1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (ত্রয়োদশপর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ১১৯ দেখেছেন
কিউবা বাংলাদেশ থেকে পাটের বস্তা আমদানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে বাংলাদেশ থেকে ৫৪ হাজার পিস পাটের বস্তা রফতানি করা হয়।
পড়াশোনার চাপ নেই, তো কী করব, ভেরেণ্ডা ভাজি- গল্প লিখি, কবিতা লিখি। নতুন করে  আরো কবি-লেখকের সঙ্গে  পরিচয় হয়েছে। তাদের অনেকেই এখন সাহিত্য  জগতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন অথবা নিভৃতচারী লেখক হয়েছেন।
কাসেমী ভাই একদিন নদীর ওইপারে ভার্থখলা নিয়ে গেলেন। সেখানে কবি দিলওয়ারের বাসভবন। কবি দিলওয়ার সিলেটের লেখক ও অভিজাতজনের শ্রদ্ধার পাত্র। আমিও তাঁর লেখার অনুরাগী পাঠক। সে-সময় যুগভেরীতে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছিল তাঁর লেখা দীর্ঘতম ছড়া ‘সেইদেশ কোনদেশ’। তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছিল সেই ছড়াকাব্যে। অর্ধশত বছর পার হয়ে গেছে, দীর্ঘতম সে-ই ছড়াটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়নি। কারণ ছড়াটি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি  যুগভেরীর আর্কাইভেও সংখ্যাগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেছি, সেই সময়ের নবীন ছড়ালেখক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী হারিয়ে যাওয়া ছড়াটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।  ভীষ্মদেব চৌধুরী ছড়াকার বুদ্ধদেব চৌধুরীর অনুজ।
বন্যায় ভাসছে দেশ। উত্তরের জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বানভাসি মানুষ বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ফেলে উঁচু জায়গা,উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিচ্ছে। নিরন্ন মানুষ খাবারের আশায় শহরমূখী হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে সিলেটের নদীগুলো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, দিরাই, বিশ্বনাথের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হেলিকপ্টার চড়ে দেশের বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে উড়ে যাচ্ছেন,মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিজ চোখে দেখে আসছেন।তিনি সমবেত মানুষকে ধৈর্য ধরতে আহবান জানিয়েছেন, একইসঙ্গে ক্ষুধার্ত ও ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষের কাছে খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেবার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
এইসব খবর আমরা সংবাদ পাঠকরা নিজেরাই পাঠ করি। পত্র-পত্রিকার পাতাও ভরে থাকে এইসব সংবাদে।
বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্যই বলা চলে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বর্ষা মৌসুমে ছোটখাটো বন্যা হয়েছিল, তাতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিন্তু অন্য একটা লাভ হয়েছিল, আমাদের গেরিলা যোদ্ধারা জলের নিচে শরীর ডুবিয়ে শত্রুসেনাদের ক্যাম্প আক্রমণ করতে পেরেছিল। ওই বছর ফসল উৎপাদন না হওয়ার আরেকটা প্রধান কারণ ছিল, এক কোটি শরণার্থীর অধিকাংশ মানুষই ছিলেন চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, শ্রমিকশ্রেণির মানুষ। তাদের অনুপস্থিতি চাষবাস ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগে এবং যারা দেশে রয়ে গিয়েছিল, জোর করে তাদের গবাদি পশু ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের রসদের বন্দোবস্ত করে।
পরের বছর গবাদি পশুর সংকট কাটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার অনেক জায়গায় কৃষকদের মাঝে হালের গরু সরবরাহ করেন। বিনামূল্যে সার সরবরাহ করেন। কিন্তু সে বছর খরার কারণে ফসল কম হয়। তারপরের বছরও প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে আবার নেমে আসে বন্যা। পরপর তিনবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একদিকে চলছে খাদ্য সংকট অপরদিকে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ও দেশের অর্থনীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা বিপর্যয়ে ভূমিকা রাখে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা ছাত্রদের আকাঙ্খার সাথে একাত্ম হয়ে বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রকেও তার রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির সঙ্গে যুক্ত করেন। হয়তো পঞ্চাশের দশকে চীন ভ্রমণের সময় চীনা কমিউনের সমবায় পদ্ধতির দিকে আকৃষ্ট হওয়াও একটা কারণ হতে পার। গণতন্ত্রের জন্যও তিনি জীবনভর আন্দোলন করেছিলেন। সেটা তাঁর জীবনের একটা আদর্শিক জায়গা দখল করে থাকে।
দেশভাগের সময় হিংসাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। অথচ শৈশবে যে পরিবেশে তিনি বড় হয়েছিলেন সেটা ছিল হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতিতে গড়া গ্রাম-জীবন। সেখানেই, সেই শৈশবেই তাঁর ভেতরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকশিত হয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর শাসকচক্র যখন বাঙালির ভাষা, সাহিত্য-সংষ্কৃতির উপর আঘাত হানল,তখনই তাঁর ভেতরে প্রবল জাতীয়তাবোধের জাগরণ ঘটে এবং ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলন ও  মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য নায়ক হয়ে বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রাখেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনি সংবিধানকে সমাজতন্ত্র,গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা,জাতীয়তাবাদ-এই চারটা মূলনীতির উপর স্থির করেন,যার সবগুলোই ছিল তাঁরই জীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিজাত।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্ধস্ত দেশকে পুনর্গঠনে সরকারকে সহযোগিতা না করে যুদ্ধকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে সরাসরি অংশগ্রহণকারী দেশ চীন থেকে অর্থগ্রহণ করে কয়েকটি চীনপন্থী রাজনৈতিক দল আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে অস্ত্র নিয়ে সরকার উৎখাতের জন্য ভূমিকা রাখে। সিরাজ সিকদার, মোহাম্মদ তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল মতিন ,আলাউদ্দিন, আবদুল হকদের মতো চীনপন্থী এইসব নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করতেন না। তাদের দলগুলোর নামের সঙ্গেও তারা বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত যুক্ত করে না। তারাও নানা মত নিয়ে নানা দল-উপদলে বিভক্ত থাকে। আবদুল হকের উপদল তাদের প্রচারপত্রে উল্লেখ করে,পূর্ব বাংলা আজ সোভিয়েত সামাজিক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে, আর ভারতীয় জনতার জানিদুশমন ইন্দিরা সরকারের সৈন্যবাহিনী এই উপনিবেশের তদারকিতে নিযুক্ত হয়েছে। সুখেন্দু দস্তিদার, মোহাম্মদ তোয়াহাদের চোখে আওয়ামী লীগ জাতীয় দুশমন,জাতীয় বিশ্বাসঘাতক।
আবদুল মতিন, আলাউদ্দিনরা প্রচার করে, এই রাষ্ট্র স্বাধীন নয়,এই রাষ্ট্র জনগণেরও নয়। সোভিয়েত সম্প্রসারণবাদ পূর্ব বাংলাকে দখল করে নয়া উপনিবেশে পরিণত করেছে। তারা ভারতীয় বাহিনীকে দখলদার বাহিনী এবং মুজিব সরকারকে পুতুল সরকার বলে উল্লেখ করে। তারা রাজশাহীর আত্রাই, রাণীনগর,বাগমারা এলাকার অশিক্ষিত সাধারণ  জনগণকে ভুল বুঝায় এই বলে যে ভারতীয় সৈন্যরা পূর্ব বাংলাকে দখল করে রেখেছে। ওই এলাকাকে তারা স্বাধীনভূমি ঘোষণা করে। শ্রেণিশত্রু খতমের নামে তারা স্থানীয় ধনী ও জোতদারদের হত্যা করতে থাকে।  তাদেরকে দমনের জন্য  সরকারকে সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করতে হয়।
সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি সরকারের জন্য আরেকটা বিষফোড়া হয়ে ওঠে। তারা পূর্ব বাংলাকে ভারতের উপনিবেশ বলে প্রচার করে। তারা বিবৃতি দিয়ে বলে, পূর্ব বাংলার বীর জনগণ, আমাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি,পূর্ব বাংলার অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মহান সংগ্রাম চালিয়ে যান। তারা পূর্ব বাংলাকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করার প্রত্যয় ঘোষণা করে। মোহাম্মদ তোয়াহা বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের বন্ধু। তিনিও ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, শান্তিরক্ষা চুক্তি’কে হীন দাসত্বমূলক চুক্তি বলে বিবৃতি দেন।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এই চীনপন্থী আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলো সারাদেশে শত শত থানা, ফাঁড়ি আক্রমণ করে অস্ত্র লুট করে, শত শত পাটের গুদামে আগুন দেয়, পাটকল, কাপড়ের কলের গুদামে আগুন লাগায়।
কিন্তু সবচেয়ে রহস্যজনক হলো মাওলানা ভাসানীর ভূমিকা। একসময় তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি আর বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। বাংলার মানুষকে অধিকার-সচেতন করার জন্য দুজন একসঙ্গে ছুটে গেছেন বাংলার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে, একসঙ্গে জেলে গিয়েছেন, জেলে থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি সন্তানের মতো ভালো বাসতেন। স্বাধীনতার প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টে তিনি অগ্রদূতের ভূমিকা রেখেছিলেন।
ভারতের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর তিনি বললেন, ভারতই যে বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে ভারত তার প্রমাণ দিয়েছে।… … আমি চাই দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করতে জনগণ মুজিব সরকারকে  দুই-তিন বছর অন্তত সময় দেবে।
কিন্তু হঠাৎ করে মাওলানা ভাসানীর কী হলো যে তিনি কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূঁইফোড় সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে মোর্চা করেন, সরকার-পতন আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ‘হক কথা’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করে মাওবাদী পত্রিকা ‘হলিডে’র মতো সত্য-মিথ্যা নানা গুজব ও কল্পকাহিনি সাজিয়ে ভারত, রাশিয়া ও বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে আজগুবি সংবাদ ছাপতে থাকে।
একদিকে চীনপন্থী এইসব দলগুলো যখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ করে জাসদ গঠন করেন সিরাজুল আলম খান। সরকার বিরোধিতার নামে জাসদ সারাদেশে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। জাসদের চরমপন্থীরা ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা কর্মীকে হত্যা করে। একই ভাবে প্রতিঘাত আসে সরকার দলীয় সংগঠন থেকে। ফলে দেশে যেন হত্যাকাণ্ডের মহোৎসব লেগে যায়।  হাজার হাজার মেধাবী তরুণের লাশ দেশের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করতে থাকে।
চলতি বছরের (১৯৭৪) ১৭ মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করে। পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে  ৫০ জন নেতাকর্মী হতাহত হয়। এই ঘটনায় জাসদের  প্রথমশ্রেণির নেতারা জেলে চলে যাওয়ার পর মধ্যমসারির নেতারা বিপ্লবী গণবাহিনী গঠন করে এবং সরকার বিরোধী গোপন তৎপরতা চালায়। তাদের আক্রমণ থেকে সরকারের কয়েকজন সাংসদও হত্যাকান্ডের শিকার হয়।
চীনপন্থী আর জাসদ বাহিনীর অপতৎপরতা ও সন্ত্রাসের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ন্যায্যমূল্যের দোকানের ডিলারশিপ নিয়ে লক্ষ লক্ষ ভূয়া রেশনকার্ডে মালামাল আত্মসাৎ করে, মালামাল গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, এমনকি এইসব পণ্য চোরাচালান করে সীমান্ত পার করে দেয়, বিনিময়ে সস্তা মানহীন পণ্যে বাজার সয়লাব করে দেয়। দেশের অর্থ পাচার করে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা, অধিক মুনাফার আশায় পণ্য গুদামজাত করে, চোরাচালান করে সমুদ্রপথে বিলাসসামগ্রী আমদানি করে নিয়ে আসে। ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
বঙ্গবন্ধু এইসব সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রক্ষীবাহিনী নামিয়েছেন। নিজদলের মন্ত্রী, এমপি,বড় নেতাদের দল থেকে বহিষ্কার করেছেন। কিন্তু তাদের সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী যে কিছুতেই এই অপশক্তির সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। আর চলতি বছরের বন্যা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে দেশকে নিয়ে যাচ্ছিল।
বিগত বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলেও খাদ্যশস্য আমদানি করে মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু সরকার। কিন্তু এই বছরের পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে খাদ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
১৯৭৩ সালে সেপ্টম্বরে আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়। ফিদেল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন।
কিউবা বাংলাদেশ থেকে পাটের বস্তা আমদানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে বাংলাদেশ থেকে ৫৪ হাজার পিস পাটের বস্তা রফতানি করা হয়। মার্কিনিদের শত্রুদেশ কিউবা। কিউবাকে পাটের বস্তা রফতানি করায় এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে বাংলাদেশ। যে-সময় বাংলাদেশ প্রবল বন্যার কবলে পতিত হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলো, মানুষের জীবন বিপন্ন হলো, তখন মার্কিন সরকারের এই ভূমিকার কারণে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। মজুত খাদ্যশস্য  অপর্যাপ্ত ছিল সত্য, সেটাও পানিবন্দি মানুষের কাছে ঠিকমতো পাঠানো সম্ভব হয় না। বন্যার কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। খাদ্য ও ওষুধ যথাসময়ে বন্যা কবলিতদের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হতে থাকে।
রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য শহরে হাজার হাজার বানভাসি দুর্ভিক্ষপীড়িত  মানুষ রাজপথ, ফুটপাতে উঠে আসে, সেখানেই হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আমাদের শহরে সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হয়ে গেল সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমাদের হোস্টেলের ফুডচার্জ লাফিয়ে উঠল একশ চল্লিশ টাকায়।খাবারের মান নিচে নেমে গেল। হোটেলে খাবারের দাম হয়ে গেল দ্বিগুণ। এক কাপ চায়ের দাম আট আনা থেকে লাফিয়ে হয়ে গেল একটাকা। মানুষ এক কাপ চা দুজনে ভাগ করে খাওয়া শুরু করল। দুজন একসঙ্গে হোটেলে চা খেতে ঢুকে আদেশ করে,’এখটা চা আর এখটা পাইলট।’ পাইলট অর্থ খালি কাপ।
যুদ্ধবিধ্ধস্ত নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশে মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট  মানুষের অপমৃত্যু,সরকারি সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, খুন-জখম, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এইসব বিষয়গুলো আমাদের কবি-ছড়াকার বন্ধুদের লেখায় উঠে আসে। ওইসময়  সিলেটের পত্র-পত্রিকায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য গল্প ছাপা হতে দেখিনি, কিন্তু সাহিত্যপাতাজুড়ে ছাপা হওয়া ছড়া-লিমেরিকগুলো ছিলো অসাধারণ সুন্দর, সময়ের স্বাক্ষীস্বরূপ।
আমার সংগ্রহে থাকা পত্রিকা থেকে কয়কটি ছড়া-লিমেরিক এখানে তুলে ধরলাম।
   বিদ্যুৎ কর / লিমেরিক
   ——————
    খুন আর গুম পড়ে গেছে ধুম
   চুরি রাহাজানি নেই কারো ঘুম
            চোর বাটপার
            করে কারবার
   ফুটে ঠুসঠাস গ্রেনেড আর বোম।
    বুদ্ধদেব চৌধুরী / লিমেরিক
    ———————–
    হাকিম থাকে হুকুম নড়ে এইতো চলে দেশ
    গুম-হত্যা-জখম চলে নেইকো তাহার রেশ।
    বিচার হলে যায় যে জেলে
    মুক্তি যে পায় পয়সা ঢেলে
    তেলেসমাতির খেল দেখায়ে চলছে মজায় দেশ।
 মোহাম্মদ আকছার বকস/ ছড়া
 —- ———————-
পেট শুন্য পিঠ শুন্য / শুন্য সারাদেশ
অষুধ নেই পথ্য নেই / তবু আছি বেশ
নেতা বলেন- ধৈর্য ধর/আরজ করি পেশ
তিনটে বছর পরেই দেখো/’সোনায় ভরা দেশ’
নেতার কথায় কারো মুখে/ মুচকি হাসির রেশ,
কেউবা ভাবে কবে জানি/ দুঃখ হবে শেষ?
      তুষার কর/ ছড়া
      ————–
মনে রেখ, জেনে নাও/জেনে নাও আজকে
আমরাই আনবো যে/ গরীবের রাজকে।
দেখে শুনে বুঝে নাও/ বুঝে নাও আজকে
ঐক্যের সুতো কাটে / আমাদের মাঝে কে
চোখ খুলে দেখে নাও/ দেখে নাও লড়ছি
সূর্যের সাথী হয়ে/ ভিত তার গড়ছি।
     জামান মাহবুব /ছড়া
     —————–
বাংলার মেঘকালো আকাশে /স্বপ্নের দেবতারা ক্ষিপ্ত
মৃত্যুর মুখোমুখি আমরা/ সংগ্রামে দিনমান লিপ্ত।
বাংলার মাঠ-ঘাট-গঞ্জ/নিষ্ঠুর দানবের নৃত্যে
ধ্বংসের ডাক শুনি’ ফুঁসছে/ রক্তের ছাপ মাখা বৃত্তে।…
      ভীষ্মদেব চৌধুরী /ছড়া
      ——————-
দৈনিকের খবরে প্রকাশ / লবন নাকি উধাও
রহিমুদ্দীর কাঁপলো পিলে……(অস্পষ্ট)
লবন নিয়ে লুকোচুরির/খবর যখন এলো
কিনতে গেলো লবন ছ’সের/ভাগ্যে ছটাক পেলো
পরের দিনের পত্রিকাতে/উঠলো খবর জবর।
রহিমুদ্দী খবর শুনে/ পেটে দিয়ে হাত
বল্লো কেঁদে এবার খাবো/ নুনের সাথে ভাত।
     শেখর ভট্টাচার্য /ছড়া
     ——————
হাড়ি,বাড়ি,ফাঁড়ি লুট/নিত্যি যে চলছে
গাড়ি নিয়ে বাড়ি এসে/ প্রাণ নেবে বলছে
প্রাণ নিলে আমরা যে/ প্রতিবাদ করবো
প্রতিবাদ করে শেষে /মরতে হয় মরবো।
       মানিক পাল/ছড়া
       —————-
মেদ-মাংস প্রতাপ-খেতাব/বাড়ছে যতই দেশে
খুুন-খারাবী বাড়ছে ততোই/ রজনীতিরই ক্লেশে।
অস্ত্র নিয়ে কারা ওরা?/ করছে থানা লুট
আমরা দেখি দিন দুপুরে / ওরাই পরে স্যুট।
কাদের হাতে ভূয়া লাইসেন্স / হিজ্যাক করা গাড়ি
নাম প্রকাশে নারাজ রাজা/ রাজ্য বলিহারি।
       আবদুল হামিদ মোহাম্মদ /ছড়া
       ————————-
ভোর হবার আগে দরজাটা খুলে দে
যত কালো রাত্রি ভয় নেই জেনে নে
ডালে বসা শকুনিকে ধরে এনে শুলে দে
তারপর পাখিদের গান তুই শুনে নে।
শকুনের ভয়ে দ্যাখ পাখিগুলো রুষ্ট
দিনরাত পাতাগুলো গাছ থেকে ঝরে যে
বাসা নেই ডালে-ডালে হাওয়া আজ দুষ্ট
চিল আর বাজপাখি আকাশেতে ওড়ে যে।
এছাড়া  কুমার দিলীপ কর, তবারক হোসেইন,মুকুল আশরাফ, শামসুল করিম কয়েস,  সামসুল হক দিশারী,শাহাদত করিম প্রমূখ সুন্দর সুন্দর ছড়া লিখেছেন। হুসেন আহমদ নুরী,অতুলরঞ্জন দেব, খলিলুর রহমান কাসেমী, গোলাম কবির, মহিবুল হক তুলা,লুৎফুন্নেসা লিলি,লায়লা ইউসুফ, রাগিব হাসান,অজয় পাল,মহির উদ্দিন শীরু প্রমূখ সিলেটের কবিতার অঙ্গনকে সরব করে রাখতেন। আর সবার উপরে কবি দিলওয়ার তো ছিলেনই।
আমি তখনো অনামি লেখক। কিছু আবোল-তাবোল ভাবনা, অর্থহীন আবেগ, ভাষার অদক্ষতা, পরম্পরা রক্ষার দুর্বলতা – এইসব নিয়ে আমার লেখক জীবন। আগেই বলেছি, গণকণ্ঠের জন্য সংবাদ প্রেরণ,বাংলাদেশ বেতারে সংবাদ পাঠ এবং নিয়মিত পত্র-পত্রিকার সংস্পর্শে থাকার কারণে আমার মধ্যেও দেশের চলমান পরিস্থিতি প্রভাব ফেলে। যুগভেরীর সাহিত্য বাসরে আমি লিখলাম কবিতা, ক্ষুধা। ২৬ অক্টোবর ১৯৭৪ যুগভেরীর সাহিত্য বাসরে কবিতাটি ছাপা হয়।
দুর্ভিক্ষের পটভূমি নিয়ে আমি একটা গল্প লিখলাম ‘বিপন্ন আগামী’। শহরের ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া বানভাসি এক গৃহবধু সামিয়া, সম্প্রতি সে স্বামী হারিয়েছে দুর্ভিক্ষের দংশনে, সঙ্গী তার ক্ষুধায় নেতিয়ে পড়া অবুঝ শিশু। পেটের অন্ন জোগাবার জন্য, আসন্ন ঈদে সন্তানের জামার বায়না পুরণ করার আশায় তার হাড় জিরজিরে ক্লান্ত শরীর বিক্রির এই গল্প। সমীকরণে গল্পটি ছাপা হয়েছিল। ওই সময়ে প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে একমাত্র এই গল্পটিই আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অংকুরি’তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
একই বিষয় নিয়ে ‘বিভ্রান্ত অনুভব’ নামে আরেকটা গল্পও ছাপা হলো সমীকরণে। মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান, পরিবারের বড় মেয়ে  অভাব ও ক্ষুধায় কষ্ট পাওয়া ভাইবোনদের জীবন বাঁচাতে ছুটে যায় রাজধানীতে। বিরুদ্ধ স্রোতের টানে ভেসে যায় সে। গল্পটি এক নবীন লেখকের সরল ভাবনার প্রকাশ। না, কোনো গল্প সংকলনে ‘বিভ্রান্ত অনুভব’ জায়গা দেওয়া হয়নি। কারণ,ওটাকে তখন বিকলাঙ্গ গল্প মনে হয়েছে। ‘সংলাপঃআগামী পৃথিবীর শপথে’ নামে একটা গল্প লিখলাম যুগভেরীর বিজয় দিবস সংখ্যায়। যুগভেরীর শিশু-কিশোরদের পাতা ‘শাপলার মেলা’য় লিখলাম,’আমি মুক্তিসেনা’। মহির উদ্দিন শীরু এই গল্পটিই তার সম্পাদিত ‘শাপলা’য় পুনর্মুদ্রণ করেন। একই সময়কালে আরো কিছু গল্প ছাপা হয় আকছার বকসের আবির্ভাব, রাগীব হাসানের ম্যাগাজিন জাগরণে। পরবর্তী সময়ে গ্রন্থভূক্ত করার সময় সেগুলো বিবেচনায় আনা হয়নি। কারণ আমি জানি, সাহিত্য কোনো হাসি-তামাসার বিষয় নয়।
(চলমান………….)
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com