1. masudkhan89@yahoo.com : admin :
  2. masudkhan89@gmail.com : Masud Khan : Masud Khan
  3. news.chardike24@gmail.com : চারদিকে ২৪.কম : রাইসা আক্তার

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ (১৭তম পর্ব): সিরাজুল ইসলাম মুনির

  • আপডেট সময়: শনিবার, ১৯ মার্চ, ২০২২
  • ৪৫ দেখেছেন
নুরুল হক মনজু আর আমি একটা বড় খাটে ঘুমাতাম। আমি ঘুমিয়েই ছিলাম।বেলা বাড়ছিল, খোলা জানালায় রোদের উঁকিঝুঁকি। তখন ঘুম ভাঙল। পাশে মনজু চাচা নেই। প্রতিদিন আমিই আগে জেগে উঠি। আজ ব্যতিক্রম।
 জানালার বাইরে গাছের পাতায় রোদ পিছলে পড়ে। আমি শুয়ে শুয়ে রোদের খেলা দেখি। তখনই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে প্রবেশ করেন মনজু। তার মুখ বিমর্ষ।
   আমাকে উদ্দেশ্য করেই বললেন, বঙ্গবন্ধুরে মারিলাইছে।
   মনজু পেছনদিকে দুই হাতে শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে পা ঝুলিয়ে খাটের উপর বসেন। আর বিড়বিড় করে বলতে থাকেন,খেমনে মারলোরে বা,খেমনে মারলো! খেমনে সম্ভব অইলো?
   প্রথমে আমার তেমন কিছুই মনে হলো না। আমি বিছানায় উঠে বসলাম প্রতিক্রিয়াহীন। নুরুল হক মনজুর বিড়বিড় করে কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হলো কথাটা সত্যি নয়। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু সিলেট এসেছিলেন। স্টেডিয়ামে জনসভা। সারা সিলেট শহর এমনকি ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, শেরপুর,ছাতক, জৈন্তাপুর,   গোলাপগঞ্জ, ভাদেশ্বর, বিয়ানীবাজার আর আশেপাশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিশাল স্টেডিয়াম পূর্ণ করে ফেলেছিল।বঙ্গবন্ধুকে দেখবে বলে সেদিন হোস্টেল খালি করে ছুটছিল সবাই। দেশ স্বাধীন হবার পর এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম সিলেট সফর। হয়তো সে কারণেই তাঁকে একনজর দেখার জন্য মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। তাঁকে কাছে থেকে দেখব বলে আগেভাগেই আমরা কয়েকজন স্টেডিয়ামে চলে গিয়েছিলাম এবং বাঁশঘেরার পাশেই জায়গা করে নিয়েছিলাম।
   আমরা বসা ছিলাম বলেই হয়তো তাঁকে তাঁর স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়েও অনেক বড় মনে হচ্ছিল। তাঁর কন্ঠ ছিল অন্য সবার থেকে আলাদা, পুরুষালী ও মাধুর্যমাখা। তিনি পরেছিলেন ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। পাঞ্জাবির উপর কালো মুজিবকোট। কালো মোটা ফ্রেমের চশমা তাঁর সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
   বক্তৃতায় তিনি অনেক কথাই বলেছিলেন। সংবিধানের চার মূলনীতির কথা বলেছিলেন তিনি,তারমধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা যোগ করেছেন এই কারণে যে এই দেশ হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ- খ্রিষ্টান সম্মিলিত সকলের দেশ,সেজন্যে। আণ্ডারগ্রাউন্ডের দুষ্কৃতকারী অথবা জাসদকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, আমি লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দিব, এটা মনে আছে।
   তাঁর মতো এমন সুন্দর একজন মানুষকে কেউ মারতে পারে, এটা আমার বিশ্বাস হলো না। একজন রাষ্ট্রপতি যে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই পুলিশ অথবা মিলিটারির পাহারায় থাকেন,সেটা আমার কল্পনায় আসে না। কীভাবে তাঁকে কে অথবা কাহারা মেরে ফেলল, তার স্ত্রী-সন্তানরা তখন কোথায় ছিল, এমন সরল সাধারণ প্রশ্নই আমার মনে জাগে। বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পেছন থেকে চুরিকাঘাত করে হত্যা করে মুহম্মদি বেগ, বঙ্গবন্ধুকেও কি এভাবে পেছন থেকে হত্যা করেছে?
   আমি আমার মতো ভাবলাম সত্য,কিন্তু ভাবনার আড়ালে মনের ভেতরটা মুচড়ে মুচড়ে উঠল। বঙ্গবন্ধুর মুখটা মনে পড়ল, তাঁর দীর্ঘ অবয়ব, তাঁর ব্যাকব্রাশ করা সুন্দর চুল,তাঁর হাত নেড়ে কথা বলার স্টাইল, তাঁর গম্ভীর কন্ঠস্বর মনে পড়ল।
   আমি নুরুল হক মনজুর পাশে এসে বসলাম। মনজুর বিষণ্ণ মুখের উপর নিঃশব্দ অশ্রু।
    বললাম, কে মারল?
    মনজু বললেন, আর্মিরা।
   এই খবর কে বলল?
   রেডিওত খর।
   আফনারার তো রেডিও নাই।
   মখলিছ আমারে ঘুম তাকি উটাইয়া লইয়া গেছে। কী এক মেজর ডালিম না কিতা রেডিয়োত গুষনা দে-র।
   মখলিছ মনজুর চাচাত ভাই। পাশের বাড়ি। বাড়ির সীমানা একটাই। মাঝখানে বেড়া পর্যন্ত নেই।
   আমি লাফিয়ে নামলাম। উদ্দেশ্য মখলিছের ঘরে যাওয়া। তখনই উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠা জর্জরিত মনজুর আম্মা যাকে আমি দাদি বলে ডাকি,তিনি বুকফাটা চিৎকার করতে করতে ছুটে এলেন, আর বলছেন,  মনজুরেবো, ও পূত, শেখ মুজিবরে বুলে মারিলাইছে। কিগ্যিয়ে মারল,খেমনে মারলরে!
   তিনি সেখানে দাঁড়ালেন না। তাদের টানা লম্বা বারান্দা ধরে ছোটাছুটি করছেন আর একই কথা বারবার আওতাতে থাকেন।
   মনজুর বাবাও বের হয়ে এলেন ঘর থেকে। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না,একবার উঠোন মাড়িয়ে পুকুর ঘাটে যান আবার ছুটে আসেন টানা বারান্দায়।
   আমি যাচ্ছিলাম মখলিছের বাড়ি। আমাকে সামনে পেয়ে তাঁর শীর্ণ হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, মোর বিশ্বাস অরনারে বো মনি,তুমি কিতা মখলিছের বাড়ি যাইরায়নি, বালা খরিয়া খবর হুনিয়া আইয়ো।
    মখলিছের ঘর ভর্তি মানুষ। নারী পুরুষে ঠাসা।আশে-পাশের অনেকেই জড়ো হয়েছে।  সবাই সরে গিয়ে আমাকে ভেতরে যাওয়ার পথ করে দিল। উঁচু ভলিউমে রেডিও বাজছে।
    মখলিছ আমাকে তার খাটের উপর বসতে জায়গা করে দিলেন। এক অস্বাভাবিক রুঢ় কন্ঠ, বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান ঘোষকরা শুদ্ধ ও শালীন ভাষায় যেভাবে ঘোষণা দেন,সেভাবে নয়,একটা রেকর্ডেড কন্ঠ কিছুক্ষণ পর পর বাজতে থাকে। জনৈক মেজর ডালিম বলছেন, স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। সামরিক শাসন জারী করা হয়েছে। দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। জনগণকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
   মখলিছ বললেন, ফজরের নামাজের পর প্রতিদিন তিনি নিয়ম করে ঢাকা বেতারের খবর শোনেন।আজ রেডিও খুলেই তিনি শুনতে পান, আমি মেজর ডালিম বলছি।….
   মখলিছ বললেন,বুঝতাম ফারছিনা,খন্দকার মোশতাকের নাম ফয়লা খইছে না, ইগু শেখোর মন্ত্রী আছিল না-নি,হে খেমনে হামাইল?
         খন্দকার মোশতাক কিভাবে ঢুকল,সে জিজ্ঞাসার জবাব সেদিন না জানলেও পরে, বহুবছর পরে আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তম উপন্যাস ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ ও ‘রক্ত নিয়ে নাম লিখেছি’  লিখলাম, এবং তারপর বঙ্গবন্ধুর করুণ মৃত্যুগাথা নিয়ে লিখলাম ‘ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডঃপূর্বাপর অনুসন্ধান ‘ তখন আমি জেনে গেলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে কিভাবে তৎকালীন সিআইএ-আইএসআই কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকে সংঘবদ্ধ করে। তৎকালীন সময়ে সিআইএ  কয়কটি দেশের দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাকে  উৎখাত করেছিলেন সেনাবাহিনী প্রধানকে ব্যবহার করে। সিআইএ ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা সুকর্ণকে উৎখাত করে জেনারেল সুহার্তোকে ব্যবহার করে, কঙ্গোতে লুবুম্বাকে সরায় মবতু আর চিলির আলেন্দেকে সরার সেনাপ্রধান পিনোসোকে দিয়ে। তারা তাদের ইচ্ছার বিপরীতে চলা যে কোনো জনপ্রিয় সরকারকে উৎখাত করার জন্য প্রথম  সেদেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা সৃষ্টি করে, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, তারপর সেনাবাহিনীকে ব্যাবহার রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে। এগুলো অনেকটা একই ছকে বাঁধা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেরকম ঘটনাই ঘটেছিল। তবে এখানে অতিরিক্ত যুক্ত হয়েছিল আইএসআই এবং মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী ব্যক্তিদের প্ররোচনায় সৌদি সরকারও অর্থ বিনিয়োগ করেছিল।বাংলাদেশ  সেনাবাহিনীর তৎকালীন সেনাপতিকে সিআইএ-আইএসআই শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বিপুল জনপ্রিয় নেতাকে হত্যার মতো দুঃসাহসী মনে হয়নি। উপপ্রধান সেনাপতিকে তারা ততটাই নিষ্ঠুর ও কৌশলী মনে করলেন যা তাদের উদ্দেশ্য পূরণে অপরিহার্য ব্যক্তি বলে মনে হলো। যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল মহীরুহসম,কাজেই তাঁর বিকল্প হিসেবে তারা একজন বেসামরিক রাজনৈতিক নেতাকেও খুঁজে বের করে,যে হলেন শেখের নিকটতম ব্যক্তি,কিন্তু তিনি মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে মুক্তিযুদ্ধকালেও ভূমিকা রেখছিলেন। খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখেই সেনাবাহিনীর বিভ্রান্ত অংশ ক্ষমতা দখল করে, হয়তো ক্ষমতা তখনই তারা কুুক্ষিগত করতেন,কিন্তু যখন দেখা গেল, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করতে গিয়ে তারা পরিবারের আঠারোজন নিকটস্বজনকে হত্যা করেছে। এই গণহত্যার দায় তাৎক্ষণিকভাবে নিতে চাইলেন না দ্বিতীয় সামরিক ব্যক্তি। মার্কিন প্রশাসন নানা নাটকীয় ঘটনার পর মাত্র চার মাসের মাথায় দ্বিতীয় সামরিক ব্যক্তিকেই ক্ষমতার কাছাকাছি  নিয়ে আসে।
      বেলা বাড়লে নুরুল হক মনজু আর আমি বের হলাম। তাজপুর যাব। আরো নিশ্চিত খবর পেতে চাই। বড় রাস্তায় এসে বিশাল বটগাছের নিচে দাঁড়ালাম।
         রাস্তাঘাট অন্যদিনের মতো সচল নয়। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটা বেবিট্যাক্সি পেলাম।
         তাজপুর বাজারের রাস্তায় আজ মানুষজন চোখে পড়ছে না। চায়ের দোকানগুলোতে মানুষ ভিড় করেছে।আমরাও একটা চেনা দোকানে গিয়ে ঢুকলাম। মনজুকে দেখে কয়েেকজন তার কাছ থেকে ঘটনা সত্য কী না জানতে চায়। মনজু মাথা নিচু করে বসে থাকে আর দুদিকে মাথা নাড়ায়। লোকেরা আজ সকালের অবিশ্বাস্য সংবাদের সত্যাসত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলে। বুঝতে পারলাম, শেখ মুজিবকে দেখেনি, তাঁর বক্তৃতা শোনেনি,এমন মানুষের সংখ্যা এখানে হাতে গোণা কয়েকজন হতে পারে। আজ তারা নিজেদের মতো করে সেই দেখার স্মৃতি বর্ণনা করছে।
         আমরা লাইজুদের বাসায় এলাম।সাব-রেজিস্ট্রার সাহেব বিমর্ষ বসে আছেন। রেডিওতে শোনা গেল খন্দকার মোশতাকের প্রতি তিন বাহিনী প্রধানের আনুগত্যের ঘোষণা। এমনভাবে সবকিছু একের পর এক প্রচার হচ্ছিল যেন দেশে কিছুই হয়নি। এমন আকস্মিক ঘটনায় মানুষ  বিভ্রান্ত হয়ে যায়, তারা বুঝতে পারে না,তাদের  কী করা উচিত। কেবল তাদের বুকের ভেতর তোলপাড় করে একটি জিজ্ঞাসা,শেখের অপরাধ কী ছিল?
         সাব রেজিস্ট্রার বললেন, বাঙালি বড় বেইমান জাতি। যে মানুষটা  তাদেরকে স্বাধীনতা এনে দিল,তারাই তাকে হত্যা করল।
         আমাদের ইচ্ছা ছিল, সিলেট যাব। কিন্তু বেবিট্যাক্সি শহরে যাচ্ছে না। এরইমধ্যে খবর পাওয়া গেল, শহরে কারফিউ জারী করা হয়েছে।রাস্তায় সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন দেখলে পেটাচ্ছে।
         যে-সব দোকানে রেডিও আছে, সেখানে সন্ধ্যায় বিবিসি শোনার জন্য মানুষ জড়ো হয়। সারাদিন নানারকম গুজব শোনা যাচ্ছিল,ঢাকার রাস্তায় জনগণের সঙ্গে মিলিটারির সংঘর্ষ হচ্ছে, সংঘর্ষে অনেক মানুষ মারা গেছে। সারাদিনের উৎকন্ঠা আর উদ্বেগের সঙ্গে নতুনমাত্রা যুক্ত করল বিবিসি। বিবিসি অসমর্থিত সংবাদের সূত্রে দাবি করল, শেখ পরিবারের সকল সদস্যকে সৈন্যরা গুলি করে মেরেছে। তবে তাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলতে পারল না। তবে রাজধানীতে সহিংসতার বিষয় তারা কিছু বলল না।
         দুইদিন পর বেবিট্যাক্সি চলাচল স্বাভাবিক হলে আমি সিলেট গেলাম। আবদুল হামিদ মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা হলো যুগভেরী অফিসে।  আমি ইচ্ছে করেই তার সঙ্গে চানমারি টিলায় গেলাম। আমার এসএসসি, এইচএসসি-র মার্কসিট, সার্টিফিকেট সব ওখানেই ছিল। অল্প কয়েকটা দিন আমি চানমারি টিলায় ছিলাম,আমার ভালো লাগার জায়গা হয়ে উঠেছিল জায়গাটা। আমি যদি চট্টগ্রাম চলে না যেতাম, তাহলে পরবর্তী দিনগুলো আমি হামিদ-চানমিয়ার সঙ্গে চানমারি টিলার ছোট্ট ঘরটায় কাটিয়ে দিতাম।
         হামিদ আমাকে দেখালো পনেরো তারিখ সকালবেলায় টিলার উপর থেকে মিলিটারির গাড়ি রাস্তা ধরে কীভাবে ছোটাছুটি করছিল।
         আমার চট্টগ্রাম যাওয়ার সংবাদ শুনে মন খারাপ করল হামিদ। কিন্তু আমার তো উপায় ছিল না।
         নুরুল হক মনজুদেরও ভবিষ্যৎ বলে কিছু ছিল না। ডিগ্রি পরীক্ষার পার্সেন্টেজ ছিল মাত্র চার। তাদের অধিকাংশই আবার পরীক্ষা দেবার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেশনজটের দীর্ঘসূতোয় তারাও আটকা পড়ে গেল।
         আমার চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা শুনে নুরুল হক মনজু অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন। তার চোখ ছলছল করছিল। আমি বেশ বুঝতে পারি, আমার জন্য তার বুকের ভেতর বেশ বড় একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি হয়ে আছে। আমি এমসি কলেজে অনার্স পড়ি,রেডিওতে খবর পড়ি, তাজপুর-কাশীকাফনের মানুষের কাছে আমাকে নিজের ভাতিজা বলে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি গর্ববোধ করতেন। আমি তাকে না বলে যেতেও পারতাম না।নতুন জায়গায় যাচ্ছি, আমার তো টাকার  দরকার।
         বললাম,মনজু চাচা আমার টাকা লাগবে।
         কত?
         দুই হাজার।
         নুরুল হক মনজুর লন্ডন থেকে আসা পাউন্ড ছিল না। বাবার এক ছেলে,জমিজমা আছে, আয়ের উৎস ওই একটাই। তার অন্য বন্ধুদের মতো টাকা ওড়াবার সুযোগ তার ছিল না।
         নুরুল হক মনজু বিশ্বনাথের ফারুক ভাইয়ের কাছে গেলেন। তার পরিবারের সবাই লন্ডন প্রবাসী। তিনি মার্জিত ভদ্রলোক, টাকার দেমাক দেখিনি কখনো। এমনকি কখনো একটা সিগারেট পর্যন্ত খেতে দেখিনি।
         ফারুক ভাইয়ের রুম থেকে দশ মিনিট পরেই ফিরে এলেন মনজু চাচা। বললেন,সন্ধ্যায় ইম্পেরিয়ালে নলিনীদার রুমে পাবে।
         অনেকদিন পর এলাম ইমপেরিয়ালে। নলিনী দাদা, বললেন তুমি খই তাকি আইলায়? আমি তো ভাবছি, তুমি ঢাকাত গেছ গিয়া।
         বললাম, না দাদা,আমি তো এমসি-ত ভর্তি অইছি। ফিজিক্সো।
         দাদা বললেন, গুড।
        ফারুক ভাই এলেন কিছুক্ষণ পর। আমাকে বললেন,হুনলাম তুমি  চিটাগাঙ যাইবায় গিয়া।
         আমি মাথা নাড়ি।
         ফারুক ভাই আমাদের সবার জন্য পুডিং দিতে বললেন, চা দিতে বললেন।
         নুরুল হক মনজু নয়,আমাকে টাকা দিলেন ফারুক ভাই। আমি নিতে না চাইলে তিনি জোর করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বললেন, ধার হিসেবে নাও। শোধ না করতে পারলে দাবি নাই।
        সেদিন ওই মুহূর্তে ফারুক ভাইয়ের এই আচরণ আমার ভালো লাগেনি। আমার অপমানই লেগেছিল। কিন্তু পরে আমার মনে হয়েছে, আসলে তিনি নুরুল হক মনজুকে ঋণী করে রাখতে চাননি। কিন্তু তাঁর ঔদার্যের কাছে আমাকে তিনি চিরকালের জন্য ঋণী করে রাখলেন।
    (চলমান………..)
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2021 Chardike24.com
Site Customized By NewsTech.Com