1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ০২:২৭ অপরাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (চতুর্দশ পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ৫২ দেখেছেন
দুর্ভিক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায়।সরকারি হিসেবে সাতাশ হাজার অথবা সাঁইত্রিশ হাজার বলা হলো। মানুষের এই বিপুল মৃত্যুও কিছু কিছু মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে না। মানুষ যেন ভুলেই গেছে মাত্র তিন বছর আগে তারাই পাকিস্তানি দখলদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এক বিভৎস নারকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল তারা,তাদের ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়, প্রায় চার লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল। একশ্রেণির মানুষের লোভ ও উচ্চাকাঙ্খা এতই বেড়ে যাচ্ছিল যে, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বারবার সতর্কবাণী,উপদেশ কোনো কিছুই কাজে আসছিলো না। আগের মতোই মজুতদারি, চোরাচালানি, ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত, খাদ্যে ভেজাল, সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুসগ্রহণ, সরকারি দলের নেতাদের চাঁদাবাজি, ভূমিদখল-বাড়িদখল,ক্ষমতার অপব্যবহার কিছুই থেমে থাকে না।  এইসব থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বঙ্গবন্ধু রক্ষীবাহিনী মাঠে নামান। কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনি। একটা প্রতিকারের আশায় বঙ্গবন্ধু ডিসেম্বর মাসের ২৮ তারিখ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন ও বিশেষ আইন জারি করেন।
জরুরি অবস্থা জারি করায় কিছু ইতিবাচক ফল দেখা যায়। দেশব্যাপী বল্গাহীণ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, রাহাজানি আর হত্যার উৎসব থেমে আসে, জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য কৃষক আবার নতুন উদ্যমে মাঠে ফিরে যায়। কিছুটা দেরীতে হলেও কৃষকের ঘরে ধান ওঠে। মাঠে মাঠে রবিশস্য, সবুজ শাকসবজির বাহার, আনাজ-তরকারিতে হাটবাজার পূর্ণ হয়ে যায়। ওই সময় শীতের টানে খাল-বিল,হাওড়-বাঁওড়-নদী শুকিয়ে আসে, মাছের যোগান বাড়তে থাকে। দুর্ভিক্ষের দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেষ্টা করে।
বঙ্গবন্ধু তিনবছর মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। খরা,বন্যা,সন্ত্রাস-দুর্নীতি আর আন্তর্জাতিক ফুড পলিটিক্সের শিকার হয়ে তিনি স্বাভাবিক পথে এগোতে  পারছিলেন না। এখন তিন বছর পূর্ণ হয়েছে,সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটতে শুরু করেছে ।
 দুর্ভিক্ষ শেষ হয়েছে সত্যি, কিন্তু দুর্ভিক্ষের দাগ রয়ে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি যাদের আত্মসম্মানবোধ টনটনে, যারা অন্যের কাছে হাত পাতাকে আত্মমর্যাদায় আঘাত মনে করে তারা জমিজমা বিক্রয় করে দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করে। নব্য টাকাওয়ালারা সুযোগ পেয়ে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তের সম্পদ ক্রয় করে নিল। সমাজে ধনীক শ্রেণির সংখ্যা বৃদ্ধি পেল, মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তদের অনেকেই সম্পদহারা হয়ে গেলেন। দেশে রাজনীতিতেও একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইতে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর জীবনের আরাধ্য চার মূলনীতি, যার উপর ভিত্তি করে তিনি দেশের সংবিধান তৈরি করলেন, সেই তিনিই দেশে বিদ্যমান সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে সংসদে বিল পাশ করেন ২৫ জানুয়ারি। ২৯৪-০ ভোটে সংসদে একদলীয় সরকারব্যবস্থা কায়েম হয়।তাঁর নিজের দল আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সকল দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ‘বাকশাল’ হবে প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব গভর্নমেন্ট। বঙ্গবন্ধু নিজে দেশের প্রেসিডেন্ট থাকবেন এবং একটা পলিটব্যুরোর মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে। বাকশালের মধ্যেও থাকবে ছাত্র সংগঠন, নাম হবে জাতীয় ছাত্রলীগ, যুব উইং অর্থাৎ  জাতীয় যুবলীগ, একইভাবে জাতীয় কৃষকলীগ, জাতীয় শ্রমিকলীগ, জাতীয় মহিলা লীগ। দেশের শাসন পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের কথা বলা হলো। বাকশালের ভিত্তি হবে গ্রাম। সবাইকে সমবায়ের আওতায় আনা হবে। গ্রাম্য বাটপার,পলিটিকাল টাউট বলে কিছু থাকতে পারবে না। সমবায় সমিতিগুলোকে সরকার নিজেই বীজ, সার, সেচ,চাষের সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। জমির মালিক, কৃষি শ্রমিক, সরকার সকলেই সমান অংশীদারিত্বের হিসেবে ফসলের ভাগ পাবে। এটা অনেকটা চীনের কমিউন পদ্ধতির মতো। বাকশালের প্রতিনিধি নির্বাচন হবে গ্রাম পর্যায় থেকে। প্রথম নির্বাচন হবে ইউনিয়ন পর্যায়ে। তারা নির্বাচিত করবে থানা প্রতিনিধি, থানা প্রতিনিধি নির্বাচন করবে জেলা প্রতিনিধি।  সরকার বাংলাদেশকে ৬৪ টি প্রশাসনিক জেলায়  বিভক্ত করবে। জেলার দায়িত্ব থাকবে জেলা গভর্নরের উপর। জেলা গভর্নর সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। তিনি বাকশাল সদস্যও হতে পারেন, সরকারি কর্মকর্তাও হতে পারেন। জেলাই হবে প্রশাসন ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। বাকশাল প্রতিনিধি ও জেলা গভর্নর পরষ্পরের সমন্বয় করে কাজ করবেন।
 তখন পর্যন্ত যদিও প্রশাসন পরিচালনার বিধিমালা চুড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি,তবে জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ সংসদে ৪র্থ সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার পর  রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পূর্বে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দেন,তা থেকে বাকশাল কার্যক্রমের একটা সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে সংবিধান সংশোধনের কারণ বর্ণনা করেন।দুর্নীতিবাজ,ঘুসখোর, চোরাকারবারিদের উৎখাতের প্রসঙ্গে বলেন, তাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কোনে দেশে করে নাই, স্পিকার সাহেব আপনি তো ছিলেন,কোনো দেশের ইতিহাসে নেই। পড়ুন দুনিয়ার ইতিহাস, বিপ্লবের পরে যারা বিপ্লবকে বাধা দিয়েছে,যারা শত্রুদের সহযোগিতা করেছে,যারা দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, কোনো দেশ তাদেরকে ক্ষমা করে নাই। কিন্তু আমরা করেছিলাম। বলেছিলাম,দেশকে ভালোবাস,দেশের জন্য কাজ কর,স্বাধীনতাকে গ্রহণ করে নাও। কিন্তু অনেকের পরিবর্তন হয় নাই। তারা গোপনে বিদেশিদের কাছ থেকে পয়সা এনে বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা মনে করে যে খবর রাখি না। এত বড় তারা ব্যান্ডিট। মানুষকে রাতের অন্ধকারে হত্যা করে,মনে করে যে, তাকে কেউ ধরতে পারবে না। কোথায় সিরাজ সিকদার? তাকে যদি ধরা যায়,আর তার যে দলবল তাদের যদি ধরা যায়(!), ধরতে পারব না কোন্ অফিসে কে ঘুসখান,ধরতে পারব না কে অন্ধকারে বিদেশের থেকে পয়সা খান,ধরতে পারব না কে কোথায় পয়সা লুট করেন,ধরতে পারব না কোথায় কারা হোর্ডার আছেন, ধরতে পারব না কারা ব্লাক মার্কেটিয়ার আছেন? নিশ্চয়ই ধরতে পারব।সময়ের প্রয়োজন। যেতে পারবে না কেউ। ইনশাআল্লাহ পাপ একদিন ধরা দেবেই। এটা মিথ্যা হতে পার না। দুনিয়ায় কোনোদিন পাপ আর পূণ্য পাশাপাশি চলতে পারে না। পূণ্য চলে একদিকে,পাপ চলে অন্যদিকে।… …  যার যা ইচ্ছা লেখে,কেউ এ-নামে বাংলাদেশকে ডাকে, কেউ ও-নামে বাংলাদেশকে ডাকে,বাংলাদেশের নাম পর্যন্ত বলতে তারা লজ্জাবোধ করে। তাদের অধিকার নেই বাংলার মাটিতে থাকার-… … আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি সংবিধানকে।কারণ একটা সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা এদেশে কায়েম করতে হবে।… দিস ইজ আওয়ার সেকেন্ড রেভলুশন।… আমরা অ্যামেন্ডমেন্ড কনস্টিটিউশনে যে নতুন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি, এটাও একটা গণতন্ত্র। শোষিতের গণতন্ত্র, এখানে জনগণের ভোটাধিকার থাকবে। এখানে আমরা সমাজতন্ত্র করতে চাই, এখানে আমরা শোষিতের গণতন্ত্র রাখতে চাই।…
বাকশাল নিয়ে পরিবর্তনের হাওয়া বইছিল,কেবল রাজধানী নয় সেই হাওয়ার ঝাপটা আছড়ে পড়ে দূর মফস্বলেও। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত বাকশালের বিভিন্ন কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে লবিং শুরু হয়। রাজধানী অভিমুখেও নেতাকর্মী-সমর্থকদের  যাতায়াত বেড়ে যায়। ঢাকার সার্কিট হাউস রোডে বাকশালের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। প্রতিদিন সেখানে বর্ণিল শোভাযাত্রা হয়,বাকশালের পক্ষে স্লোগান হয়। সংবাদ পাঠ  আর সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির কিছুটাও জানার সুযোগ আমার হচ্ছিলো।  কিন্তু যা হচ্ছিলো না, তার সমাধানের কোনো পথ আমার জানা হয় না। আমাদের সাবসিডিয়ারী পরীক্ষার কোনো খবর তৈরি হয় না।কলেজেও কোনো পড়াশোনা হয় না। এর একটা সুফল অবশ্য আমার হলো,আমার আর হোস্টেলে থাকার দরকার থাকল না। আমি প্রায়ই তাজপুর মনজুদের বাড়ি চলে যেতাম। হোস্টেলের সেই ডিনারের অনুষ্ঠানে নুরুল হক মনজুর ঘোষণার পর তাকে আমি মনজু চাচা বলে ডাকতে শুরু করি।
মনজু পরদিনই আমাকে তাদের গ্রামের বাড়ি তাজপুর নিয়ে গিয়েছিলেন।তার বাবা-মার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মনজুদের গ্রামের নাম কাশীকাফন। তার বাবার নাম হাজি ওমর আলী। তার মা বাড়ির পাশেই একটা প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক।  দুজনেরই বয়স হয়েছে। মনজুরা একভাই একবোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট ব্রাঞ্চের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের একছেলে একমেয়ে। মেয়ের নাম বুলবুল,বয়স আট,ছেলের নাম সুবল,বয়স পাঁচ। বুলবুল নানির কাছেই থাকে। নানির সঙ্গে স্কুলে যায়-আসে।
     মনজুর বাবা-মাকে আমি দাদা-দাদি ডাকি। তাঁরাও আমাকে অপরিসীম স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলেন।
      মনজু চাচার পরীক্ষা পর্যন্ত আমি নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে হোস্টেলে থাকলাম। তার পরীক্ষায় সহযোগিতার জন্য তিনি আমাকে ধরে রাখতেন। নুরুল হক মনজু যেদিন চুড়ান্তভাবে হোস্টেল ছেড়ে কাশীকাফন  চলে যান,আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যান।
     আমাকে বললেন, হোস্টেলে সিট আছে। ক্লাস শুরু হলে চলে এসো।
       আসলে আমার জন্য আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি ছিলো না। এরইমধ্যে একবার গ্রামের বাড়িও গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানকার পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো নয়।  গত একবছরে বেশ কিছু জমিজমা বিক্রয় করা হয়েছে। বাবা একজন  চুপচাপ  মানুষ হিসেবে পরিবারের সবার সঙ্গে মিশে থাকেন, আলাদাভাবে তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করা যায় না।
     আমার মা লুকিয়ে তার গলা থেকে সোনার মোহরমালা খুলে আমার হাতে দিলেন।  আমাদের গ্রাম্য ভাষায় বলে দানা তাবিজ। কালো কাইতনের মোটা তাগায় আটকানো ছয়টা সোনার তাবিজ। তাবিজগুলো আমার হাতে দিয়ে  বললেন, এগুলো বিক্রি করে তুমি পড়ালেখার খরচ চালাও।
     মায়ের কথা শুনে আমি ম্লান হাসি। এই সোনার তাবিজ বিক্রি করলে কত টাকা হবে আমি জানি না,কিন্তু সেই টাকা দিয়ে যে আমার পড়ালেখা শেষ হবে না,এটা আমি বুঝতে পারি।
    আরেকটা আগাম দুঃসংবাদও মা আমাকে শোনালেন। বললেন, তোমার নানাবাড়ি থেকে আমি কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলাম।সেটাও তোমার আব্বাকে বুঝিয়ে বিক্রয় করে দেওয়া হয়েছে। তার বদলে তোমার দাদাজান এই বাড়ির উত্তর পাশে একটা জমি দিয়েছেন। সেখানে তোমার বাবাকে বাড়ি করে চলে যেতে হবে। তোমার ভাই-বোন বেশি, সে কারণে সংসারে একটা বাড়তি চাপ তো হয়-ই।
     মায়ের এই কথাটার উত্তর খুব সহজ। আব্বার পরিবারকেও আলাদা করে দেওয়া হবে।
        একবুক হতাশা আর কষ্ট নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে সঙ্গী করে বাড়ি থেকে চলে এলাম। না, কোথাও সম্পর্কের এতটুকু ঘাটতি চোখে পড়ল না। দাদা-দাদির আদর-স্নেহের এতটুকু কমতি চোখে পড়ল না, সেজকাকুও পড়াশোনার খবর নিলেন।  আর্থিক দৈন্যতার কথাও বললেন অকপটে। আসার সময় আমার হাতে পাঁচশ টাকা দিয়ে বললেন, আপাতত এটা রাখ। পরে সময় সুযোগ করে আবার পাঠাব।
        আসলে কাউকেই কিছু বলার নেই। সবই নিয়তির লিখন। ফেরার পথে চৌমুহনী নামলাম। দুলাল বলল, আমি আর পড়াশোনা করব না। কতদিন পরীক্ষার আশায় বসে থাকব। সেশনজট শুরু হয়েছে, এটা কবে শেষ হবে তার কথা কেউ বলতে পারছে না।
        তাহলে কি করবি?
        আমার জিজ্ঞাসার জবাবে বলল, ঢাকায় চলে যাব। আমাদের পারিবারিক ব্যবসা বইয়ের ব্যবসা, তাতো জানিস। বড়ভাই বাংলাবাজারে বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছে। বাহার ভাইও (সেজ ভাই) দোকান নিয়েছে। আমিও শুরু করব।
        আমি আমার কথা বললাম। দুলাল আমাকে বকাঝকা করল। কেন সেদিন  তার কথা শুনে চৌমুহনীতে থাকলাম না। দুলাল আমাকে ট্রান্সফার নিয়ে চৌমুহনী চলে আসতে বলল। বলল,তুই এখানে আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে থাকবি।
        আমি বললাম ,তোদের এখানে তো ফিজিক্স অনার্স নেই।
        সে বলল,বিএসসি পড়বি।
        বললাম, আমার নতুন করে শুরু করার সময় নেইরে! আমার এখন যা অবস্থা, তাতে নিয়তির নির্ধারিত পথে চলা ছাড়া আমার বিকল্প নেই।
     ফিরে এলাম কাশীকাফন, মনজু চাচার বাড়ি। আমি এখন অনেকটা ওর পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি। সংবাদ পাঠ অথবা অন্য কোনো কারণে আমি সিলেট গিয়ে ফিরে না এলে আমার খোঁজখবর শুরু হয়ে যায়। আমাকে দেখতে না পেলে কেমন অস্থির হয়েই দুই বুড়োবুড়ি জিজ্ঞেস করেন, মনি খই?
    নুরুল হক মনজুর সঙ্গে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াই। তাজপুর যাই লাইজুদের বাসায়। লাইজু হলো সেই মেয়েটা যাকে প্রোগ্রাম দেওয়ার জন্য নুরুল হক মনজু এনামুল হক চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলেন। লাইজুর বাবা হলেন আবু বকর সিদ্দিক সাহেব, তাজপুরের সাব-রেজিস্টার  তিনি।  মনজু চাচা লাইজুকে মনে মনে ভালো বাসতেন। কিন্তু কোনোদিন তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেননি। ছোটখাটো শরীরের মনজু হয়তো সাহস করতে পারেননি তার চেয়ে রঙ ও কাঠামোয় অনেক সুন্দর একটা মেয়েকে প্রপোজ করতে। আবার এমনও হতে পারে ক্লাস এইটে পড়ুয়া সদ্য এই কিশোরীকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেওয়াটাকে তিনি শোভন মনে করেননি।
      মনজু চাচার চেষ্টায় লাইজু বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পায়। যেদিন তার রেকর্ডিং থাকে, সেদিন মনজু চাচাই সঙ্গে করে নিয়ে যান। আমি কাশীকাফন আসার পর মাঝে মধ্যে এই দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপে। তাজপুর থেকে সিলেট যাওয়ার বাহন ছিল বেবিট্যাক্সি। বেবিট্যাক্সি করেই আমরা সিলেট-তাজপুর যাতায়াত করতাম।
      লাইজুর আরেকটা ছোটবোন ছিল জলি। অনেক নিচের ক্লাসে পড়ত। লাইজুদের কাছে শুনেছিলাম তাদের মামা হচ্ছেন এ এম এস কিবরিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় একযোগে যে-সব কুটনীতিক পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন,তিনিও তাদের একজন। পরবর্তীতে এ এম এস কিবরিয়া বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা সরকারের খ্যাতিমান অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন।
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন