1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

হাওরের বহুমাত্রিক উন্নয়নে করণীয়: এস এম মুকুল

  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২২
  • ৩৯ দেখেছেন
জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশে হাওরের অবদান অপরিসীম

হাওর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক এলাকা। কোনো অবস্থাতেই এই প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। পাহাড়ের পলিবাহিত পানিকে হাওরের শত্রু না ভেবে অকালবন্যার কবল থেকে ফসল রক্ষায় উৎপাদন সময় কমিয়ে বা আগিয়ে আনার কথা ভাবতে হবে।  কম সময়ে উন্নত জাতের অধিক ফলনশীল ধান চাষ করা দরকার।  তারও আগে দরকার হাওর এলাকাকে একফসলী নির্ভরতা থেকে বের করে আনা।  বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পিছনে হাওরবাসীর অসামান্য অবদান রয়েছে। প্রায় ত্রিশ লাখ টন ধান উৎপাদন হয় হাওরাঞ্চলে। সারাদেশে উৎপাদিত মাছের ২৫-৩০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। বিরল প্রজাতির দেশীয় ধান ও মাছ ছাড়াও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে এই হাওরে। বাংলাদেশে সার্বিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় হাওরাঞ্চলের অনবদ্য অবদান ও ভুমিকার জন্য আগামী দিনের খাদ্য ও মৎস্য ভান্ডার হিসেবে হাওরাঞ্চলকে স্বীকৃতি দিন।

চীনের দুঃখ হোয়ংহু আর বাংলাদেশের হাওরবাসীর দুঃখ বাঁধ। বাঁধগুলোকে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের নেতৃত্বে স্থায়ীভাবে নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়দের ধারণা, হাওরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুরগুলো খনন এবং অকাল বন্যারোধি বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে নির্মাণ করলে হাওরের ৮০% সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতায় আর উদ্যোগে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের  প্রাণান্ত চেষ্টায় উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা ঘুঁচে গেছে।  আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় হাওরবাসীর অকালবন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোঁচানো সম্ভব হবে।  সেজন্য কম সময়ে উচ্চ ফলনশীল ধানও উৎপাদন করতে হবে। জানা গেছে, ভিয়েতনাম থেকে আমন মৌসুমের জন্য আরো পাঁচটি উচ্চফলনশীল নতুন জাতের ধানের বীজ আনা হয়েছে। যা মাত্র ৯০ থেকে ৯৫ দিনে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। এ ধরণের ধানকে হাওরের উপযোগি করতে গবেষণা চালাতে হবে।

             দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে হাওররে বিশাল ভূমিকা রয়েছে

আমাদের কৃষি ও জিন বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী একজাতের ধান চাষের পরামর্শ দিয়েছেন তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা দরকার। দেশের হাওর এলাকার এই জাতের ধান নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই হাওরাঞ্চলের সফল ১০ বছর নিরাপদে ঘরে তুলতে পারলে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ থেকে উন্নত ও স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না। জনশ্রুতি আছে- শুধুমাত্র শনির হাওরের উৎপাদিত ধানে সারা বাংলাদেশের ৬ দিনের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। উন্নত কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে হাওর হতে আগামী দিনের খাদ্য ও মৎস্য ভান্ডার।

‘হাওর বহুমাত্রিক উন্নয়ণ কর্মসূচি’ দরকার : সুনামগঞ্জকে হাওরের সেন্টার ঘোষণা করা। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলাকে হাওর ইকোনোমিক জোন ঘোষণা, হাওরের উপযোগী শিল্প স্থাপনের আহ্বান *একটি ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠন করা। হাওর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরকে পাঠ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। হাওর সাংস্কৃতিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা।  হাওর উন্নয়ন বোর্ড-এর জনবল বৃদ্ধি করা, সুনামগঞ্জে হাওর উন্নয়ন বোর্ডের লিয়াজো ও মনিটরিং কেন্দ্র স্থাপন করা। হাওর ট্যুরিজমকে জনপ্রিয়করণে উদ্যোগ নেয়া। হাওরাঞ্চলে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা করা। হাওরাঞ্চলের শিক্ষক ও চিকিৎসকদের দুর্গ এলাকায় অবস্থানের জন্য বছরে একটি বাড়তি উৎসাহ বোনাস দেয়া। হাওরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিকের জন্য নিজস্ব মেশিন নৌকার ব্যবস্থা করা, যাতে বর্ষায় শিক্ষার্থীরা সহজে স্কুলে যেতে পারে এবং রোগীরা সহজে চিকিৎসা সেবা পায়। হাওরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য ক্লিন্কি একসাথে স্থাপন করা যেতে পারে। এতে চিকিৎসক ও শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থার খরচ কমবে। কৃষিজ উৎপাদন বহুমূখীকরণ, সমন্বিত কৃষি, ফসলের নিবিড়তা বাড়ালে সত্যিই হাওর হয়ে উঠবে আগামি দিনের খাদ্য ভান্ডার।

                      পাখিদের নীলকাশে বিচরণের আদিগন্ত আকাশের ঠিকানা হাওর

হাওরে ধান রোপন ও কর্তন, মাড়াই কাজে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার করলে সুফল আসবে। শুকনো মৌসুমে হাওরের পতিত জমিতে হাওরের মাটিতে ফলন উপযোগি সরিষা, মাসকলাই, মশুরকলাই, ভুট্টা, গম, শীতকালীন সবজি উৎপাদনে উৎসাহিত করুন। বর্ষায় আখ চাষ,  ভাসমান সবজি চাষ, কুটির শিল্প, গরু-ছাগল (ব্ল্যাকবেঙ্গল)-মহিষ পালন, হাস ও মুরগির খামার প্রভৃতি প্রকল্প বাস্তবায়ন উদ্যোগ নিলে হাওরের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব ও টেকসই হবে। মেঘালয় থেকে আগত ঢলের পানি যে স্থানটিতে প্রথমে এসে পড়ে সেখানটায় মাটি খনন করে জলাধার বানাতে হবে। তাহলে প্রথমেই পানির ঢল এসে সেখানে জমা হবে এবং পানির প্রবাহ চাপ কমবে। নদীগুলো খনন হলে পানি নদীতে প্রবাহিত হতে হতে ফসল ঘরে উঠে আসবে।  হাওর উন্নয়ন বোর্ডের জনবল বাড়িয়ে মনিটরিং, ডাটা কালেকশন, পরিদর্শন, প্রচারণা, প্রকাশনা, গবেষণাসহ কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করা। হাওর বিষয়ক রিপোর্টিং, প্রকাশনা ও লেখালেখিকে উৎসাহিত করার জন্যে প্রতি বছর সাংবাদিক ও লেখক সন্মাননা বা হাওর ক্রিয়েটিভ এক্টিভিটিজ এওয়ার্ড প্রদান করা। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড-এর ওয়েব সাইটটি নিয়মিত বাংলায় আপডেট করা। হাওরের সার্বিক উন্নয়ন, সমস্যা, কার্যক্রম, কর্মসূচি, উদ্যোগ, আয়োজন সর্বোপরি হাওরাঞ্চলের সার্বিক তথ্য ও সংবাদ নিয়ে একটি মাসিক হাওর বার্তা প্রকাশনা করা।  বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড-এর ফেসবুক পেজ চালু করা এবং এতে সকল ধরণের সংবাদ লেখালেখি, ছবি, ভিডিও চিত্র ইত্যাদি প্রচার করা। হাওরকে প্রাকৃতি মৎস্যভান্ডার ঘোষনা করা যেতে পারে। বর্ষায় হাওরের পানিতে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ঘের করে এই পোনা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরে তা মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে। হাওর ট্যুরিজমকে জনপ্রিয়করলে দুই ঋতুতেই (বৃহদার্থে) বিরাট অর্থকরী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে হাওরাঞ্চল। খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, তেতুঁলিয়া, কিশোরগঞ্জ, নিকলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া,  সুনামগঞ্জ, তাহেরপুর, মধ্যনগর, ভোলাগঞ্জ, টেকেরহাট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, জামালগঞ্জ এসব জায়গায় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মাধ্যমে পর্যটকদের থাকা, খাওয়া আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার। বর্ষাকালের আফাল বা ঢেউয়ের তান্ডব থেকে বাড়ীঘর রক্ষার জন্য করচ-হিজলের ব্যারিকেড তৈরি করতে হবে। উন্মুক্ত উচুস্থানে হিজল, করচ ইত্যাদি গাছ লাগিয়ে জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মিটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে। শুকনা মৌসুমে হাওরাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য উপযোগি ‘তিনচাকা বিশিষ্ট মোটর বাইক’ উদ্ভাবন/আমদানি করতে হবে। হাওরের মাঝখান দিয়ে রাস্তা হওয়ার ফলে যোগাযোগ উন্নত হলেও হাওরের পানি, পলি ও মৎস্য অবাদে বিচরণ করতে পারছে না। এজন্য রাস্তায় ঘন ঘন কলভার্ট বসানো দরকার। এতে পলিবাহিত মাটির উর্বরতা সবদিকে ছড়াবে। মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বাড়বে। সহজ শর্তে বা ঋণ দিয়ে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের বিদ্যুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। হাওরবাসী, পরিবেশকর্মী এবং পর্যটকদের অভিমতে, টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান। হাকালুকি হাওরে পিয়াং হাঁস, পাতারি ফুটকি, তিলা ঝাড়ফুটকি, পালাসি ফড়িংফুটকি, বৈকাল ঝাড়ফুটকি, লালাচাঁদি ফুটকি মরচে রং ভূতিহাঁস, এশীয় শামুকখোল পাখির সংখ্যাধিক্য লক্ষ্য করা গেছে। হাওর হতে পারে পাখির অভয়াশ্রম এবং পরিযায়ী পাখির বিচরণ ক্ষেত্র। * হাওরের করচের তেলে বায়োডিজেল উৎপাদন হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভারতেও এ তেল কেরোসিনের পরিবর্তে কুপি জ্বালানো, রান্না-বান্না, পাম্প মেশিন চালানো, পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর চালানো; বাস, ট্রাক ও জেনারেটর চালানো ইত্যাদি কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে। করচের তেল জ্বালানি, লুব্রিক্যান্ট, সাবান কারখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পেইন্টিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। করচের তেল এবং শুকনো পাতা পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহৃত হয়। করচের খইল পোল্ট্রি ফিড হিসেবে ব্যবহার হয়, মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং নেমাটোডের বিরুদ্ধে কাজ করে, বায়ো-গ্যাস উৎপাদনের জন্য খইল গোবরের চেয়ে উত্তম উপাদান বলে অনেকের অভিমত। * হাওরের কালোমাটি সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও কাঠসহ অন্যান্য জ্বালানীর চেয়ে দীর্ঘক্ষণ জ্বলার কারণে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

-এস এম মুকুল, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক,

ই-মেইল: writetomukul36@gmail.com

 

0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com