1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার
রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ(ষোড়শ পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির         

  • আপডেট সময়: বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০২২
  • ৫০ দেখেছেন
দেখতে দেখতে স্বাধীনতা দিবস এসে গেল। আগের দিনের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাকশালের উদ্যোগে জনসভা। জাতির জনক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করে জনসভায় ভাষণ দিবেন। সবাইকে দলে দলে অংশগ্রহণের আহবান করা হলো।
পরেরদিনের পত্রিকায় জনসভার বিশদ সংবাদ ছাপা হয়। পত্রিকার ভাষ্যমতে একাত্তরের সাত মার্চের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান উপছে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি যেন এটাই প্রমান করে তিনি যেন এই নতুন যুগের বাঁশিঅলা,যার কথা শোনার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে এসেছে।
বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশ্য দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। তিনি শুরু করেন পঁচিশে মার্চের বিভীষিকাময় কালরাতের ঘটনা বর্ণনা করে। তারপর স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি, মরণপণ যুদ্ধ ও বিজয়ের কাহিনি বর্ণনা করেন। এরপর শুন্যহাতে যুদ্ধবিধ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য তাঁর প্রাণান্ত পরিশ্রম এবং তারপর বিশ্বসভার প্রতিটি আঙিনায় বাংলাদেশের মর্যাদাকে সমুন্নত করার ইতিহাস বর্ণনা করেন। একথাও বলতে ভুলে যান না যে, দুর্ভিক্ষের মরণছোবলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তারপরই তিনি গর্জে ওঠেন দুর্নীতিবাজ, ঘুসখোর, চোরাকারবারি, মজুতদার, আর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। তারপর বাকশালের কর্মপরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন।
পত্রিকার পাতায় তাঁর ভাষণের বিবরণ পড়তে পড়তে তখন এটাই মনে হচ্ছিল যে একটি মানুষ কীভাবে একটা জাতির সমগ্র জনগোষ্ঠীর আত্মাকে একা নিজের আত্মায় ধারণ করেন। হয়তো সে কারণেই তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, সে কারণেই তিনি একটি জাতির পিতা হতে পেরেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু বলেন,কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য। কথা হলো এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে না যেয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়,ফ্যাক্টরিতে যেয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে, সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নাই।… ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, আজকে যে সিস্টেম করেছি, তার আগেও বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতা কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না,ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগণ যেদিন বলবে ‘বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা ছেড়ে দাও’, বঙ্গবন্ধু একদিনও রাষ্ট্রপতি, একদিনও প্রধানমন্ত্রী থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে  নাই। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে শোষণহীন সমাজ কায়েম করার জন্য।
 ….  আমি চেয়েছিলাম, স্বাধীনতা। কী স্বাধীনতা? আপনাদের মনে আছে, আমার কথার মধ্যে দুইটা কথা ছিল। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায় যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে খেতে না পারে,কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তাহলে মানুষের জীবনের শান্তি ফিরে আসতে পারে না। আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ঘুস খায় সে দুর্নীতিবাজ। যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যে ব্লাক মার্কেটিং করে সে দুর্নীতিবাজ।যে হোর্ড করে, সে দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্য পালন করে না, তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশ বিক্রি করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে।
……আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয়, জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল উৎপাদন হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি, আমি কেন সেই জমিতে ডবল ফসল করতে করতে পারব না? দ্বিগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণ করতে পারি, তাহলে আমাকে আর খাদ্য কিনতে হবে না, ভিক্ষা করতে হবে না।
…ভাইয়েরা আমার, বোনেরা আমার, ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত নাই। একটা লোককে আপনারা ভিক্ষা দেন একটাকা কী আটআনা। তারপর তার দিকে কীভাবে চান, বলেন,এ বেটা ভিক্ষুক, নিয়ে  যা আটআনা পয়সা। একটা জাতি যখন ভিক্ষুক হয়,মানুষের কাছে হাত পাতে, আমারে খাবার দাও,আমারে টাকা দাও, সেই জাতির ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুক জাতির নেতা থাকতে চাই না।
   …… ভাইয়েরা আমার, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে তাহলে ২৫-৩০ বছরে বাংলায় কোনো জমি থাকবে না চাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। এই জন্য আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। এটা হলো তিন নম্বর কাজ। এক নম্বর হলো- দুর্নীতিবাজ খতম কর, দুই নম্বর হলো কল-কারখানায়,খেতে-খামারে প্রোডাকশন বাড়ানো,তিন নম্বর হলো পপুলেশন প্ল্যানিং,চার নম্বর হলো- জাতীয় ঐক্য।
জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য একদল করা হয়েছে।
 …… দেশের ২০ শতাংশ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে ৫ শতাংশ লোক দুর্নীতিসহ সব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ  কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষ। তারা দুর্নীতি করে না, অথচ ৫ শতাংশ তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ তাদের অবহেলা অশ্রদ্ধা করে। অথচ তাদের টাকাতেই  এই মানুষগুলো তথাকথিত শিক্ষিত হয়েছে।
শিক্ষিত সমাজকে আমি অনুরোধ করব,আমরা কতজন শতকরা শিক্ষিত  লোক(?) আমরা শতকরা ২০ জন শিক্ষিত লোক। তারমধ্যে  সত্যিকার অর্থে শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত। শিক্ষিতদের কাছে  আমার একটা প্রশ্ন, আমি যে এই দুর্নীতির কথা বললাম,আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক?  না। তাহলে ঘুস খায় কারা? ব্লাক মার্কেটিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট কারা?  বিদেশে টাকা চালান করে কারা? এই আমরা যারা শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত, এই আমাদের মধ্যেই ঘুসখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এই  শতকরা পাঁচজনের মধ্যে, এর বাইরে নয়।
শিক্ষিত সমাজকে একটা কথা বলব,আপনাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। একজন কৃষক যখন আসে খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে,আমরা বলি,এই বেটা কোত্থেকে আইছিস, বাইরে বয়,বাইরে বয়। একজন শ্রমিক যদি আসে, বলি,এখানে দাঁড়া।এই রিকশাওয়ালা, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সঙ্গে কথা কথা বলে।তুচ্ছ করে। এর পরিবর্তন করতে হবে।আপনি চাকরি করেন,আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন।ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।
 সরকারি কর্মচারীদের বলি,মনে রেখো এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভায়ের মতো,ওরই পরিশ্রমের পয়সা,ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়। একটা কথা আমি জিজ্ঞাসা করি,কিছু মনে করবেন না, আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে?আমার বাবা মা,আমরা বলি বাপ-মা। লেখা পড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারি পাশ করায় কে? সায়েন্স পাশ করায় কে? বৈজ্ঞানিক করে কে?অফিসার করে কে,কার টাকায়? বাংলার দুঃখী জনগণের টাকায়।
একজন ডাক্তার হতে সোয়া লাখ টাকার মতো খরচ পড়ে। একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে এক লাখ থেকে সোয়া লাখ টাকা খরচ পড়ে। বাংলার জনগণ গরিব। কিন্তু এরাই ইঞ্জিনিয়ার বানাতে টাকা দেয়, মেডিক্যালের টাকা দেয়। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা,শিক্ষিত ভাইয়েরা,যে আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে তা শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়।আপনার ছেলেমেয়েদের দেখার জন্য নয়। দিয়েছে, তাদের জন্য আপনি কাজ করবেন, তাদের সেবা করবেন বলে। তাদের আপনি কী দিয়েছেন? কী ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু দিচ্ছেন? তার টাকার ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, তার টাকার ডাক্তার সাহেব, তার টাকায় অফিসার সাহেব, তার টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব, তার টাকায় মেম্বার সাহেব, তার টাকায় সব সাহেব, আপনি দিচ্ছেন কী? কী ফেরত দিচ্ছেন?
আত্মসমালোচনা করেন,বক্তৃতা করে লাভ নাই। রাতের অন্ধকারে খবরের কাগজ ব্লাকমার্কেটিং করে সকালবেলা বড় বড় করে লেখার দাম নাই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে মদ খেয়ে অনেস্টির কথা বলার দাম নাই। আত্মসমালোচনা করুন,তা হলেই হবেন মানুষ।
বক্তৃতার শেষপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বাকশালের রূপরেখা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। সে প্রসঙ্গের সূত্রপাত করতে গিয়ে তিনি বলেন,..এই যে কী হয়েছে সমাজের? সমাজ ব্যবস্থায় যেন ঘুণ ধরে গেছে। এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই,যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের। সে অাঘাত করতে চাই এই ঘুণ ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে।আমি আপনাদের সমর্থন চাই।…….
স্বাধীনতা দিবসে বাকশালের প্রথম  জনসভায় বঙ্গবন্ধু জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনা বাকশালের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে প্রথমবারের মতো মত প্রকাশ করেন। রেডিও-র সংবাদ ও পত্রিকার মাধ্যমে মানুষ বাকশাল সম্পর্কে অবগত হয়। এতদিন নানা মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের কারণে মানুষের মধ্যে বাকশাল সম্পর্কে একটা ভাসা ভাসা ধারণা তৈরি হলেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
দিন পার হতে থাকে, সারাদেশ রাজনৈতিক উন্মাদনায় মেতে থাকে। একটা নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি এগোতে থাকে। কিন্তু আমরা সে রাজনৈতিক উন্মাদনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। সেশনজট শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটছে। কিন্তু কেন,এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আমাদের জানা হয় না।
 একদিন বন্দর বাজারে দেখা হলো লুতফর ভাইয়ের সঙ্গে। লুতফর রহমান আমাদের বিআইডিসির নতুন অ্যাপ্রেন্টিস। বয়সে কিছুটা বড় হলেও আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।
লুতফর ভাই বললেন, তিনি সহসাই মিডলইস্টের কোনো দেশে চলে যাবেন। আমাদের সেশনজটের কথা শোনার পর বললেন, তুমি একটা কাজ কর,একবার চট্টগ্রাম যাও। ইউনিভার্সিটিতে আমার বন্ধু আমিন রসুল আছে, সে স্টুডেন্ট লিডার,বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ছাত্রলীগের নেতা। তোমাদের সমস্যাটা কোথায় জানতে পারবে। তোমাকে অবশ্যই সে সুপরামর্শ দেবে।
লুতফর ভাই আমাকে আমিন রসুলের ঠিকানা লিখে দিলেন। মাদারবাড়িতে একটা বাসা ভাড়া করে আরও দুইবন্ধুর সঙ্গে থাকেন আমিন ভাই। আমিন রসুল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তার নেশা রাজনীতি। চাকরি-বাকরি না করে তিনি প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হলেন পলিটিক্যাল সাইন্সে।
সেদিনই আমি আমার বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে আমিন ভাইকে একটা চিঠি লিখলাম।
আমার চিঠির উত্তর এলো আগস্ট মাসের মাঝামাঝি। চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার জন্য আমি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তখনই  একদিন আচানক ঘটে গেল সেই হৃদয় বিদারক ঘটনা যা সমগ্র জাতির হৃদয়-স্পন্দনকে মুহূর্তের মধ্যে থামিয়ে দিল।
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন