার তাদের বন্ধু মিলন,কাঞ্চন আরো কতোজনের নাম তারা নিয়ে হাজির হতো। অনুরোধের আসরে তাদের নাম প্রচার হতো।মজার ব্যাপার হলো, ওরা অনুরোধের আসর শুনতো গান শোনার জন্য না, কেবল তাদের নাম প্রচার হতো। তাদের কাছে এটা নিয়মিত আনন্দ উপভোগের বিষয় হয়ে উঠল। সবচেয়ে ভালো লাগত যখন ‘নীল জোছনা’ মেয়েটি চিঠি লিখে জানাতো,আজ তোমার পড়া খবর শুনলাম। মনে হচ্ছিল, তুমি যেন আমার পাশেই বসেই কথা বলছ।
সিলেট বেতারে আমার পাশের গ্রাম চরবাটার দুইজন কর্মকর্তাকে পেলাম। একজন হলেন প্রোগ্রাম অরগানাইজার নুর হোসেন, অপরজন ইঞ্জিনিয়ার কামাল উদ্দিন। নুর হোসেন সাহেবই কামাল সাহেবের কথা জানালেন। তাকে পেলাম ট্রান্সমিশন সেন্টারে। নুর হোসেন সাহেব পরবর্তীতে কাতার সরকারের অনুদানে পরিচালিত একটি ইসলামি গবেষণা পত্রিকার দায়িত্ব নিয়ে মালয়েশিয়া চলে যান।
সিলেট শহরে আমার পরিচয়ের গণ্ডি বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগ, জাসদ নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। জাসদের আকতার ভাই, লামা ভাই, আওয়ামী লীগের লালা ভাই পছন্দ করতেন আমাকে। ছাপাঘরে  জমজমাট আড্ডা বসে প্রতিদিন।সেখানে কবি-লেখক-সম্পাদকরা আসেন। ছুটির দিনে আমিও যাই। আড্ডা দেই।
সময় দ্রুত বয়ে চলে। একদিন হুটহাট করে পরীক্ষার ঘন্টা বেজে উঠল। লেখাটেখা আর আড্ডাবাজি ছেড়ে পড়াশোনায় মন দিলাম। হোস্টেলে আমরা ‘ওরা ১১ জন’,আমাদের নিঃশ্বাস নেবার সময় নাই যেন। সময়মতো খাবার টেবিলে যাওয়া হয় না। টেবিল বয় মনু আমাদের রুমে রুমে খাবার দিয়ে যায়। বড় ভাইরা ডাইনিংয়ে গেলে তরকারির বাটি পাওয়া যায় না। বাটি কোথায় গেল?
        তখন মনু সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে,মিয়াইনতর রুমাইনতে কট্টাইন (বাটি)।
        তার এই ‘কট্টাইন’ নিয়ে হাসাহাসি চলে বড় ভাইদের। আমাদের দোষ চাপা পড়ে যায়।
        ভালোই পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। আমাদের হায়ার ম্যাথমেটিকস্ ফার্স্ট পেপারে ছিলো ‘জিওমেট্রি, ট্রিগোনোমিট্রি, ক্যালকুলাস’। আর সেকেন্ড পেপারে ছিল ‘স্ট্যাটিকস্ ও ডিনামিকস্’। ৫০ নম্বর করে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা। ম্যাথ সেকেন্ড পেপারের পরীক্ষার আগের রাতে জ্বর এলো। হঠাৎ করেই,কারণ ছাড়া। সারা রাত জ্বরের ঘোরে কাটল। আবোল-তাবোল কথা বলেছি। সকাল বেলা রুমমেট অথবা অন্যদের পরিচর্যায় কিছুটা জ্বর কমল।  বইয়ের পাতাগুলো,খাতাগুলো উলটে দেখারও সময় হলো না।
        জ্বর নিয়েই গেলাম পরীক্ষা দিতে। জ্বর যত না, রিভাইজ করতে না পারার কারণে একটা মানসিক অস্থিরতা তৈরি হলো, সেটাই হয়তো কাল হলো। পরীক্ষা ভালো হলো না। যদি ফেল করি, তাহলে এই সাবজেক্টের জন্যই করব।
        হোস্টেলে ফিরে হিসাব করলাম। কিছুতেই নম্বর ৩৪ এর বেশি তুলতে পারি না। আমার অজান্তে আরও হয়তো ভুল হয়ে রয়েছে।
       আমার হোস্টেল ও কলেজের খরচ পাঠাতেন কাকু। যদি ফেল করি, কীভাবে মুখ দেখাব কাকু-কাকীমাকে! আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর পথ থাকবে না। পরীক্ষা খারাপ হওয়ার পর আমি আর বিআইডিসি গেলাম না। ফেল করার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই সরাসরি বাড়ি চলে এসেছি। আবার পরীক্ষা দেব বলে বইপত্রও সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
নীল জোছনাকেও কিছু জানালাম না। মনকে এই বলে শান্ত রাখলাম, একটা ফেল করা ছাত্রকে সে কেন ভালোবাসতে যাবে! আমাদের পরিচয়ের আগে যে আমাকে সে পছন্দ করতো, সে-তো একটা ভালো ছাত্র ছিল। থাক,তাকে আর কিছু বলার দরকার নেই। না দেখতে দেখতে একদিন ভুলে যাবে। তাছাড়া তারও এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে,এসময় দূরে থাকলেই সে নিরুপদ্রব প্রস্তুতি নিতে পারবে।
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com