1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (একাদশ পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২২
  • ১৫৯ দেখেছেন
কিন্তু যতই ট্রেন উত্তরে ছোটে,আমার মন আমাকে নানা প্ররোচনা দিতে থাকে
বাড়িতে এসে আমি নিঃসঙ্গ,রএকাকী জীবন কাটাতে লাগলাম।পারতপক্ষে কারও সঙ্গে কথা বলি না। মাঝে মধ্যে আব্বা-মা কাছে এসে বসেন, এটা-সেটা কথা বলেন। আমি যতটা সম্ভব তাদের কথার জবাব দেই। নিজের মনের কষ্টটাকে কিছুতেই প্রকাশ করি না। মরুঝড়ের সময় ধুলোর ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য যেভাবে বালিয়াড়ির মধ্যে মুখ গুঁজে দেয় উটপাখি,আমিও সেরকম মুখ গুঁজে রাখলাম।
পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগের রাতে আমি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আমি যাচ্ছিলাম কোথাও। হঠাৎ আমার সামনে পড়ল এক গভীর খাল। কিন্তু কী আশ্চর্য আমি একটা দীর্ঘ লাফ দিয়ে খালটা পার হয়ে গেলাম। কীভাবে যে সম্ভব হলো,আমি ভেবে পাই না। স্বপ্নের গরু তাহলে কখনো গাছে চড়ে, আকাশেও ওড়ে।
রেডিওতে রেজাল্ট ঘোষণার খবর শোনার পর আমি মাইজদী গেলাম। ‘বাংলাদেশ অবজারভারে’ আমাদের রেজাল্ট ছাপা হলো। আমার রোল নম্বর পেলাম সেকেন্ড ডিভিশনের তালিকায়।
আমি ফিরে এলাম কলেজে। হোস্টেলে ফিরে সবাইকেই পেলাম। সবাই তাদের মার্কসিট তুলতে ব্যস্ত। আমিও  মার্কসিট তুললাম। অল্প কয়েকটা নম্বরের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন পাইনি। উচ্চতর গণিত ২য় পত্রে আমি ৩৪ নম্বর পেয়েছি। আমি নিজেই একটা সহজ সমীকরণে পৌঁছলাম। এক্সামিনার আমাকে বেশি বা কম নম্বর দেন নি। আমি আসলে পরীক্ষা দিয়ে এসে ৩৪ নম্বরের যে হিসাব করেছিলাম, সেটাই ছিল আমার প্রকৃত পরীক্ষা।
আসাদ চলে গেল ঢাকায়। সে বুয়েটে ভর্তি হবে। তার বাবা ইঞ্জিনিয়ার, স্বাভাবিকভাবে পারিবারিক প্রভাব তার উপরে পড়ে থাকবে।  আমাদের হোস্টেলের কামরুল, সিরাজ মেডিক্যালের প্রস্তুতি নিতে থাকে। আমার স্কুল সহপাঠী বাবুল, খালেক ফিফথ্ ব্লকে থাকতো, তারা দুজনই ঢাকায় চলে গেল। কোনো কলেজে ভর্তি হবে হয়তো। মালিক শহরে থাকতো, সে-ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে থাকে।
আমার কোনো লক্ষ্য নেই। ‘এইম ইন লাইফ’ বলে আমি কখনো কিছু ভাবিনি। কেউ কখনো আমাকে বলেনি, তোমাকে এটা হতে হবে, ওটা হতে হবে, তোমার এটা করা উচিত, ওটা করা উচিত, এটা করা উচিত নয়,ওটা করা উচিত নয়। যদি কেউ তখন আমাকে ‘উইথ ফুল সাপোর্ট’ একটু গাইড করতো, তাহলে হয়তো জীবনকে আমি ভিন্ন কোনো মাত্রায় নিয়ে যেতে পারতাম। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, একজন শিক্ষার্থীর জীবনে প্রকৃত টার্নিং টাইম এই সময়টাই। ভবিষ্যতে কিছু কী হতে চাও, তাহলে এই-ই সময়, কোন্ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে, কোথায় পড়তে হবে, সেটা ঠিক করে নিতে হবে।
       মুজিব বলল ফিজিক্স পড়বে।
       কেন? জিজ্ঞেস করলাম।
        বলল,বিজ্ঞানই যদি পড়ব, তবে কঠিনটাই পড়ব। সায়েন্সের সাবজেক্টগুলোর মধ্যে ফিজিক্সই সবচেয়ে কঠিন,বলতে পারো, ফিজিক্সই বাপ-মা।
      বললাম, আমি কী করব বুঝতে পারছি না।
       তুমি ভালো ছাত্র। ফিজিক্সে ভর্তি হও। দুই ভাই একসঙ্গে অনার্স পাশ করবো।
       ফারুক ভাই বললেন, তুমি লিটারেচারে ভালো, ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হও।
      ভর্তির ব্যাপারে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ অনিশ্চয়তার সংবাদ আমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
আমাদের হোস্টেল ফুডচার্জ ছিল মাসে ৪০ টাকা। বাড়তে বাড়তে সেটা এখন ৯০ টাকায় ঠেকেছে। যখন এটা ৫০/৬০ টাকা হয়েছিল, তখন থেকেই আমি টের পাচ্ছিলাম, কাকুর খরচ দিতে কষ্ট হচ্ছে। ততদিনে তাঁর সংসার বেড়েছে, বাচ্চাদের স্কুলের বেতন বেশি নয়, কিন্তু ওদের মুখ বাড়ছে, ভালোমন্দ খাওয়াতে হয়। এবার ৯০ টাকা ফুড চার্জ, তার সঙ্গে আছে ভর্তি ফি, বেতন- অনেক টাকার ব্যাপার। স্কুলে পড়ার সময় আমি ক্লাস ফাইভ ও ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছি, ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলে আমার বেতন ছিল মাসে ১ টাকা। ক্লাস টু থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত আমি ১ টাকা বেতনেই পড়েছি। কাজেই আমার পেছনে অর্থব্যয়ের বাড়তি চাপ কখনো অনুভূত হয়নি।
সেদিন বিকেলের ট্রেনে আমি বিআইডিসি চলে যাই। রাতের খাবারের পর কাকুর মুখোমুখি হলাম। কাকুকে বললাম, হোস্টেলের ফুডচার্জ ৯০ টাকা করে ফেলেছে। ভর্তি হতেও টাকা লাগবে। শোনার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেন তারপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। কিছুই বললেন না। আমি ভাবলাম, ফার্স্ট ডিভিশন পাইনি, সেজন্য হয়তো মন খারাপ করেছেন।
      পরদিন বললেন, ভর্তি হচ্ছিস কোথায়?
      বললাম, কিছুই ঠিক করিনি। আপনি বলেন।
বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছিল হু-হু করে। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার নানা খবরে পূর্ণ থাকে খবরের কাগজ। কাকু হয়তো সে অবস্থার শিকার হয়েছেন। সেটা বুঝলাম তার পরের কথা থেকে। কাকু বললেন, আমার পক্ষে তো প্রতিমাসে এতগুলো টাকা বের করা কঠিন হবে। বাড়িতে কোনো কথা বলিসনি?
      জি না।
      বাড়ির অবস্থাও তো ভালো নয়।মাহফুজতো জমিজমা সব বিক্রি করে দিয়ে ব্যবসায় লাগিয়েছে। শুনেছি, এখন ব্যবসার অবস্থাও নাকি খারাপ।
কিছুটা উষ্মা কাকুর কন্ঠে। অবশ্য তাঁর উষ্মার কারণও আছে। আমার সেজকাকুর নাম মাহফুজ।  কয়েক বছর আগে অনেক টাকা হাত-কর্জ করে কাকু তাকে বিআইডিসি বাজারে একটা ব্যবসা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের ব্যবসাটা ভালোই ছিল। কিন্তু  হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে নামমাত্র মূল্যে কার কাছে যেন দোকানটা বিক্রি করে দিলেন। তারপর চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে চেপে চলে গেলেন করাচি। করাচি থেকে পরে ক্ষমা চেয়ে তিনি চিঠি পাঠালেন। চিঠিতে জানালেন, যে টাকার ক্ষতি তিনি করেছেন, সব দ্বিগুণ করে ফেরত দিবেন।
কিন্তু দিনের পর দিন চলে যায়, সেজ কাকুর আর খবর পাওয়া যায় না। সেজকাকু ফিরে এসেছিলেন জলোচ্ছ্বাস হওয়ার কিছুদিন আগে। আসার আগে কাকুকে চিঠি লিখলেন, তাকে যেন তিনি ক্ষমা করে দেন,বাড়ি ফিরতে চান।
বাড়ি ফিরে এলেন সেজকাকু। দাদাদের একান্নবর্তী পরিবারও ততদিনে ভেঙে গেছে। সেজ কাকু দেশে ফিরে কিছুদিন চুপচাপ থাকলেন। তারপর দাদাজানকে বুঝিয়ে বেশকিছু  জমিজমা বিক্রয় করে ব্যবসায় পুঁজি খাটালেন। প্রথম প্রথম ব্যবসাটা বেশ ছিল। আমাদের বাড়ির কাছেই স্টিমারঘাট। সেখানে তিনি আড়ত খুললেন। হাতিয়া চ্যানেলে ইলিশ মাছের কারবারিরা তাদের মাছ এনে জমা করে আড়তে। সেজকাকু নোয়াখালী, ঢাকা,চট্টগ্রামে সাপ্লাই পাঠান। যুদ্ধের বছর একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন।যুদ্ধের মধ্যে একবার এক জালিবোট ভর্তি লবন দেয়া কাটা ইলিশ নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। কর্ণফুলী চ্যানেলে আর্মিরা তাকে আটকায়। অনেক মেরেছে তাকে, হয়তো প্রাণেই মেরে ফেলতো। কিন্তু ফ্লুয়েন্ট উর্দু বলার কারণে তিনি বেঁচে যান। বিপুল পরিমান পুঁজি খাটানো ব্যবসার মালামাল ফেলে তিনি কোনোপ্রকারে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। আমার কখনো কখনো এমন মনে হয়,হয়তো পাকিস্তানি সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচবেন বলেই উপলক্ষ হিসেবে একদিন করাচি গিয়েছিলেন ও উর্দু কথা রপ্ত করেছিলেন।
সে-সময় আমাদের নদীতে দ্রুত চর পড়তে শুরু করল, স্টিমারঘাট সরে গেল আরো দক্ষিণে, সেজকাকুর ব্যবসার পতন শুরু হলো।দুই-তিন বছরের মধ্যে আমাদের পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিচে নামতে নামতে এখন প্রায় শুন্যে নেমেছে। কিছুটা আলামত আমি টের পেয়েছি এবার বাড়ি গিয়ে।
একসময় আমাদের মূল বাড়ি ছিল নোয়াখালী শহরের পূর্বদিকে। আমাদের গ্রামের নাম পূর্ব লামছি। চল্লিশের দশকে মেঘনার মোহনার দুর্বিনীত ভাঙনের মুখে পড়ে নোয়াখালীর দক্ষিণের বিশাল ভূভাগ। ভাঙা-গড়ার খেলা চলছিল প্রায় শতবর্ষ ধরে।  চল্লিশের দশকে জমিজমাসহ পূর্ব লামছির বাড়িও ভেঙে যায়। দাদাজান শুন্য হাতে ছোট ছোট  ভাই-বোনদের বুকে আগলে চলে আসেন নতুন জেগে ওঠা চরভূমি চরজুবিলিতে। আবার নতুন করে জীবন শুরু করেন এখানে।
ষাটের দশকের শুরুতে আবার জেগে ওঠে আমাদের পূর্ব লামছিসহ বিশাল ভূভাগ। দাদাজান আবার পূর্ব লামছিতে বাড়ি করেন। আব্বা চন্দ্রঘোনা কাগজের কলে ছোটখাটো কোনো চাকরি করতেন। দাদাজান তাঁকে সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে সেই বাড়ির দায়িত্ব দিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে-পরে দাদাজান সে বাড়িটা বিক্রয় করে দেন মাওলানা সামছুল হক নামের এক ব্যক্তির কাছে। প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেছে, আমরা সেই বাড়ি ছেড়ে এসেছি। আমার দাদাজান পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন প্রায় ত্রিশ বছর। অথচ এখনো বাড়িটা আমাদের পারিবারিক নাম ‘ভূঁইয়া বাড়ি’ নামেই রয়ে গেছে। বাড়িটা বিক্রয় করার আগে দাদাজান তাঁর ভাইদের জিজ্ঞেস করেছিলেন তারা কেউ সে বাড়িতে যেতে চায় কিনা? কেউ সেখানে যেতে রাজি না থাকায় বাড়িটা বিক্রয় করা হয়। সেখানে আব্বারও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। তিনি বাড়ি ফিরে এলেন।
পরিবারে আব্বার তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না। তিনি সহজ-সরল মানুষ। টাকা-পয়সা লেনদেনের জটিল হিসেবের মধ্যে তিনি কখনো জড়াতেন না। কাজেই ছোটভাই যখন জমিজমা বিক্রয় অথবা বন্ধক দিয়ে টাকা নিয়ে ব্যবসায় পুঁজি খাটাচ্ছেন,তিনি ভালো-মন্দ কিছুই বললেন না। তিনি তাঁর বাবার সিদ্ধান্তকেই তিনি চুড়ান্ত ভাবতেন।
কাকু যখন বললেন, বাড়িতে কথা বলেছি কিনা, তখন আমি বিরাট একটা ধাক্কা খেলাম।
কাকু বললেন, এখন যে পরিস্থিতি হয়েছে, তাতে করে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং বা ইউনিভার্সিটির খরচ চালানো পরিবারের পক্ষে কতটা সম্ভব আমি জানি না। আবার বাড়িতে যা, একবার কথা বলে দেখ। আমার পক্ষে কতটা করা সম্ভব সেটা তো তুই বুঝিস! কাকু আরো কিছুটা সময় চুপ থাকেন। হয়তো তাঁর এমনটা মনে হচ্ছিল, এই কথাগুলো আমাকে বলা তার ঠিক হয়নি।
কাকু বললেন, খুব ভালো হয়,যদি তুই চৌমুহনী বা মাইজদীতে বিএসসিতে ভর্তি হোস। চৌমুহনী-মাইজদীতে টিউশনি বা লজিংও পাওয়া যাবে। আমি বিআইডিসি থেকে ভাঙামন নিয়ে বাড়ি চলে গেলাম। কাকুর কথাগুলো বললাম সবাইকে।
সেজকাকু বললেন, এসব নিয়ে একদম টেনশন করবি না। ভর্তি হয়ে যা, মাসে মাসে আমি ২০০ টাকা করে পাঠাব। তখনই আমার হাতে ৪০০ টাকা দিয়ে বললেন, মন দিয়ে পড়াশোনা করবি, টাকার কথা ভাবিস না।
সিলেট ফেরার পথে চৌমুহনীতে নামলাম। আমার সঙ্গে এমসি কলেজে পড়েছে একরাম উল্যাহ দুলাল। চৌমুহনী শহরের গনিপুরে ওদের বাড়ি। ওর বাবা আজিজ উল্যাহ মাস্টার। একসময় শিক্ষকতা করতেন, এখন বইয়ের ব্যবসা করেন, ‘আজিজিয়া প্রেস’ নামে বিশাল ছাপাখানা আছে। ঢাকায়ও ‘আজিজিয়া বুক’ নামে বাংলাবাজারে বইয়ের ব্যবসা আছে, সেটা দুলালের বড় ভাই মমিন উল্যাহ চালান।
দুলালের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পেছনে একটা উদ্দেশ্য এমন ছিল, তাকে সঙ্গে নিয়ে সিলেট ফিরব। এমসি কলেজে পড়ার সময় সে তার বোনের বাসায় থাকতো। দুলাভাই ডাঃ শফিকুর রহমান সিলেট মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক। পরীক্ষার পর সে চৌমুহনী চলে এসেছিল, এটা আমি জানতাম। কলেজে তার সঙ্গে আমার সম্পর্কও গভীর ছিল। চৌমুহনীতে আমার যাত্রাবিরতির আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, কাকুর বলা কথাটা অবচেতনে আমার মনের উপর প্রভাব ফেলছিল। দুলাল আমাকে পেয়ে যেন হাতে স্বর্গ পেল। সে-ও পাশ করেছে।চৌমুহনী শহর বিশাল ব্যবসা কেন্দ্র। অধিকাংশই পাইকারী ব্যবসায়ী। চৌমুহনী হলো নোয়াখালী জেলার ব্যবসার হাব। শহরটাকে দুইভাগ করে চলে গেছে বড় রাস্তা। ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীর দূরতম অঞ্চলে বাস-ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহন চলার জন্য এটাই একমাত্র রাস্তা। রেল চলাচলের রাস্তাও এই শহরের উপর দিয়ে। বড় রাস্তা থেকে বের হয়েছে ছোট ছোট শাখা রাস্তা, বড় বড় আড়ত, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই শাখারাস্তাকে ঘিরে ঘিঞ্জির মত জড়াজড়ি করে রেখেছে। রাস্তাগুলো সারাক্ষণ ছোট ছোট মালটানা ঠেলাগাড়ি, শ্রমিক আর ক্রেতায় ঠাসাঠাসি। চৌমুহনী শহরের একটা বড় অংশজুড়ে আছে স্কুল-কলেজের নোট বইয়ের দোকান, দোকান না বলে আড়ত বলাই ভালো। সারা দেশের নোট বইয়ের জোগান চলে এখান থেকে। ‘এন এক্সপার্ট হেডমাস্টার’ এর সব নোটবই রচিত হয় এখান থেকে। দুলালদের প্রেসের মতো অনেক বড় বড় প্রেস আছে এখানে, অনেকই তার নিকটাত্মীয়। এখানকার মিষ্টির দোকান থেকেও মিষ্টি পাইকারি বিক্রি হয়ে চলে যায় বিভিন্ন জায়গায়। দুইদিনে আমাকে নিয়ে কতবার যে মিষ্টির দোকানে ঢুকল দুলাল, সে হিসেব করা অবান্তর। দুলাল আমাকে নিয়ে সারা শহরের অলিগলি ঘুরল, বয়স তার কম হলেও সে-ও মনে হলো এই শহরের বিশিষ্ট একজন, সবাই তাকে চেনে।
দুলালও আমার সঙ্গে সিলেট চলল। সে-ও মার্কসিট তুলবে। চৌমুহনী স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে দুইবন্ধু একসঙ্গে রওনা দিলাম। দুলাল বলল, দুলাভাই বদলী হয়ে অন্য যে কোনো কলেজে চলে যেতে পারেন। কাজেই চৌমুহনী কলেজেই সে ভর্তি হবে। আমি বললাম, আমার কাকুও আমাকে চৌমুহনীতে ভর্তি হতে বলেছেন। দুলাল আমাকে তখনই জড়িয়ে ধরল। বলল, তুই আমার সঙ্গে থাকবি। আমরা একখাটে ঘুমাব। তুই তো দেখছস,আম্মা, ভাবী তোকে কী রকম আদর করেছে! তুই যদি আমাদের সঙ্গে থাকিস,আমার আব্বা-আম্মা খুব খুশি হবে।
দুলালের উচ্ছ্বাস দেখে মনে মনে একপ্রকার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলি। কিন্তু যতই ট্রেন উত্তরে ছোটে,আমার মন আমাকে নানা প্ররোচনা দিতে থাকে। ওখানে যে তোমার নিজের একটা জগৎ গড়ে উঠছে, ওখানে যে একজন তোমাকে দেখার প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে!
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আগ্রহ আমার এমনিতেই হয় না। মফস্বলে গিয়ে পড়ার ভাবনা আমি ঝেড়ে ফেললাম। সেজকাকু যদি টাকাই দেবেন, তো সৈয়দ মুজিবের সঙ্গে ভর্তি হতে সমস্যা কি! আমি ফিজিক্স অনার্সে ভর্তি হলাম। এবং আমি খুশি ছিলাম।
কিছু বইপত্র কেনা হলো। ইন্টারমিডিয়েটে আমার মিডিয়াম ছিল ইংরেজি। যারা বাংলা মিডিয়াম নিয়ে পড়েছে ইন্টারমিডিয়েটে তাদের অধিকাংশের রেজাল্ট ছিল ভালো। ফিজিক্স অনার্সে বাংলায় পড়ার সুযোগ নেই। নতুন কেনা বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখি।
ওরা ১১ জনের ৯ জন চলে গেছে। কেবল আমি আর মুজিব রয়ে গেলাম। সিনিয়র ভাইদের পরীক্ষা সামনে। তারাও সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে মাথাগুঁজে পড়ে থাকেন। কারো কারো পড়ার পদ্ধতি দেখে  না হেসে পারি না। সারাক্ষণ গুনগুন করে ‘পৃথিবী কমলালেবুর মতো গোল’ এইভাবে পড়া জপতে থাকেন।
আমাদের ক্লাস রুটিন দেওয়া হয়েছে।  আমাদের সঙ্গে দশ-বারোজন ভর্তি হয়েছে। আমাদের পাশেই কেমেষ্ট্রি ডিপার্টমেন্ট। সেখানেও বিশ-পঁচিশজনের মতো ভর্তি হয়েছে। সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হওয়াদের অধিকাংশই আমাদের ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের চেনা-পরিচিতরা।
আমরা যারা ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছি, আমাদের জন্য একটা দুঃসংবাদ ছিল। আমাদের ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপকের সংকট ছিল। আমরা রুটিন মতো ক্লাসে যাই, কিন্তু প্রায়ই টিচারের অপেক্ষা করে করে ক্লাস থেকে চলে আসি। যে-সব অধ্যাপক  ক্লাস করাতে আসেন,তাঁদের কাছেই শুনতে পাই, টিচার সংকট সহসাই কেটে যাবে।
ক্রমশ……..
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন