1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ  (১৫তম পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির       

  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ৬৭ দেখেছেন
জহির রায়হান: বেঁচে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো তাঁর হাতেই নির্মাণ হতো।
তাজপুর থাকলেও আমার মন পড়ে থাকে কলেজে, হোস্টেলে। এমন নয় যে আমি তাজপুরেই পড়ে থাকি। মনজু অথবা আমি,আমাদের যে কোনো একজনের কাজ থাকেই,আমাদের প্রায়ই সিলেট যেতে হয়। নুরুল হক মনজু ছাত্রলীগ অফিস, আওয়ামী লীগ অফিসে যান, ইম্পেরিয়াল হোটেলের ম্যানেজার নলিনি বাবুর দোতলার অফিসে তার কলেজ ও দলের বন্ধুরা আড্ডা দিতে জমা হয়, আমিও তাদের আড্ডায় একজন হয়ে থাকি। মাঝেমধ্যে  আমি কলেজের খবর জানতে হোস্টেলে যাই, মুজিবের সাথে কথা বলি, তার গেস্ট হয়ে এক-দুদিন হোস্টেলে থেকে যাই,আমার মতো সে-ও হতাশ,মনমরা থাকে। রেডিওতে খবর পড়ার দিনে সিলেট এলেও হোস্টেলে থেকে যাই, লেখক বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে মুজিবকে নিয়েই ছাপাঘর অথবা শীরু ভাইয়ের অফিসে চলে যাই। কোনো কোনো দিন  চলে যাই সিনেমা দেখতে। এর আগেও আমরা দুজন একসঙ্গে সিনেমা দেখতাম। ‘ওরা ১১ জনে’র পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখলাম,মমতাজ আলী পরিচালিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী’, উনসত্তরের গণআন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের উপর জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’। ‘রক্তাক্ত বাংলা’ সিনেমাটি আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল। বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকি বাহিনির বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের  মরণপণ লড়াইয়ের সরাসরি চিত্রধারণ করা হয়েছে এই সিনেমায়। পরিচালক যুদ্ধের মধ্যেই এইসব ছবি ধারণ করেছিলেন। এখন বেশ বুঝতে পারি,তখন আমাদের চিত্র পরিচালকরাও চুপচাপ বসে থাকেন নি। ক্যামেরা হাতে রণাঙ্গনে ছুটে গেছেন। চাষী নজরুল ইসলাম ‘ওরা ১১ জন’ ছাড়াও ‘সংগ্রাম’ নামে আরেকটা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা বানিয়েছিলেন। জহির রায়হান ছিলেন বাংলা সিনেমার মহান পরিচালক ও সাহিত্যিক। তিনিও যুদ্ধের মধ্যেই ছুটে গেছেন যুদ্ধের ময়দানে। তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ অমর চলচ্চিত্র। এ জীবনে কতবার যে দেখেছি, তবু তৃপ্তি মেটে না। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙ্গার জন্য বাঙালির স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে জাগিয়ে তুলেছিল এই সিনেমা। চলচ্চিত্রও যে একটা জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, যারা ওই সময়কালের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, তাদেরও এই চলচ্চিত্রটি দেখা দরকার। একটি পরিবারের ক্ষমতাধর এক নারীর বিরুদ্ধে পরিবারের অন্য সদস্যদের  অনাস্থার গল্পের মাধ্যমে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বঙালির বিদ্রোহ ও জাগরণের মন্ত্রণা ছিল এই চলচ্চিত্র।
 জহির রায়হান  মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আসার পর জানতে পারেন মিরপুর বধ্যভূমিতে শত শত বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বড় ভাই সাহিত্যিক-সাংবাদিক শহীদুল্লাহ্ কায়সারও সেই নির্মমতার শিকার হয়েছেন। তখন তাঁর কাছে খবর আসে শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত আছেন। খবরের সূত্র ধরে তিনি ভাইকে খুঁজতে যান। কিন্তু তিনিও আর ফিরে আসেন নি। ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতার শত্রুদের হাতে তিনিও হয়তো নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার  হয়েছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে এটা নিশ্চিতই বিশ্বাস করা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো তাঁর হাতেই নির্মাণ হতো।
 সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেছিলেন অরুণোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী। তিনিও ক্যামেরা হাতে যুদ্ধের মাঠে ছুটে গেছেন, তার প্রমাণ তার অসাধারণ এই সিনেমাটি।
  ‘রক্তাক্ত বাংলা’ ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবি নয়।তখন সেই সুযোগ তৈরি হয়নি। তবু এই সিনেমার পাত্রপাত্রী,কলাকুশলীরা দুই দেশের।ছবির নায়ক বিশ্বজিৎ কলকাতার। নায়িকা কবরী। প্রধান দুই সহশিল্পী বাংলাদেশের গোলাম মুস্তফা ও সুলতানা। ছবির গল্প লিখেছেন কলকাতার রত্না চ্যাটার্জি। গান রচনা করেছেন সলিল চৌধুরী  এবং গানের শিল্পীরা ছিলেন লতা মঙ্গেশকর,মান্না দে ও সবিতা চৌধুরী। নায়ক বিশ্বজিৎ শাহেদ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি একজন ভাষ্কর। পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে নায়কের বোন হেনা( সুলতানা) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার স্টুডিওতে রক্ষিত ভাষ্কর্যগুলো গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়। সাতাশ মার্চ বাড়ি ফিরে স্নেহময়ী বোনকে মৃত অবস্থায় পান শাহেদ।  প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে নায়ক এরপর যুদ্ধে চলে যান। যুদ্ধ থেকে বিজয়ী ক্যাপ্টেন শাহেদ ফেরার পথে নারীকন্ঠের আর্তধ্বনি শুনে একটা পোড়োবাড়িতে যান। সেখানে তিনি তার সহযোদ্ধা মেজর ডাক্তার মাসুদ (মুস্তাফা) ও  তার বোন সন্ধ্যার (কবরী) দেখা পান। সন্ধ্যা পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধর্ষিত হন এবং তাদের ক্যাম্পে আটক ছিলেন। যুদ্ধফেরত ডাক্তার ভাই সমাজের অপমান থেকে রক্ষার জন্য বোনকে এই পোড়ো বাড়িতে নিয়ে এলেন এবং তার মানসিক ও শারীরিক  চিকিৎসা করছিলেন। ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায়,সন্ধ্যা নিজেও ভাষ্কর্যশিল্পের নব্য শিক্ষার্থী ছিলেন এবং একদিন শাহেদের স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। কিন্তু অসতর্কতায় ধাক্কা লেগে একটা ভাষ্কর্যের হাত ভেঙে গেলে শাহেদের অপমান ও গঞ্জনার শিকার হন। এখান থেকে সিনেমা তার নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়।
    এই ছবির সবচাইতে হৃদয় তোলপাড় করা বিষয় ছিল ভাই-বোনের ভালোবাসা। লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘দাদাভাই মূর্তি বানাও’ গানটা প্রতিটি দর্শকের চোখকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের সিনেমার জন্য সেটাই ছিল লতা মঙ্গেসকরের গাওয়া প্রথম গান। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল গানটা। গানটা ছিল এরকম-
    দাদাভাই মূর্তি বানাও
    ও দাদাভাই মূর্তি বানাও
    নাক মূখ চোখ সবই বানাও
    হাত বানাও,পা বানাও
    মন বানাতে পারো কি
    একটা বোন বানাতে পারো কি?
 ওই সময় অনেকগুলো রোমান্টিক ছবিও মুক্তি পেয়েছিল। কাজী জহীর ছিলেন রোমান্টিক ছবির নির্মাতা। তাঁর নির্মিত ‘অবুঝ মন’,জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ খুব জনপ্রিয় হয়ছিল। তখনকার প্রায় সব সিনেমাই ছিল শিল্পমান সমৃদ্ধ, পরিচ্ছন্ন।গল্প,নায়ক-নায়িকাদের পোশাক ছিল শালীন,পরিবারের সবাইকে নিয়ে যে কোনো সিনেমা হলে বসে দেখা যেত। অবুঝ মন সিনেমার ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ এবং রংবাজ সিনেমার ‘সে যে কেন এলোনা কিছু ভালো লাগেনা, এবার আসুক তারে মজা দেখাবো’ গান দুটি বাংলা গানের জগতে এখন পর্যন্ত সমান জনপ্রিয় হয়ে রয়েছে।
 মুজিব আর আমার জীবনের মূল্যবান সময়গুলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে সিনেমা দেখে কাটতে লাগল। মাঝেমধ্যে আক্ষেপ করত মুজিব, শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ
 আজির হোসেন হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। এইসব কষ্টের মধ্যেও পিপাসার্ত চাতকের ঠোঁটে আকাশ থেকে ঝরে পড়া একটু জলের শান্তির মতো আমারও হৃদয়ে প্রশান্তি নিয়ে আসতো নীল জোছনার চিঠি। খলিলুর রহমান কাসেমীর ডাকবাক্স নম্বর তাকে পাঠিয়ে ছিলাম।ওখানে সমীকরণের জন্য লেখা আসে। সেখানেই তার চিঠিও আসে। কাসেমী ভাই তার ডাকবাক্সের একটা ডুপ্লিকেট চাবি আমাকে দিয়েছিলেন।
 আমার স্বপ্নবৃক্ষ থেকে যখন প্রতিদিন একটা একটা করে বর্ণিল পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে, তখন নীল জোছনার পাঠানো চিঠি থাকে স্বপ্নের আবীর মাখা। তার স্বপ্নের ভূবন প্রসারিত হতে থাকে ভূবনজুড়ে। সেই কবে হয়তো বলেছিলাম,’একদিন আমার সবই হবে,গাড়ি-বাড়ি।’ সেটার জবাব দিচ্ছে এতটা দিন পর, ‘না না তোমার গাড়ি-বাড়ি নয়,তুমি নিঃস্ব হলেও হৃদয়ের ঐশ্বর্য দিয়ে তোমাকে পেতে চাই।’ আরো কত কী যে কথা…
     এমন চিঠি পাবার পর কার না নতুন করে স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে! কিন্তু আমি পথ খুঁজে পাই না। আমি কেবল পারি নীল জোছনাকে নিয়ে কবিতা লিখতে, গল্প লিখতে। পারি আর না পারি, কবিতা-গল্প হোক আর না-হোক  ওগুলো লিখে আমার সময় কাটে। যদিও সে-সবের প্রায় সবই জঞ্জাল হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে!
     সৈয়দ মুজিবের ‘ষোলো’ এখন সতেরো-আঠারোতে ছুটছে, নীল জোছনাও কলেজে ভর্তি হয়েছে, সে তার স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঘুমায়,দু’চোখে স্বপ্ন নিয়ে জেগে ওঠে।
     একদিন পরিচয় হলো কবি-গল্পকার আবদুল হামিদ মোহাম্মদের সঙ্গে। সে আমারই সমবয়সী, যুগভেরীতে কাজ করে। কথায় কথায় বলল, সে-ও এমসি কলেজে পড়ে, বিএ ক্লাসে।ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে। হামিদ জোর করেই ধরে নিয়ে গেল তার বাসায়। পূর্ব ঈদগাহের চানমারি টিলার উপর তাদের বাসা। সবুজ ঘাসে ঢাকা উন্মুক্ত এক টিলার উপর একরুমের ছোট্ট একটা দালান। আশ্চর্য! এই টিলার উপর একটা গাছ পর্যন্ত নেই। টিলার উপর দাঁড়ালে খোলামেলা বিস্তীর্ণ সিলেট শহরের নান্দনিক দৃশ্য চোখে পড়ে।
     এই বাসাটা সম্ভবত এই সুন্দর টিলার মালিকের। হামিদ আর তার বন্ধু চান মিয়া এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছে। চান মিয়া মদন মোহন কলেজে বিএ পড়ে। সে-ও  আমাদের সমবয়সী।
     ওই একরুমের দালানে দুটো বড় চকি পাতা আছে,সেখানে বিছানা বিছানো। ওই ঘরেই রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। টিলার শেষ মাথায় ছোট একটা পায়খানা আছে। একটা টিউবওয়েল আছে। অনেক্ক্ষণ চাপাচাপি করলেও পানি ওঠে না। চান মিয়া বলল,ঘুস খাওয়াতে হবে।
     ঘুস?
 চান মিয়া একটা ছোট বালতি ভরে কলের মধ্যে পানি ঢাললো। তারপর কয়েক চাপ দিতেই পানির প্রবাহ।
     চান মিয়া বলল, পানি পেতে হলে এই বালতির মধ্যে ঘুসের পানি জমা রাখতে হবে।
     হামিদ-চানমিয়ারা আমাকে ছাড়লো না। তাদের অবস্থাও কিছুটা আমার মতো। কবে যে পরীক্ষা হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। সময় কাটাবার জন্য হামিদ যুগভেরীতে কাজ ধরেছে,চান মিয়া ব্যবসা করার ধান্দা করছে। তাদের টাকা-পয়সা আছে, পরিবারের কেউ হয়তো লন্ডন থাকে, টাকা-পয়সা নিয়ে মাথাব্যথাও নেই। আমার যে মাথাব্যথা আছে, সেটা আমি বুঝতে দিতে চাই না। আমাকে তাদের সঙ্গে থাকতে হলো পনেরো দিন। আমার সাহচর্য তাদের হয়তো ভালো লেগেছে, সে কারণেই আমাকে তারা ছাড়েনি। পনেরোটা দিন আমার জন্য ছিলো খুবই আনন্দের দিন। যুগভেরীতে ছাপা হওয়া আমার প্রথম  গল্পটা হামিদ পড়েছে। সে জোর করে আমাকে দিয়ে গল্প লেখালো,কবিতা লেখালো।একটা কবিতার নাম ছিল ‘….আমার কাব্যলক্ষী’। কয়েকটা লাইন মনে আছে।
       ‘অস্তিত্বের বেলাভূমিতে
       জাগ্রত সৈনিক হেরে গেল
       তোমার উদ্বেল উচ্ছল উন্মিলনে
       সর্বনাশের চঞ্চলতায় বিভীষিকাময়
       বিপর্যস্ত তাণ্ডবতায় আমার রাজ-হৃদয়
       কেমন পৈচাশিক যন্ত্রণায়
       অবক্ষয়ের চোরাবালিতে।’
     ছাপা হওয়া সে-সব কবিতা-গল্প যে মান-উত্তীর্ণ হয়েছে আমার মনে হয় না। তবে সে-সব কবিতা-গল্পও কোথায় য়ে হারিয়ে গেছে,জানি না।
      কবি গিয়াসউদ্দিন সেলিমও কাজ করতেন যুগভেরীতে। তিনি ‘জন্মসুখে’ নামে একটা ম্যাগাজিন প্রকাশ করবেন। আমাকে বললেন, গল্প দেন।
     এবার একটা গল্প লিখলাম, প্রেম-ভালোবাসার বাইরে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে বাঁধে আশ্রয় নেয়া সর্বহারা মানুষের মৃত-স্বজন, গবাদি পশু আর গেরোস্থালি সম্পদ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে সর্বহারা মানুষের আহাজারি আর তাদের সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড রক্ষার গল্প ‘সর্বহারা সমিতি’। সেই গল্প ছাপা হতে হতে পরের বছর হয়ে গেল। ততদিনে আমাকে সিলেট শহর ছেড়ে যেতে হয়েছে। বহুবছর পর, প্রায় দেড়যুগ পর আমি আবার যখন কর্ম উপলক্ষে সিলেট গেলাম, তখন গিয়াসউদ্দিন আউয়াল আমাকে তার ‘জন্মসুখে’র ফটোকপি উপহার দিলেন।
     চানমারি টিলার মায়া কাটিয়ে চলে গেলাম কাশীকাফন। মনজুর বাবা-মা খবর না দিয়ে এতদিন বাইরে থাকায় অনুযোগ করলেন। কলেজের দোহাই দিয়ে বুড়োবুড়ির মনকে শান্ত করলাম।
     পরদিন দুপুরবেলা। খেয়েদেয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছিলাম। মনটা বিষণ্ন,কিছুটা বিক্ষিপ্তও। তখন বুলবুল এলো।
     বলল, মনি ভাই, তুমি খই আছলায়? অতদিনে মনে অইলনি আমরার খতা? নানায় তুমার খতা মামারে খতবার জিগাইছইন!
     বললাম, কাজ আছিলো।
     বুলবুল বলল,তুমি আছলায় খই?
     আমার বিরক্ত লাগছে। এই পিচ্চির কাছেও জবাবদিহি করতে হবে!
     বললাম, খই আছলাম,তরেও কওয়া লাগবোনি?
    বলল, খেনে,খইলে সমস্যা কি তা?
    বিরক্তি নয়,এবার আমার রাগ হল। বললাম, জ্বালাইছ না। ইন তাকি যা।
    আমি বুলবুলের দিকে পিঠ রেখে শুয়েছিলাম। বুলবুল আমার পিঠে ধাক্কা দিল, বসে থাকল,কিন্তু গেল না।
    আমি বললাম, যাছনা খেনে।
    বুলবুল বসে থাকে।
     রাগ করে বললাম, যাছনা বে।
    একটু সময় চুপচাপ।  পেছন ফিরে দেখি, বুলবুল ঠোঁট ফুলিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে ।
    আমি উঠে বসলাম। বললাম, কান্দস খেনে?
    এবার বুলবুলের কান্না দ্বিগুণ হয়।
    আমি উদ্বিগ্ন হই। বলি, কী তা অইছে?
    বুলবুল কেঁদেই চলে,নিঃশব্দে।
    আমি বলি,খান্দস খেনে বে?
    বুলবুল এবার শান্ত হয়। কিছু একটা ফয়সালা করার উদ্দেশ্য নিয়েই আমার মুখোমুখি বসে।
    বলল, তুমি  কিতা মোরে শাফিয়ার মা (বাড়ির কাজের বুয়া) ফাইলায়নি যে তুমি আমার লগে ‘বে’ খইয়া মাতলায়?
    বললাম, তে  কি-তা অইলো?
    বুলবুল বলল, তুমি নোয়াখালী বেটা,বুঝবায় কীলাখান!
    বুঝলাম, সমস্যা গম্ভীর।
    বুলবুল বলল,আমার নানা-নানি,আমার মামু তুমার লগে কিলাখান মাতৈইন! তারা তুমার লগে ‘বে’ খইয়া মাতেনি? তারা তুমারে বা-বো কইয়া মাতোইন। আমার লগেও তুমি বা-বো খইয়া মাততা আছলায়।
    একটু সময় চুপ করে থেকে ফের বলল, তুমি তুমার বন্ধুরে ‘বে’ খইয়া মাতবায়,আরবার তুমার ঘরোর কামোর ফুয়া-ফুড়িইনতোরে ‘বে’ খইয়া মাতবায়। তোমার বড় কেউ তুমারে ‘বা-বো’ খইব,তুমিও তোমার হুরু যারা আছে, তারার লগে ‘বা-বো’ খইয়া মাতবায়।
    আমার সিলেট বসবাসের তখন একযুগ পার হয়ে গেছে। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলায় আমি দক্ষ একজন মানুষ। বন্ধুরা বলে,তুমি তো জড় বিছাইলাইছ!
    অামি সিলেটের ব্যবহারিক ভাষায় দক্ষ হয়েছি সত্য, কিন্তু এই ভাষার যে সুন্দর একটা গ্রামার আছে, সেটা সচেতনভাবে কখনো ভেবে দেখিনি, এমনকি যারা সিলেটি ভাষার নাগরিক, তারাও হয়তো ভেবে দেখেননি। অথচ মাত্র আট বছরের একটি বালিকা আমাকে এই চমৎকার গ্রামারটি ধরিয়ে দিল।
    ( চলমান——)
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com